২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৫ই জুন, ২০২০ ইং

মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি: কাদের সিদ্দিকী

মে ১৮, ২০২০

ছেলেবেলা থেকেই বাউন্ডুলে ছিলাম। লেখাপড়ার চাইতে গরু পালা ছিল আমার কাছে অনেক প্রিয়। যতটা মাটিতে থাকতাম, গাছে গাছে ডালে ডালে পাতায় পাতায় তার চাইতে অনেক বেশি থাকতাম। লেখাপড়ার দিকে কোনদিনই মন ছিল না। পাঠ্য বই কখনো আমাকে টানতে পারতো না। কিন্তু গ্রামেগঞ্জের কথকরা ক্ষেতের আইলে বসে যেসব গল্প বলতেন, সেসব গল্প একবার শুনেই মনে রাখতে পারতাম।

মন দিয়ে লেখাপড়া করিনি কখনো। কারণ কোন পরিবেশ পাইনি। কলেজে গিয়ে কিছুটা আকৃষ্ট হয়েছিলাম। লেখাপড়ায় মন বসতেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ আমাকে কোথায় নিয়ে যায় আমি নিজেই জানিনা। এক সময় শ্রেষ্ঠ ফাঁকিবাজ দায়িত্বহীন দেশপ্রেমে আটকে গেলাম। সেই যে বন্দী হলাম আর মুক্ত হবার কোন পথ পেলাম না। স্বাধীনতার পর আমার পড়ালেখার আরো কোন পরিবেশ ছিল না। জীবনে আনন্দ ও স্বস্তি খুব একটা বেশি পাইনি।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলটাই আমার কিছুটা স্বস্তির সময়। বঙ্গবন্ধু নিহত হলে সব হারিয়ে নিঃস্ব রিক্ত হয়ে পিতৃহত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। প্রায় দুই বছর সমস্ত শক্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাই। এরপর জীবন আরো দূর্বিসহ হয়ে উঠে। ওদিকে শ্রী মোরারজী দেশাই, এদিকে জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। ৬- সাড়ে ৬ হাজার প্রতিরোধ যোদ্ধাকে শ্রী মোরারজী দেশাই জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের হাতে তুলে দেন। আমি কাটাই এক অসহনীয় জীবন।

তারই এক পর্যায়ে ’৮২-’৮৩ সাল থেকে বর্ধমানে “স্বাধীনতা ’৭১” মুক্তিযুদ্ধের উপর একটি বই লেখার প্রয়াসী হই। সেখানে কবি রফিক আজাদ, মাহবুব সাদিক, বুলবুল খান মাহবুব, কবি সায্যাদ কাদির, আবু কায়সার, অধ্যাপক শামসুল হুদা, অধ্যাপক শহিদুল হক দারুণ সহযোগিতা করেছিলেন। তারা মাসের পর মাস বর্ধমানে কাটিয়েছেন। স্বাধীনতা ’৭১ লিখতে, ছাপতে ও প্রুফ দেখতে গিয়ে বই ছাপার কিছু কলাকৌশল শিখেছিলাম। কেন যেন হঠাৎই হুজুর মওলানা ভাসানীর উপর একটা লেখার ইচ্ছে হয়েছিল।

প্রথম নাম দিয়েছিলাম ‘ভাসানীকে যেমন দেখেছি’। পরে আমার কাছে নামটা খুব পরিপূর্ণ মনে হয়নি। পরে দেশে ফিরে বইটি যখন পরিপাটি করে ছাপতে দিয়েছিলাম তখন নাম দিয়েছিলাম ‘মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি’। খুবই ছোট্ট বই। ৮০-৯০ পৃষ্ঠা হুজুর মওলানা ভাসানীকে নিয়ে, বাকীটা অন্যান্য প্রসঙ্গে। সংশোধিত আকারে প্রকাশের সময় কবি বুলবুল খান মাহবুবকে ভূমিকা লিখতে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি এক অসাধারণ ভূমিকা লিখেছেন।

বইটির ফ্ল্যাপে দু’কথা লিখেছে আমার বাল্যবন্ধু কবি সায্যাদ কাদির বাবর। কি করে যে ও আমাকে ছেড়ে আগেই চলে গেল জানিনা। কিন্তু চলে গেছে। আজ রফিক আজাদ নেই, সায্যাদ কাদির বাবর নেই, নেই আবু কায়সার,আরো অনেকে।

করোনায় গৃহবন্দী, তাই মন আনচান করছে হুজুরের নামে এই ছোট্ট বইটি প্রিয় পাঠকের সামনে তুলে ধরি।

—মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি—

(এক)

ভুমিকা

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বজন পরিচিত সম্মোহনীয় মোহাবিষ্ট একটি নাম। আর আমরা তার স্বাধীনতা যুদ্ধের সহযোদ্ধা, গুণমুগ্ধ সাথী। কাদের সিদ্দিকীর ঝঞ্জা বিক্ষুব্ধ কঠিন, কঠোর কোমলে মিশ্রিত জীবন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গণমানুষের চিত্ত জয়ের অপার ক্ষমতা বহু মানুষের মতো আমাদেরকেও মোহাবিষ্ট করেছে। সেই মোহ থেকে আজো মুক্ত হতে পারিনি এবং দিন দিন আরো গভীর থেকে গভীর ভাবে জড়িয়ে পড়েছি। কতবড় হৃদয়ের মানুষ হলে শত্রু-মিত্র, দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে নিঃসঙ্কোচে কাজ করা যায়।

