মওলানা ভাসানী ও বাংলা ভাষা

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে দক্ষিণ টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে মওলানা ভাসানী মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ পদত্যাগ করায় আসনটি শূন্য হয়।

নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ পরেই শুরু হয় ব্যবস্থাপক সভার বাজেট অধিবেশন। ইতোমধ্যেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেবার দাবি উচ্চারিত হয়। ১১ মার্চ ভাষার দাবিতে ঢাকায় হরতাল পালিত হয়। হরতালের দিন ব্যাপক পুলিশি নির্যাতনে অসংখ্য মানুষ হতাহত হয়।

শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদসহ গ্রেফতার করা হয় সরকারি হিসেবেই ৬৫ জনকে। কয়েকদিন আগে ২৯ ফেব্রুয়ারিও কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছিলেন। এর চার দিন পরে ১৫ মার্চ পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশন বসলে ২৯ ফেব্রুয়ারি ও ১১ মার্চের ঘটনা নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা করা হয়।

১৭ মার্চ ভাসানী ভাষার প্রশ্ন উত্থাপিত করে সংসদে ইংরেজিতে আলোচনা না করে বাংলায় বলার দাবি জানান।

তিনি বলেন, “এখানে যাঁরা সদস্য আছেন তারা সকলেই স্বীকার করবেন যে, এটা বাংলা ভাষাভাষীদের দেশ, এই Assembly-র যিনি সদর (স্পিকার) তিনিও নিশ্চয়ই বাংলাতেই বলবেন। আপনি কি বলেন, আমরা তা কিছুই বুঝতে পারি না। আপনি যা বলেন তার সহিত সদস্যদের ডিসকাশনের কোনো সংশ্রব থাকতে পারে না। আপনি যদি বাংলায় রুলিং না দেন তাহলে আমরা আপনার আলোচনায় শরিক হব কি করে, আমি আশা করি, আপনি রুলিং দিবেন যেন সবাই বাংলাতেই বলেন এবং আপনিও বাংলাতে রুলিং দেবেন।”

ভাসানীর এই বক্তব্যের উত্তরে স্পিকার যখন বললেন যে, “যিনি যে ভাষা জানেন তিনি সেই ভাষায় বলবেন”। তখন তাঁর প্রতিবাদে তিনি “বাংলা ভাষাতেই যাতে সকলে বলেন তার ব্যবস্থা” করতে স্পিকারকে পিড়াপিড়ি করতে থাকেন।

১৯ মার্চ বাজেটের ওপর বিতর্কে অংশ নিয়ে ভাসানী প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।

এক পর্যায়ে তিনি রেগে গিয়ে বলেন, “আমরা কি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের গোলাম? বৃটিশ গভর্নমেন্টের গোলামী করি নাই। ন্যায়সঙ্গত অধিকারের জন্য চিরকাল লড়াই করেছি, আজও করবো। আমরা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে পাট উৎপাদন করবো, অথচ জুট ট্যাক্স, এমনকি রেলওয়ে ট্যাক্স, ইনকাম ট্যাক্স, সেলস ট্যাক্স নিয়ে যাবে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট। এইসব শতকরা ৭৫ ভাগ প্রদেশের জন্য রেখে বাকি অংশ সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টকে দেয়া হোক।”

সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের আইনসভায় ভাসানীর মতো সদস্যের উপস্থিতি ছিল ক্ষমতাসীনদের জন্য বিব্রতকর ও বিপদজনক। বিশেষ করে তিনি ছিলেন সরকারি দলেরই সদস্য।

ভাসানীর ভাষণে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের কায়েমি স্বার্থবাদীরা তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়। তাঁরা আবিষ্কার করে, ভাসানীর নির্বাচনে ত্রুটি ছিল সুতরাং তাঁর নির্বাচন বাতিল করা হোক। এই অভিযোগে এক মামলা দায়ের করেন এলাকায় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী করটিয়ার জমিদার খুররম খান পন্নী। সরকার এই ধরনের একটি অজুহাতের অপেক্ষায়ই ছিল। তাছাড়া অন্যান্যভাবেও ভাসানীকে হয়রানি করা হচ্ছিল। তিনি সরকারি দলের সদস্য হয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করছিলেন।

তাঁর বিরুদ্ধে সরকারী কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হতে যাচ্ছে এই আভাস পেয়েই তিনি ব্যবস্থাপক সভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেন। ভাসানী ও খান পন্নীসহ চারজন প্রার্থীর ওপর ১৯৫০ সাল পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পরবর্তীতে অবশ্য ‘বিশেষ ক্ষমতা বলে’ খান পন্নীর ওপর থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

মওলানা ভাসানী আসাম থেকে বাংলাদেশে এসে প্রথমেই ছাত্র-যুবসমাজের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। একদিকে কৃষক-শ্রমিক অন্যদিকে ছাত্র-যুব সমাজকে সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের নানা এলাকা ব্যাপকভাবে সফর করেন।

১৯৪৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত মওলানা ভাসানীর প্রথম জনসভা সম্পর্কে অলি আহাদ তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন, “মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ইস্ট হাউসের দক্ষিণ দিকের মাঠে অনুষ্ঠিত এক সভায় সর্বপ্রথম ভাষণ দান করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন হলের আবাসিক ছাত্র আবদুর রহমান চৌধুরী। মওলানার তেজোদীপ্ত ভাষণের মধ্য দিয়া এই সভায়ই সরকারবিরোধী ছাত্রশক্তি ও জননেতার মধ্যে যোগসূত্রের সূচনা হয়। আমরা বৃদ্ধ নেতার মধ্যে আগামী দিনের সম্ভাব্য নেতৃত্বের আভাস পাই, যাহা আমরা পাঞ্জাবের মিঞা ইফতেখারউদ্দিন কিংবা সিন্ধুর পীরজাদা আবদুস সাত্তারের বক্তৃতায় পাই নাই।”

[সূত্রঃ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সৈয়দ আবুল মকসুদ]