‘মওলানা ভাসানী বিভিন্ন রঙে এক অনন্য পুরুষ’

মওলানা ভাসানীর বিভিন্ন রঙ। এই বিভিন্ন রঙে তিনি যেন এক অনন্য পুরুষ। তিনি এক প্রহেলিকার নাম। তাকে সহজ কোন ক্যাটাগরিতে ফেলানো যায়না। আপনি তাকে মওলানা বলতে পারেন আবার কমরেড বলতে পারেন। তার একটা বড় পরিচয় তিনি সবসময় সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন, তাদের পক্ষে ছিলেন। তিনি নিজেও একজন কৃষক, এবং সারাজীবন তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সেটা করার জন্য মুহাম্মদ আর মার্ক্স, মাও-লেনিন সবারই ধর্না দিয়েছেন রাজনৈতিক মনস্তত্ব তৈরি করার জন্য। তাকে আমার কাছে প্রোলেতারিয়েত পীর মনে হয়। নিজে ছিলেন সর্বহারা এবং আজীবন সর্বহারাদের রাজনীতিই করেছেন। বাংলাদেশে বামরাজনীতির সবচেয়ে বড় পোস্টার মওলানা ভাসানী। তার আগে বা পড়ে এই ভূখন্ডে তার সমমানের বা তার কাছাকাছি মানের আর কোন বাম নেতা তৈরি হননি। আবার এই ঢাঙা-জলের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন পীরের মত।

একজন পীরের মুরিদের মতই তার ভক্ত সাগরেদরা তার বাড়ির দিকে লাইন দিয়ে হাঁটা দিতো। বিভিন্ন শিষ্য বা মুরিদের শারীরিক ও মানসিক রোগ বালাই দোয়া-দুরুদ পাঠ করে ফুঁ দিয়ে চিকিৎসা করে দেয়ার চেষ্টা করতেন। এই ফু’দেয়াকে আপনি অবৈজ্ঞানিক বলতে পারেন, ভক্তদের বিশ্বাসকে অবহেলা করতে পারেন কিন্তু এই শিক্ষাদীক্ষাহীন কৃষককুলের প্রতি মওলানার ভালোবাসাকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। তাদের প্রতি ভালোবাসায় তার কোন কৃত্রিমতা ছিল না।

তার লুঙ্গি, তালপাতার টুপি এবং সাধারণ একটি পাঞ্জাবি এখানকার কৃষকদেরই পোশাক। সাধারণ মাটির চুলায় রান্না করা, একেবারে কুড়েঘরে থাকা এ যেন ইসলামের খলিফা উমরের কথাই মনে করে দেয়।

ভাসানীকে নিয়ে বলা হয় তিনি আজন্ম বিরোধি দল, ‘লাইফটাইম অপোজিশন পার্টি’। হ্যা, ঠিক তা-ই। তিনি কোন দিন ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করেননি, ক্ষমতার মসনদ তাকে এক বিন্দুও টানেনি। যখনই মনে হয়েছে তার কৃষক সমাজের স্বার্থ পূরণ হচ্ছেনা, তার দল অসততা করছে, আদর্শ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে সে দল ত্যাগ করে নতুন দল করেছেন।

তাকে অনেকে ‘অস্থিরচিত্ত রাজনীতিবিদ’ বলেন। হ্যা তিনি অস্থিরচিত্ত। দেশের সিংহভাগ কৃষক সমাজের দুরবস্থা তাকে স্থির হতে দেয়নি, আরাম করতে দেয়নি। অথচ তিনি ক্ষমতার এত কাছাকাছি থেকেছেন কিন্তু কখনোই ভোগ-বিলাস তাকে টানে নি। এমনকি স্বাধীনতার পরও তিনি আরামে থাকেননি। সর্বশেষ ফারাক্কা বাঁধের বিপক্ষে লং-মার্চ করে কৃষককুলের প্রতি তার সর্বশেষ দায়ভার শোধ করেছেন নব্বই বছর বয়সী তরুণ বিপ্লবী।