যারা মুক্তিযুদ্ধে কাদের সিদ্দিকীকে না দেখেছে, তাদের পক্ষে তা কল্পনারও অতীত। ’৭৫ এর ১৫ই আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের একমাত্র প্রতিবাদকারী বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীই এক পর্যায়ে ভারতে নির্বাসিত জীবন যাপন করেন। যে কারণে বহুদিন আমরা তার প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত ছিলাম। কিন্তু তার সহমর্মিতা এবং ভালবাসা থেকে আমরা কেউ কখনও এতটুকুও বঞ্চিত হইনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা অন্য দল করতাম। আমাদের মত ও পথ ছিল ভিন্ন। আমরা অনেকেই ছিলাম মজলুম জননেতা মৌলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাসানীর অনুরক্ত ভক্ত। তিনি ছিলেন আমাদের দিশারী। তাই জনাব কাদের সিদ্দিকী যখন অতিদ্রুত সারা টাংগাইলে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন গড়ে তোলেন, তখন তার দলে যোগ দিতে আমরা অনেকেই ছিলাম দ্বিধান্বিত।

এছাড়া কিছুদিন আগে আমাদের রাজনৈতিক কর্মী গৌরাঙ্গীর হাতেম ‘কাদেরিয়া বাহিনীতে’ ভর্তি হতে গেলে তাকে বেদম প্রহার করা হয়। যদিও পরে তাকে মুক্তিবাহিনীতে নেয়া হয়েছিল এবং সে তার নিজের যোগ্যতা বলে স্বয়ং কাদের সিদ্দিকীর এত ঘনিষ্ঠ হয়েছিল এবং তাঁর হৃদয় জয় করেছিল যে কারণে মাকরাইয়ের যুদ্ধে হাতেম যখন শাহাদৎ বরণ করে তার কবরের পাশে আমাদের সর্বাধিনায়ক মুক্তিযুদ্ধে কোটি মানুষের আশা ভরসার কেন্দ্রস্থল লৌহ কঠিন মানুষটি শিশুর মতো জারজার হয়ে কেঁদেছিলেন।

‘কাদেরিয়া বাহিনীতে’ সদস্য ভর্তির পদ্ধতি ছিল ভীষণ কঠিন। যোগদানের পর নিজেও দেখেছি যে কাউকে ‘কাদেরিয়া বাহিনীতে’ ভর্তি হতে কত কঠিন পরীক্ষার ভিতর দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু আমাদের দলের সদস্য হাতেম নির্যাতিত হওয়ায় আমরা মনে করেছিলাম ভিন্ন মতাদর্শী বলেই কি তাকে নির্যাতন করা হয়েছে? আমরা গেলেও কি আমাদের নির্যাতন করা হবে? কিন্তু সাহস করে আমি যেদিন ভর্তি হয়েছিলাম, আমাকে তেমন কোন পরীক্ষাই দিতে হয়নি। হয়তো স্বয়ং কাদের সিদ্দিকীর কাছে ভর্তি হওয়ার কারণেও হতে পারে।

শুধু তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি কি পারবেন এমন কঠিন কাজ করতে?’ কিন্তু আমি পেরেছি। আমি যে পেরেছি তা যুদ্ধের ময়দানে যেমন বহু জায়গায় সবাইকে উৎসাহিত করার জন্যেই হোক অথবা সত্য প্রকাশের জন্যেই হোক অকপটে বলেছেন। যুদ্ধের পর আজ পর্যন্তও আমরা যে পারি, আমাদেরকে যে বিশ্বাস করা যায় এ কথাটি কখনও তিনি অস্বীকার করেননি। তাই বলছি, কাদের সিদ্দিকী, তাঁর উদাহরণ তিনিই। এই দেশে তার আর কোন দ্বিতীয় উদাহরণ নেই। মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত সময়টা জুড়ে তিনি আমাদের মত পথের কথা একবারও জিজ্ঞেস করেননি। আমরা ভিন্ন দল, ভিন্ন মত ও ভিন্ন পথের ছিলাম বলে কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতে, যুদ্ধে পাঠাতে কিংবা অস্ত্র দিতে কোন বৈষম্য করেননি।

মওলানা ভাসানীর আরেক ভক্ত আমার গুণমুগ্ধ গৌরাঙ্গীর আশরাফ গিরানী, সেতো তার অস্ত্র শিষ্য। তার একেবারে একনিষ্ঠ অনেক কর্মীদের চাইতেও তিনি আশরাফ গিরানীকে অনেক বেশী বিশ্বাস করেছেন, এখনও করেন। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে কাদের সিদ্দিকীর আত্মগোপনের কথা যে গুটি কতক মানুষ জানতো তার মধ্যে আশরাফ গিরানী ছিল অন্যতম।

(দুই)

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম প্রবাসে থাকতে হুজুর মওলানা ভাসানীর উপর তার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় “মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি” খুবই সুপাঠ্য একটি বই লিখেছিলেন। বইটি হাতে পেয়ে এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করেছিলাম। বইটি পড়ে ভীষণ অভিভুত হয়েছিলাম। কারণ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম- এর ছোটখাটো লেখা পড়লেও তার কোন বই পড়িনি। তবে ওর আগে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে বেশ কিছুদিন তার সাথে “স্বাধীনতা ’৭১” নিয়ে লেখা-লেখি কাটা-ছেড়া করে তার চিন্তা চেতনা ও মননের একটা ঠিকানা পেয়েছিলাম।

’৭১-এর অস্ত্র হাতে কাদের সিদ্দিকী পাকিস্তান হানাদারদের কাছে যতখানি ভয়ংকর ও সফল সমর নায়ক ছিলেন, কলম হাতে চিন্তা চেতনা ও মননেও তিনি একেবারে ফেলনা না।

বেশ কিছুদিন যাবৎ শুনছিলাম, “মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি” বইটি বাজারে দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় বৃহত্তর কলেবরে আবার ছাপার চেষ্টা হচ্ছে। এজন্যে আমিও খুব আশায় ছিলাম বইটি আবার নতুন কলেবরে প্রকাশিত হলে আবার চোখ বুলাবো।

