‘মওলানা যেভাবে বিনয়ের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে সূফীর আত্মগোপন চরিতার্থ করলেন’

কোন কোন হিসাব নিকাশে মোহমুক্ত বলে পরিচিত মওলানা ভাসানী বড়ই হিসাবী। যেমন লেখালেখিতে কাগজের ব্যবহার। নিউজপ্রিন্টে কত মন্ত্রীকে ও নেতাকে তিনি চিঠি লিখেছেন, তার অন্ত নেই। কোন একটি সম্মেলন উপলক্ষে মুদ্রিত হ্যান্ডবিল বিলি বন্টন করে কিছু সংখ্যক হয়ত উদ্বৃত্ত রয়ে গেল, হুজুরের হুকুম হল এসবের অপর পৃষ্ঠায়ই চিঠি লেখ। বলতাম, হুজুর এতে মুসাবিদা না হয় করা গেল, কিন্তু মূল চিঠি কি করে লিখি? ডি সি, সিভিল সার্জন, কোন অফিসের পরিচালক/মহাপরিচালক কিংবা বোর্ডের চেয়ারম্যান- এঁদের বরাবরে এমনও হয়েছে, ডাক বিভাগের ইনভেলাপের ভাঁজ খুলে ভেতরের অংশে চিঠি লিখেছেন। যদি বলেছি, একটু সবুর করুন, ফ্রেশ করে এক্ষণি লিখে আনছি,- না, অনুমতি পাইনি। ও ভাবেই সাক্ষর করে দিয়েছেন, পাঠিয়ে দাও অথবা পৌঁছিয়ে দাও, কাজ হবার হলে এতেই হবে। সত্যি হয়েছেও।

এমনি যখন তাঁর কৃচ্ছতা, একবারের ঘটনা আমার সব ডিজগাস্টিং ভাবনা পাল্টে দিল।

১৯৭৪ সনের ২৭ জুলাই ছিল চান্দ্র হিসাবে ৬ রজব। ৬ রজব হল গরীব নেওয়াজ খাজা মুঈনউদ্দীন চিশতীর (রাহঃ আঃ) ইন্তেকাল দিবস। মওলানা ভাসানীর দরবারে এই দিবসটি জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়। এক দেড় মাস আগে থেকেই বিশিষ্ট ভক্ত মুরিদগণ হুজুরের কাছে আসতেন, বলতেন, এবারের ওরসে আপনার কি হুকুম? আমাকে কি করতে হবে!

সে বছর টাঙ্গাইলের ভূয়াপুরের বাসিন্দা হালিমউজ্জামান তুলা জুন-এর প্রথম দিকে (১৯৭৪) তার জন্যে কি নির্দেশ জানতে চাইলেন। হুজুর বলিলেন, সূতার কারবার করিস। পয়সা হয়েছে। কিছু খরচ কর। ওরসে আসার দাওয়াত জানিয়ে হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে নিয়ে আয়। ২০/২৫ হাজার হলেই হবে।

তুলা ভাই খুশীতে ডগমগ হয়ে টাঙ্গাইলের কোন এক প্রেস হতে ২৫ হাজার হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে নিয়ে আসলেন। হুজুরের হাতে কপি দিবা মাত্র রেগে আগুন হয়ে গেলেন। চীৎকার করে আমাকে ডাকলেন। এই হ্যান্ডবিল কে লিখে দিয়েছে?

আমি একটি কপিতে চোখ বুলালাম। হুজুর কিন্তু কেন ক্রুদ্ধ হয়েছেন তার কারণ এখনও বলছেন না। তুলা ভাই ভাবছে, প্রেসে ছাপাতে গিয়ে মারাত্মক কিছু ভুল হয়েছে। আসলে ভুল বলতে কিছু ছিল না।

আমি বিনীত কণ্ঠে বললাম, আমিই লিখে দিয়েছি। কিন্তু আপনি যে লেখার জন্য রাগ করছেন, সে লেখাটা আমি লিখিনি।

তখন তুলা ভাই-এর উপর আরও চড়াও হলেন। মনে হচ্ছিল মারবেন।

তুলা ভাই কেঁদেকেটে আমাকে বললেন, ভাই আমি বুঝতেই পারছিনা কি বেয়াদবি করেছি।

হুজুরের উপস্থিতিতেই আমি তাকে বললাম, হুজুরের নামের পাশে ‘রাহমাতুল্লাহে আলাইহে’ কেন ছাপিয়েছেন। মূল লেখায় তো ছিলনা। সেজন্যে হুজুর অগ্নিশর্মা হয়েছেন।

তখন তুলা ভাই কান্নাকাটি বাদ দিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, আমিই প্রেসকে বলেছি। ঠিকই ছাপিয়েছি। আমার গুরু রাহমাতুল্লাহে আলাইহে না-তো কি?

হুজুর চুপচাপ হয়ে গেলেন। যা আমার জন্য চিরবিস্ময়ের, সে নির্দেশ আমাকে দিলেন। সে নির্দেশ দানে কোন ধমক নেই; কিন্তু পালনের কাঠিন্য রয়েছে। বললেন, বারী, এক্ষণি সবগুলো হ্যান্ডবিল পুকুরে ফেলে দিয়ে আস।

আমি বুঝলাম,- এ কাজ করতে হবে। এ নির্দেশের পরিবর্তন হবে না। ২৫ হাজার হ্যান্ডবিল। ক্রাউন ১/৮ সাইজে নিউজপ্রিন্টে এক পৃষ্ঠায় ছাপা। অপর পৃষ্ঠা সাদা। দুই হাতে দুটি বান্ডিল সদর্পে নিলাম। পাশের পুকুরের পানিতে ছুড়ে দিলাম। ঝপাৎ শব্দটি হুজুরের শ্রবণ সীমার মধ্যে, আমি জানতাম।

কক্ষে এসে নির্বাক হয়ে গেলাম। ১৯৭৪- এর আকালের দিনগুলোতে কয়েক দিস্তা কাগজের জন্য যখন জেলা সদরে গিয়ে লাইন ধরে ম্যাজিস্ট্রেটের স্লিপ সংগ্রহ করতে হত, যখন তিনি আমাদের জন্য অবিলিকৃত হ্যান্ডবিলের অপর পৃষ্ঠায় লেখালেখি করা বাধ্যতামূলক করেছিলেন, তখন তিনি এতগুলা কাগজ বিলিবন্টন করতে তো দিলেনই না, কি জানি প্রমাণ থেকে যায়, মওলানা ভাসানী তাঁর সম্মানে ‘রাহমাতুল্লাহে আলাইহে’ লেখার প্রকারান্তরে অনুমোদন দান করেছিলেন,-তাই, সব পানি করে দিলেন।

বিনয়ের পরাকাষ্ঠা দেখালেন। সূফীর আত্মগোপন চরিতার্থ করলেন।

(আমার ভালোবাসা মওলানা ভাসানী; সৈয়দ ইরফানুল বারী, ঘাটাইলডটকম)/-