১৮৮০ সালে জন্ম নেয়া এই মহান পুরুষের রাজনীতির পূর্বসুরীদের খুজতে গেলে আমি মনে করি ফকির-সন্যাসী বিদ্রোহ ও তিতুমীরের বিদ্রোহের দিকে তাকাতে হবে। ইউরোপে যখন কমিউনিজম, সোস্যালিজম আইডিয়া হিসেবে জন্ম নিচ্ছিল বা তারও আগে এখানকার ফকির-সন্যাসীরা এক দফা প্রোলেতারিয়েত বিপ্লব করার চেষ্টা চালিয়ে ফেলেছিল। সেটা হোক না ব্যর্থ। কিন্তু এই ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বহারাদের উত্থানের পেছনে প্রথম বাঁশি বাজিয়েছিল ফকির-সন্যাসীরা। এই যে ‘প্রোলেতারিয়েত’ শব্দটি। তার বাংলা করা হয়েছে ‘সর্বহারা’, যাদের হারানোর কিছুই নেই। ফকির মানেও কিন্তু যাদের কোন সম্পত্তি নেই, সন্যাস গ্রহণ করা মানে সংসার, ধন-সম্পদ ও গৃহত্যাগ করা। আমাদের ফকির সন্যাসী আর প্রোলেতারিয়েতের মধ্যে কোন ফারাক নেই। মওলানা ভাসানী তাদেরই উত্তরসুরী।

ভাসানীর গুরুত্ব ভারতে মহাত্মা গান্ধীর মতো। এই যে বিশাল কৃষক সমাজ, যাদের পাশ্চাত্য শিক্ষা-দীক্ষা ছিলনা তাদেরকে একই ছায়াতলে আনতে হলে পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণা, রাজনীতি-বিজ্ঞান এনাফ ছিলনা। তারা সে ভাষা বুঝতে পারতো না। তারা প্রোলেতারিয়েত না বুঝলেও ‘মজলুম’ বুঝতো এবং তাদের মধ্যে ‘সাম্য বা ইকুয়ালিটি’ ধারণা স্পষ্ট না থাকলেও ‘ইনসাফ’ ব্যাপারটা পরিষ্কার ছিল। এই স্তরে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিবিদের চেয়ে ‘স্পিরিচুয়াল লিডারশিপ বা আধ্যাত্মিক নেতৃত্বে’ প্রয়োজন হয়। ভাসানীকে আমরা এজন্য একজন পীর হিসেবে, মওলানা হিসেবে, কৃষকনেতা হিসেবে, জমিদারী বিরোধি কৃষক হিসেবে দেখতে পাই।তিনি আসলে একজন Myriad Man, তিনি একটি ধাঁধাঁ, যাকে তার সমসাময়িক অনেক পণ্ডিত ও রাজনীতিবিদ ধরতে পারেনি এমনকি আমাদের সময়ের অনেকেই ধরতে পারেনি।

বিদেশের গণমাধ্যমে তাকে বলা হতো ‘Prophet of Violence’। হ্যা, এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নাই তিনি সেটা নন। তিনি জমিদারির ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছিলেন, ব্রিটিশদের ভারত থেকে তাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন, আবার পাকিস্তান জন্মের ১০ বছরের মাথাতেই ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলেছেন।

আইয়ুব খানকে যখন সড়ানো যাচ্ছিলনা, ১৯৬৮ সালে আগরতালা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে দেশের জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে যখন ফাসিতে ঝুলিয়ে দিচ্ছিল তখন মওলানা ভাসানীই ত্রাতা হিসেবে দেখা দিয়েছিলেন। এই অতি সাধারণ লুঙ্গি-টুপি পড়া কৃষক নেতাই পাকিস্তানের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক শাসক ও শক্তিশালী আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে আমরা ভাসানীকে সত্যিই প্রফেট অব ভায়োলেন্স আকারে দেখি! ১৯৫২ সালে যদি আমাদের স্বাধীনতার বীজ বপন হয় তাহলে ১৯৬৯ সালে সে গাছে ফুল ধরে এবং ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতার ফল লাভ করি।

ভাসানীকে নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা দরকার। আমাদের স্বাধীনতার ফাউন্ডারদের একজন, পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে বিদায় জানানো সাহসী নেতা ভাসানী আমাদেরকে এই দু:সময়েও অনেক সাহস দিতে পারেন। তার জীবন ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে ভোগ-বিলাসে মত্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ দেশের মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করার দীক্ষা নিতে পারে।

মওলানা ভাসানী ‘হক কথা’ এখনো আমাদেরকে হকের কথা বলে আসছে।

(S. M. Hall School of Economics- DU, ‘প্রোলেতারিয়েত পীর’ মওলানা ভাসানী। বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের ২৬তম পাবলিক লেকচারে দেয়া বক্তৃতার একাংশ-এডমিন)