কিন্তু সেদিন হঠাৎ বঙ্গবীর আমার টাংগাইল সদর রোডের বাসায় এসে হাজির। তাঁকে দেখে খুবই অভিভূত হয়েছিলাম। এমনিতেই তিনি খুব আন্তরিক মানুষ। সকলের সাথেই আপনজনের মতো ব্যবহার করেন। আমি অসুস্থ হওয়ায় তার সে অফুরন্ত মায়া ও আন্তরিকতার স্পর্শ মনে হয় আরো বেশী পাই।

ড্রয়িং রুমে পাশাপাশি বসতেই তিনি বললেন, ‘বুলবুল ভাই (এখানে বলে রাখা ভালো আমি তার সহযোদ্ধা হলেও উনি সব সময় আমাকে বুলবুল ভাই বলেই ডাকতেন, এখনো তাই ডাকেন।) “মৌলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি” বইটিকে একটু ঝেড়ে মেজে আবার ছাপতে চাই। এর মুখবন্ধটা আপনি লিখুন।’

তার প্রস্তাব শুনে বিষ্মিত হয়েছিলাম। আমার প্রতি কেন তার এত আস্থা! বর্তমানে আমি অনেকটাই অসুস্থ। প্রায় জীবন মৃত্যুর কাছাকাছি আমার বসবাস। তারপরও আমাকে মুখবন্ধ লিখতে প্রস্তাব দিলেন। অন্য কাউকে কি এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন? কোথাও কি ব্যর্থ হয়ে আমাকে বলছেন? মনে হয় না।

বঙ্গবীর তো সে ধরণের লোক না। তবে এই বইয়ের মুখবন্ধ লিখতে আমাকে কেন নির্বাচিত করছেন। বাংলাদেশের বহু স্বনামধন্য লেখক সাহিত্যিক অনেকেই তার দলে ছিলাম। তার বিশ্বজোড়া খ্যাতি। গেরিলা যুদ্ধে হোচিমিন, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারার সাথে তার নাম এখনও স্বগৌরবে উচ্চারিত হয়।

এমন বিখ্যাত লেখকের বইয়ের মুখবন্ধ লেখাতো এক ভাগ্যের ব্যাপার।

আর কবি রফিক আজাদ, কবি মাহবুব সাদিক, কবি সায্যাদ কাদির, অধ্যক্ষ আতোয়ার রহমান, কবি আবু কায়সার, প্রখ্যাত নাট্যকার মামুনুর রশীদ এ ধরণের ত্রিশ-চল্লিশ জন তো তার বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধাই ছিলাম। তাই আমাকে এই বিরল সম্মানে সম্মানিত করায় আমি খুবই আপ্লুত ও অভিভুত হই। গুরুদায়িত্ব পেয়ে যতবার লেখার কথা চিন্তা করেছি, ততবার মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন একটি গুরুদায়িত্বের কথা আমার বারবার মনে পড়ে।

১২ই আগস্ট ১৯৭১ সাল। গত তিন দিন ধরে আমাদের উপর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বিমান থেকে বোমা ফেলা ও মেশিনগান থেকে গুলি করে চলেছে। ভ‚য়াপুর ঘাটির আশেপাশে গাছপালা প্রায় পাতা শূন্য হয়ে পরেছে। তখনো আমরা টিকে আছি আমাদের একমাত্র ভরসা সর্বাধিনায়ক আমাদের পাশে আছেন। সত্যিই সে এক অবাক কাণ্ড। তার নির্দেশে সুতার টানে ঘুড়ী উড়ার মতো মুক্তি বাহিনী নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। পাকিস্তানী হানাদারদের এত গুলাগুলি ঘর-দুয়ার গাছপালা উড়ে, ভেঙ্গে, কেটে খানখান। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধারও কোন ক্ষতি হয়নি। এলাকায় একজন লোকও নিহত হয়নি। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর তিন দিনের গোলাগুলিবর্ষনে একজন মুক্তিযোদ্ধার পায়ে একটি গুলি লেগেছে, একটি গরুর বাচ্চা মারা গেছে, অন্যদিকে দুইজন সাধারণ মানুষ সেলের টুকরো লেগে সামান্য আহত হয়েছে।

১২ই আগস্ট গভীর রাতে সিদ্ধান্ত হয় মুক্তিবাহিনী সাময়িকভাবে ভ‚য়াপুর ঘাটি ছেড়ে দেবে। মাটিকাটা যুদ্ধে দখল করা অস্ত্র, যতটা সম্ভব নিরাপদে লুকিয়ে রাখা হবে, বাকীটা নিয়ে যাওয়া হবে পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ী এলাকায়। ১২ তারিখ রাত ১০টা থেকে অস্ত্র লুকানো এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সুশৃংখলভাবে ভুঞাপুর ত্যাগ শুরু হয়েছিল।

আর মুক্তিযোদ্ধাদের ভুঞাপুর ত্যাগের সার্বিক ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বই দেয়া হয়েছিল আমাকে। নৌকা সংগ্রহ করা, পথ প্রদর্শক ঠিক করা এসব কাজ করছিলাম আমরা কয়েকজন। সঠিক নেতৃত্ব থাকলে কতবড় কাজ যে কত সহজে করা যায় তা মরমে মরমে উপলদ্ধি করছিলাম সেদিন।

১২ তারিখ রাত থেকে ১৩ই আগস্ট প্রায় সন্ধ্যা কখনো কোন বিরাম ছিল না। অনুমান সাড়ে পাঁচটা হবে সর্বাধিনায়ক এলেন ভুঞাপুরের উত্তরে কালিহাতি জিজ্ঞিরাম নদীর ঘাটে। তার সাথের প্রায় শতাধিক যোদ্ধার জন্যেও কয়েকটি নৌকা আগেই প্রস্তুত করা ছিল। তিনি ঘাট পাড়ে এলে যথারীতি তাকে সামরিক অভিবাদন জানানো হলো। তার অগ্রবর্তী দল নৌকায় উঠে গেলে। পরে যাদের উঠার কথা তারা পিছনে অনেক দূরে পজিশনে রইলো। আমিও তাকে যথা নিয়মে সালাম জানালাম। তিনি হাসিমুখে সালাম গ্রহণ করলেন। সর্বাধিনায়কের নৌকা যখন ছেড়ে দিচ্ছিলো তখন আমি তার সাথে হাত মিলিয়ে নদীর পাড়ে উঠতে যাচ্ছিলাম। আমার সাথে তখনো ৬-৭ জন সহযোদ্ধা।

সর্বাধিনায়ক হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, আপনি ওদিকে যাচ্ছেন কেন? বললাম, আরো যদি কেউ থাকে তাদের ব্যবস্থা করতে হবে তো?

আমার কথা শুনে সর্বাধিনায়ক হয়তো বিষ্মিত হয়েছিলেন, আবার দায়িত্ববোধের কথাও হয়তো ভেবেছিলেন। তিনি বললেন, না, আর কেউ আসবে না। সবাই চলে গেছে। আসুন, আপনিও নৌকাতে উঠুন। যোদ্ধাদের নিয়ে আমিও নৌকাতে উঠে পড়লাম।

যুদ্ধের বহু স্মৃতি বিজড়িত কদ্দুস নগর ভুঞাপুরকে আলবিদা জানিয়ে আমরা চললাম পাহাড়ে, মুক্তিযুদ্ধের দূর্ভেদ্য ঘাটির দিকে। রাত গভীর হয়ে যাওয়ায় এবং সঠিক ও নিখূত খবরাখবর না থাকায় টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অতিক্রম করা মনে হয় সর্বাধিনায়ক সমুচিত মনে করেননি। তাই ঘাটাইলের গর্জনায় এক মেম্বার বাড়িতে তিনি রাত কাটাবার জন্যে উঠলেন।

যুদ্ধ কৌশল অনুসারে তার দলকে আশপাশের বেশ কয়েকটি বাড়ীতে ভাগ বন্টন করে দেয়া হয়েছিল। শেষ রাতের দিকে জানা গেল আগের দিন পাঠিয়ে দেয়া বেশ কয়েকটি কোম্পানী টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ রাস্তা অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধের চারণভুমি পাহাড়ী এলাকায় যেতে পারেনি। তারা ঐ গ্রামেই আশ্রয় নিয়েছে।

বঙ্গবীর যে বাড়ীতে উঠেছিলেন সে বাড়ী ছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দালাল এক বিডি মেম্বারের। সে বোধ হয় তখনো কাদেরিয়া বাহিনীর যুদ্ধ ক্ষমতা সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারেনি। আর বঙ্গবীর যে যুদ্ধ কৌশলে কত সুচতুর তাও হয়তো তার জানা ছিল না। খাসী জবাই করে রান্নার যোগার-যন্ত্র করে বাড়ীর বৌ পোরাপানদের কৌশলে সরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা নিয়ে সে হানাদার ক্যাম্পে খবর দিতে গিয়েছিল। ৩-৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও যখন রান্না হলো না, তখন তিনি সব কমান্ডারদের ডেকে বাড়ীর মালিকের ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিলেন। মুক্তিযোদ্ধারা এমনিতেই সব সময় সতর্ক থাকতো। তারপর সর্বাধিনায়কের সরাসরি নির্দেশ-এ এক দুর্লভ ব্যাপার।

টাঙ্গাইল মুক্তিযুদ্ধে কাদের সিদ্দিকীর কোন নির্দেশ বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম হয়েছে তা কল্পনাও করা যায়নি।

(তিন)

সকালের দিকে মুক্তিযোদ্ধারা নিজস্ব ব্যবস্থায়ই খেয়ে নিয়েছিল। ১৪ তারিখ সকাল ১০-১১ টার দিকে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল কিছু সময়ের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর একটি হানাদার আক্রমন হতে চলেছে। সকলেই প্রস্তুত ছিল।

ঘাটাইল থানার গর্জনা গ্রামের চারিদিকে থৈ থৈ পানি, হানাদাররা যেদিক থেকেই আসুক, মুক্তিযোদ্ধারা সতর্ক থাকলে তাদের পক্ষে এটে উঠা সম্ভব ছিল না। কাদেরিয়া বাহিনী তখন যুদ্ধ করতে করতে পাকিস্তান হানাদারদের চাইতেও যুদ্ধ বিদ্যায় অনেক বেশি পারদর্শী।

১২টা সাড়ে ১২টার দিকে প্রথম আক্রমন হলো কমান্ডার বেনু ও খোরশেদ আলম কোম্পানীর উপর। কমান্ডার বেনু ও খোরশেদ আলম সর্বাধিনায়ক যে বাড়ীতে ছিলেন সে বাড়ী থেকে ৪-৫’শ গজ পূব-দক্ষিণে অবস্থান নিয়েছিল। হানাদার বাহিনী কিভাবে যে বেনু এবং খোরশেদ আলমের কোম্পানীর আশ্রয়স্থলে তাদের চোখে ধুলি দিয়ে মাটিতে নেমে পড়েছিল তা তারা বুঝতে পারেনি।

হানাদার বাহিনী ১০-১৫ গজের মধ্যে চলে এলে আচমকা তাদের দেখে প্রথম অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা ভড়কে গেলেও গুলি ছুড়তে দ্বিধা করেনি। মুক্তিযোদ্ধাদের এলোপাথাড়ী গুলিতে মুহূর্তের ১০-১৫ জন হানাদার মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তারা হতভম্ব হয়ে যায়। খুব সম্ভবত ওরকম এলোপাথাড়ী গোলাগুলিতে তারা আর কখনো পড়েনি।

হানাদাররাও যে দু’চারটি গুলি ছুড়েনি তা নয়। তাদের প্রথম এক ঝাক গুলীতে কমান্ডার খোরশেদ আলম গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার সহযোদ্ধারা ঘাবড়ে না গিয়ে কমান্ডারকে একটি ঘরের আড়ালে নিয়ে যায়। খোরশেদ আলমের পেটে এবং ডান হাতের বাহুতে দুটি গুলি লেগে এফোড় ওফোড় হয়ে যায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই যুদ্ধ থেমে যায়।

২৫-৩০টি বন্দুক এবং ১০-১২টি লাশ ফেলে হানাদাররা পালিয়ে যেতে থাকে। নৌকায় চড়ে পালিয়ে যাবার সময় চারিদিক থেকে আক্রমনে তারা প্রায় সবাই হতাহত হয়। ৯-১০ নৌকা ভর্তি যে হানাদার এসেছিল তাদের একটি নৌকাও ফিরে যেতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে সব কয়টি ডুবে গিয়েছিল। গর্জনার এই যুদ্ধে ৬০-৭০ জন হানাদার ও রাজাকার আহত নিহত হয়েছিল। আমাদের তখন হানাদারদের লাশ হিসেব করার সময় ছিল না। শুধু ফেলে যাওয়া অস্ত্র তুলে নেয়াই ছিল আমাদের লক্ষ্য।

যুদ্ধ থেমে গেলে সর্বাধিনায়ক খবর পান কমান্ডার খোরশেদ আলম গুরুতর আহত হয়েছে। আর স্মৃতি, মতি, আসলাম ও আসালত সহ কয়েকজন দুধর্ষ যোদ্ধাকে খুজে পাওয়া যাচ্ছেনা। ঐ দুঃসময়েও কালিহাতির খন্দকার নুরুল ইসলাম হারিয়ে যাওয়া যোদ্ধাদের খুজতে গেলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বিলের গভীর পানি থেকে তাদের তুলে নিয়ে এলেন।

তিন চার ঘন্টা কচুরিপানা ভর্তি বিলের ঠান্ডা পানিতে শুধু নাক উচিয়ে ডুবে থাকায় তাদের একেবারে মরণ দশা। এক জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে ছেড়া কাপড়-চোপড় ও কাথা দিয়ে গরম করে তাদেরকে বাঁচানো হলো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই কমান্ডার খোরশেদ আলমকে আনা হলো সর্বাধিনায়কের কাছে। বাশের মাঁচায় শুয়ে আহত কমান্ডার খোরশেদ আলম তাঁর হাত চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘আপনি আমার ধর্ম বাপ, আমাকে ফেলে যাবেন না।’

তিনি খোরশেদ আলমের মাথায় হাত দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করলেন, তার নিরাপত্তার জন্যে তার সমস্ত বাহিনীও যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাও তিনি করবেন তবুও আহত যোদ্ধাকে ফেলে যাবেন না। পরবর্তীতে দেখলামও তাই।

রাস্তা অতিক্রমের পরিকল্পনা নেয়া হলো। তখন যেহেতু বঙ্গবীরের কাছাকাছি ছিলাম, তার পরিকল্পনার অনেকটাই বুঝতে পারছিলাম। সন্ধ্যার পর পরই তিনি টাংগাইল-ময়মনসিংহ সড়ক পশ্চিম দিক থেকে পূব দিকে অতিক্রম করতে চান। তার ইচ্ছা যতটা সম্ভব নির্বিগ্নে রাস্তা পার হওয়া।

আর যদি সম্ভব না হয় প্রয়োজনে যুদ্ধ করে পার হবেন।

তবে সে সময় কাদেরিয়া বাহিনীকে কোন দিকে যাওয়ার পথ অবরুদ্ধ করা বা বাধা দিয়ে আটকে রাখার ক্ষমতা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ছিল না। আমাদের বহরে তখন সর্বাধিনায়কের সঙ্গের প্রায় একশ জন দুর্ধর্ষ যোদ্ধাসহ হাজার বারোশ মুক্তিযোদ্ধার ৪-৫টি কোম্পানী। এর মধ্যে শুধুমাত্র কমান্ডার খোরশেদ আলম আহত, তাছাড়া আর সবাই ঠিকঠাক। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মনোবলও কোন চির ধরেনি।

মুক্তিযোদ্ধারা আস্তে আস্তে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ রাস্তার কাছাকাছি হতে থাকলো। সর্বাধিনায়ককে অনুসরন করা ছাড়া তখন আমাদের আর তেমন কোন কাজ ছিল না। ১৪ই আগস্ট রাত সাড়ে সাতটার মধ্যে আমরা নিরাপদে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ পাকা সড়ক পার হলাম।

ঘাটাইলের পোড়াবাড়ীর পূর্বদিকে পাহাড় কাছড়ায় বটতলা বাজারের মাইল খানেক পুবে আবার এক মেম্বার বাড়ীতে আমাদের নিয়ে তোলা হলো।

কমান্ডার খোরশেদ আলমের গুলি লেগেছে বেলা দেড়টা দুইটার দিকে কিন্তু তখনো তাকে কোন ঔষধ দেয়া হয়নি। বটতলা মেম্বার বাড়ী গর্জনা মেম্বার বাড়ীর মতো ছিল না। ওটা ছিল পাকিস্তানের আর এটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। গরম পানি করে ক্ষতস্থান ধোয়া হলো। কিছু ঔষধপত্রের ব্যবস্থা হলো। অন্যদিকে প্রায় তিন-চার মাইল জায়গা জুড়ে অবস্থান নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের এক ঘন্টার মধ্যে ডাল ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। রাতটা কাটলো আমাদের ভাল ভাবেই।

পরদিন সকালে ছনখোলা ইউনিয়ন পরিষদের সামনে সর্বাধিনায়ক ডঃ নূরুন্নবী ও আমাকে সহ কয়েকজনকে ডেকে খোরশেদ আলমকে হেড কোয়াটারে পৌছানোর নির্দেশ দিলেন। আসলে সে সময় হানাদার মুক্ত এলাকায় এমনভাবে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন গড়ে উঠেছিল যেমন, মায়ের কোলে বাচ্চা নিরাপদ বোধ করে, তার কোন অসুবিধা হয়না, আমাদেরও তেমনই হয়নি।

আহত খোরশেদ আলমকে চাঙ্গারীতে করে বহন করা, যেখানে নৌকায় যাওয়া সম্ভব সেখানে আগে থেকেই নৌকার ব্যবস্থা, ঔষধপত্র, খাওয়া-দাওয়া এসবেরই ভোভাজীর মতো সেচ্ছাসেবক কমান্ডাররা ব্যবস্থা করে চলেছিলেন।

আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব আহত খোরশেদ আলমকে মুক্তিবাহিনীর হেড কোয়াটারে পৌছাতে আমরা ভালভাবেই সফল হয়েছিলাম।

এ প্রসঙ্গে ‘জখমী সাথীকে নিয়ে আমরা দশজন’ একটি কবিতাও লিখেছি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আহত কমান্ডারকে যথাস্থানে সফলভাবে পৌছানোর কারণেই কি তিনি আমাকে “মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি” বইটির মুখবন্ধ লেখার উপযুক্ত মনে করেছেন? নাকি অন্য কোন কারণে। কারণ যাই হোক এ দূর্লভ সুযোগে আমি গর্বিত।

হুজুর মওলানা ভাসানীর দলভক্ত না হওয়ার পরও তাঁকে অমন গভীরভাবে ভালবাসতে পারা, মান্য করা, এ এক বিরল দৃষ্টান্ত। যা স্থাপন করা আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়, শুধু মাত্র বঙ্গবীরের পক্ষেই তা সম্ভব। সেই সম্ভবটিই তিনি যথাযথ বাস্তবায়ন করেছেন। তাই এত অসুস্থ শরীর নিয়েও আমি দু’কলম লিখতে উৎসাহবোধ করছি।

স্বাধীনতা উত্তর দিনগুলোতে বঙ্গবীরকে নিয়ে অনেক সময় অনেক কথা হয়েছে। হুজুরের সাথে তার সম্পর্ক নিয়েও কথার অন্ত ছিল না। এখানে তাই দু’চারটি কথা তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছিনা তাই তুলে ধরছি

সদ্য হানাদার মুক্ত টাংগাইলের এক সুন্দর সকাল। রিক্সায় চড়ে ছুটে চলেছি সন্তোষের বহু পরিচিত পথে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সকালে-দুপুরে-বিকেলে-সন্ধ্যায় বারবার গেছি সন্তোষে, আফ্রোএশিয়া, লাতিন আমেরিকার মজলুম মানুষের নেতা মওলানা ভাসানীর সান্নিধ্যে। কখনো তিনি ডেকে পাঠিয়েছেন আবার কখনো নিজের অথবা দল ও দেশের প্রয়োজনে।

টাঙ্গাইল থেকে সন্তোষের মাত্র তিন কিলোমিটার পথ উপমহাদেশের বহু সংগ্রামী নেতার পদচিহ্ন ধারণ করে গর্বিত অস্তিত্ব ঘোষণা করছে বহুযুগ ধরে। শুধু রাজনৈতিক নেতাই বা বলি কেন? শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক জগতের বহু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বের পদধুলি পড়েছে এ’পথে। কিন্তু আজকে সেই বহু পরিচিত তিন কিলোমিটার পথই কেমন যেন আমার কাছে কিছুটা অন্যরকম নতুন নতুন লাগছে। বদলে গেছে হানাদার মুক্ত দেশ, মানুষ, পরিবেশ সবকিছু। তাই পথই বা অন্যরকম লাগবেনা কেন?

গতকাল যদিও নয় মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা প্রথম গিয়েছিলাম মওলানা ভাসানী কাছে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর আগ্রহে তার সাথী হয়ে, আবার নেতার আহবানে একাকী যাচ্ছি এই প্রথম।

(চার)

গতকাল কাদের সিদ্দিকী মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তার সবচেয়ে স্মরণীয় এবং ভালো কাজটি করেছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইল-পাবনা-ময়মনসিংহ ও ঢাকার একটি উল্লেখযোগ্য মুক্তাঞ্চলের সবচেয়ে বেশি যুদ্ধের অধিনায়ক; আমার দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে সফল সংগঠক ও অধিনায়ক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী (পরবর্তী সময়ে একমাত্র বেসামরিক ব্যক্তি বীরোত্তম উপাধিতে ভূষিত)। গতকাল আমাদের বেশ কয়েকজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে ১৯৫৭ সনে কাগমারী সম্মেলনে ও পল্টনে পাকিস্তানকে আস্সালামু আলাইকুম জানানোর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্খার বীজটি যিনি প্রথম বুনেছিলেন এবং সত্তর সনের শেষার্ধ্ব থেকে একাত্তরের ২৫শে মার্চ পর্যন্ত মুক্তি আসবে কোন পথে ব্যালটে না বুলেটে?

“বুলেটে বুলেটে” এই গানে মুখর করে তুলেছিলেন পূর্ব বাংলার নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জকে এবং যুদ্ধই যে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ‚্যদয়ের অনিবার্য পথরেখা সেই পথ নির্দেশ করেছিলেন; যিনি তার সন্তানতুল্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ’৭০-এর নির্বাচনী পথকে নিষ্কন্টক করার জন্য এক মহাপরিকল্পনার পথে পূর্ব পাকিস্তানকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। নতুন একটি দেশের যুগপৎ স্বপ্নদ্রষ্টা ও ধাত্রীর ভুমিকা পালনকারী মওলানা ভাসানীর সাথে দেখা করে তার দোয়া নিতে।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মহানায়ক আব্দুল কাদের সিদ্দিকী ও মজলুম জননেতার সেই মহামিলন ও সাক্ষাতের মূহুর্তটির স্বাক্ষী আমিও একজন। একদিন পরেই অতি প্রত্যুষে হুজুরের সাথে দেখা করার নির্দেশ আমার মধ্যে দু’একটি প্রশ্নের জন্ম দিলেও বিষ্মিত হইনি। এ’ধরণের নির্দেশ পালনে আমি বহু বছর ধরেই অভ্যস্ত।

সালাম করতেই তিনি বললেন, ‘বসো।’
বসলাম।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। বলা যায় খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলেন পা থেকে মাথা পর্যন্ত। কিছুটা অস্বস্তিবোধ করছিলাম।

– দেশতো স্বাধীন হইছে, চুল-মোছ কাটবা না।
জ্বী হুজুর কাটবো।

এরপর টুকটাক অনেক কথাই বললেন।

গতকাল কাদের সিদ্দিকী সহ সবার সঙ্গে যখন এসেছিলাম তখনও এ’সব কথা তিনি বলেছিলেন।

পাকিস্তানের সংবিধানের আইন আর ইয়াহিয়া খানের ফৌজি আইন মেনে নির্বাচন করে জেতা এম,এন,এ, আর এম,পি,এ-দের নিয়ে গড়া মন্ত্রীসভার স্বাধীন বাংলাদেশ শাসন করার কোন অধিকার নেই। তবু মেনে নিয়েছি, স্বাধীনতা বিরোধীদের সুবিধা যাতে না হয়।

– জানো কলিকাতায় বসেও এরা মন্ত্রী হবার জন্য ঝগড়া করেছে। আর দুই ন্যাপ, কমিউনিস্ট আর মুজিবরের ছাত্র নেতারাও মন্ত্রী হবার চায়।

যুদ্ধ করছে কাদরী আর মান্নানরা, (মান্নান ভুঞা) তোমরা দেশে থাইকা জীবন দিয়া শত্রুর মোকাবেলা করছ, আর ওরা কোলকাতায় বইসা ঝগড়া করছে, খাসলাত কোথায় যাবে।

আমি তো ভারতে প্রায় বন্দীই ছিলাম, ‘নজরবন্দী’।

আবার যত্নও করছে খুব-নেহেরুর বেটি ইন্দিরা। তো তাজউদ্দিীনের বিরুদ্ধে অনেকেই ক্ষেপা, তাদের মন্ত্রী করেনা কেন?

আমি ধমক দিয়া ক্ষমতা ভাগের ঝগড়া থামাইলাম। সর্বদলীয় সভায় বললাম, “আওয়ামীলীগই ক্ষমতায় থাকবে, তাজউদ্দীনরে ডিসটার্ব করা যাইবো না।”

আমি চুপ করে শুনেছিলাম। জানি, হুজুর এসব কথা বলার জন্য ডাকেননি। আসল কথা বলবেন সময় হলেই।

-বুলবুল।
জ্বী হুজুর।

– কাদ্রী (কাদের সিদ্দিকী) তো মুজিবরের দল করে। তোমরা একসাথে হইলা কেমনে। কাদরী কি তোমাদের সাথে মন খুইলা সমান ব্যবহার করছে, না আলাদা আলাদা ভাবছে?

না, হুজুর। মুক্তিবাহিনীতে কে কোন দল তা পার্থক্য ছিল না। সেখানে তো দলবাজীর বক্তৃতা নয়, ছিল জীবনবাজী রেখে কাজ করার উন্মাদনা।

কাদের সিদ্দিকী নিজেও যেমন জীবনের মায়া করেনি তেমনি যারা দেশপ্রেমিক তাদের গুণের মর্যাদাও দিয়েছেন।

-হ্যাঁ, কাদরীরে দেইখা অল্প-স্বল্প কথা শুইনাই বুঝতে পারছি, আল্লা ওরে বড় বানাইছে কেন।
এখন তোমরা ওর সাথে থাকবা, ওর সামনে আরো যুদ্ধ আছে। আমি চমকে উঠলাম।

কিন্তু হুজুর যুদ্ধ তো শেষ।
– না, বুলবুল, এ’যুদ্ধ সে যুদ্ধ না।
কার সঙ্গে যুদ্ধ হুজুর।

– কাদরী দেশের মইধ্যে থাইকা, পাবলিকের সাথে মিশা কৃষক, মজুর, সাধারণ মানুষরে মুক্তিযোদ্ধা বানাইয়া যুদ্ধ করে নাই? তুমিতো আমার থিকা ভালো জানো।
জ্বী, তা করেছে হুজুর।

– এখন দেখবা, আওয়ামী লীগের মধ্যে বইসা থাইকা আরাম করনেঅলা, কলিকাতার তাস খেলার দল একটু জুৎ হইয়া বসার পরই কাদরীকে মানবো না। তোমারে ডাকছি। সবাইরে নিয়া কাদরীর সাথে থাকো।

কিন্তু আমি তো আওয়ামী লীগ করবো না হুজুর।

– আরে তোমারে কি আওয়ামী লীগ করবার কইছি। কাদরীই কি ন্যাপ করবো। আর কম্যুনিস্টরা তো সত্যিকারের দেশপ্রেমী-সৎ, কিন্তু একদল দশ নেতা। নইলে স্বাধীনতার কথা কইলাম আমি, লাল টুপীর জোর কম আছিল নাকি?

আওয়ামী লীগ সব ক্রেডিট একাই নিবার চায়।

তোমরা কাদরীর সাথে থাইকা যুদ্ধ করছো। ওর সামনে যদি মাইর প্যাচের রাজনীতি আসে তো তোমাদের কাজ তোমরা করবা না? মুক্তিযুদ্ধের মতো একসাথে থাকলে আর কাদরী গরীবের কথা না ভুললে সমাজতন্ত্রই কায়েম হবে। বুঝলাম হুজুর ডেকেছেন কেন।

এরপর আর আমাদের লাগে নাই।

হুজুরের সাথে কাদের সিদ্দিকীর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক এমন নিবিড় পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল যে, আমরা দু’একজন ছাড়া কি আওয়ামী লীগ অথবা ন্যাপ এর নেতাকর্মীদের অনেকেরই মনে জ্বালা ধরে যেতো।

এ’সম্পর্ক ভাঙ্গার জন্য ঘরে বাইরে ষড়যন্ত্রও কম হয়নি। কিন্তু যার হাত ধরে উপমহাদেশের অনেক নেতা মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতিতে পথ চলা শুরু সেই মৌলানা ভাসানী আর মুক্তিযুদ্ধকে যে অধিনায়ক জনযুদ্ধে পরিণত করেছিল সেই কাদের সিদ্দিকীর সম্পর্ক চিড় ধরাতে পারেনি কেউ।

মওলানা ভাসানীকে যেমন মনে প্রাণে শ্রদ্ধা করতেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা তেমনি মওলানা ভাসানীও অন্তর থেকে ভালবাসতেন তার কাদরীকে।

কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তমের লেখা “মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি” বইটির দ্বিতীয় সংষ্করণ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।

প্রথম সংষ্করণ পড়েছিলাম এক নিঃশ্বাসে। এবার পান্ডুলিপি পড়ার সময় তাঁর ব্যতিক্রম ঘটেনি।

লেখকের সহজবোধ্য ভাষা এবং অকৃত্রিম প্রকাশভঙ্গীর জন্য যে কেউ অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে উঠতে পারবেন না। আমি তো পারিনি। এতদিন পর বইটি নতুন করে পড়তে পড়তে মন আমার নষ্টালজিক হয়ে গেছে বার বার। বিশেষ করে আমাদের জীবনের এক ফেলে আসা অধ্যায় কাছে থেকে দেখা এবং ঘটে যাওয়া কিছু হাসি-কান্না, দুঃখ ব্যথার মিশেল দেয়া সেইসব সত্য ঘটনাগুলি যেন নতুন করে আমাকে শিহরিত করেছে।

আজতো ঘটমান ঘটনার বর্তমান নয়। এযে পিছু ফিরে দেখা। উত্তম পুরুষে লেখা জনাব সিদ্দিকীর অভিজ্ঞতার অনুভ‚তির বর্ণনা অনেক সাবলীল। যেখানে জনশ্রুতিকে বর্ণনা করেছেন সেখানে কিছুটা ধোয়াশা পাঠককে আলো-আধারীতে ফেলতেই পারে।

“স্বাধীনতা ’৭১” থেকে মৌলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি” বই-এ লেখকের নিজস্ব রচনারীতির বা স্টাইল যে কোন সতর্ক পাঠকের দৃষ্টি এড়াবে না এবং লেখা-লেখির জগতে তেমন কেউকেটা না হয়েও নিজস্ব রীতির আলোকে চিহ্নিত হতে পেরেছেন, লেখকের এ প্রাপ্তিও কম নয় বরং অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখকের চেয়েও বেশি।

হুজুরের একটি কথা দিয়ে শেষ করছি।

তখন ‘হক কথা’ পত্রিকা সবে বের হয়েছে। হুজুরের কাছে পত্রিকা সংক্রান্ত আলোচনার জন্য সন্তোষে পৌছে দেখি হুজুর আমার অনেক আন্দোলনের সাথী কৃষক নেতা মালেক ভাই এর সঙ্গে তার কাদরীর প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছেন।

আমি পায়ের কাছে বসলাম।

বুঝলে বুলবুল! মালেকের সাথে আসামের জঙ্গলে জমিদারের হাতী আর ভাড়াটে শিখ সৈন্যদের সাথে কইছাকে (বাংলার রবিনহুড কইছা দেওয়ান) নিয়া যুদ্ধের কথা বলছিলাম। কাদরীর কথাও এসে পড়লো। ও কত বড় বড় অস্ত্র নিয়া পাঞ্জাবীদের সাথে যুদ্ধ করেছে। কাদরীকে দেখলে আমার জোয়ান কালের কথা মনে হয়।

১৯৭১ সনে বাংলাদেশেল হাজার হাজার লড়াকু অভিজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধা ও বাহাত্তর হাজার সুশৃঙ্খল স্বেচ্ছাসেবকের অধিনায়ক আত্মবিশ্বাসী, পরিশ্রমী, দৃঢ় প্রত্যয়ী বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম নামের এক প্রাণ চঞ্চল তরুণের মাঝে মওলানা ভাসানী দেখেছিলেন তার সংগ্রামী যৌবনের রক্তরাগে রঙীন নিজের প্রতিচ্ছবি।

“মৌলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি” বই এ রাজনীতির পদচারনায় দুই বিপরীত মেরুর বাসিন্দা অথচ স্বদেশ প্রেমের জোয়ারে নৌকা ভাসানো জলযাত্রায় শ্রদ্ধা ভালোবাসায় সিক্ত দুই আরোহীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের টুকরো টুকরো ছবি দেখতে দেখতে পাঠকের মনে নতুন এক অনুভুতির সৃষ্টি হবে এ’আমার একান্ত বিশ্বাস।

-বুলবুল খান মাহবুব, সদর সড়ক, টাংগাইল। ১১/১২/২০০৭

(এই পর্বে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম এর লেখা “মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি” বইটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা বুলবুল খান মাহবুব কর্তৃক লিখিত ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। “মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি” বইটির সম্পূর্ণ লেখা ঘাটাইল ডট কম অতি যত্ন সহকারে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরবে। ঘাটাইল ডট কম এই বইটির লেখা প্রকাশ করে গর্বিত হতে চায়। সম্পূর্ণ বইটির লেখা পরার জন্য আমাদের সাথে থাকুন।)

Recent Posts

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

Adsense

Doctors Dental

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

বিভাগসমূহ

Divi Park

পঞ্জিকা

June 2020
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Adsense