‘মওলানার মৃত্যু আর আমার আত্মগ্লানি’

ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র জীবনে তৎকালীন দৈনিক বাংলার মেডিক্যাল রিপোর্টার হিসাবে মাসে দেড়শ টাকা বেতন পেতাম, নিজেকে বেশ বড়লোক মনে হতো। অনেকের মনে থাকতে পারে, মরা মানুষের মাংশ খাওয়া খলিলুল্লাহর কথা, সেই সংবাদটি করে দৈনিক বাংলা বিচিত্রার বড় বড় নামকরা সাংবাদিকদের স্নেহের নজরে পরেছিলাম। ঘটনাটি ঘটেছিলো আজকের তারিখে ১৭ই নভেম্বর, ১৯৭৬ সন।

মৌলানা ভাসানী তখন বার্ধ্যক্য জনিত কারণে অসুস্থ, ঢাকা মেডিক্যালের কেবিনে ভর্তি। সম্পাদক আহমেদ হুমায়ুন ভাই একদিন তার অফিসে ডেকে নিয়ে বললেন, রোজ ওনার স্বাস্থ্যের খবর নেবে।

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ইউসুফ আলী মওলানা ভাসানীর চিকিৎসার বোর্ড প্রধান ছিলেন। তার রেজিস্টার ডাক্তার জয়নাল ভাইর কাছ থেকে ওনার স্বাস্থ্যের বিস্তারিত খবর পেতাম।

সেই ১৭ তারিখ আজকের দিনে সন্ধ্যায় জয়নাল ভাই আমাকে বললেন, “আরিফ এইমাত্র মওলানার কেবিন থেকে আসলাম, সব স্যারদের খবর দাও, মওলানা ইন্তেকাল করেছেন, আমি আবার কেবিনে ফিরে যাচ্ছি।”

দৈনিক বাংলার নিউজ এডিটর ফজলুল করিম ভাই টেলিফোন ধরে আমার সংবাদ শুনেই এমন চিৎকার মারলেন,–“ভাসানী মারা গেছে।…..”!!

সব স্যারদের খবর দিয়ে যখন কেবিনের দিকে যাচ্ছি, তখন দেখি হন্তদন্ত হয়ে উত্তম কুমারের চেহারার সার্জারির অধ্যাপক মতিয়র রহমান এফ আর সি এস স্যার কেবিনের দিকে যাচ্ছেন, প্রায় একই সঙ্গে আমরা মওলানার কেবিনে ঢুকলাম, দেখি মওলানা ভাসানী বিছানাতে, জয়নাল ভাই এবং আরো কয়েকজন ডাক্তার, নার্স পাশে দাড়ানো, কোনার দিকে মওলানার বৃদ্ধা স্ত্রী ফ্লোরে বসা, অত্যন্ত দরিদ্র দর্শনে।

মতিয়র রহমান স্যার এসেই বললেন, তাড়াতাড়ি পেসেন্টকে ফ্লোরে নামাও। ইতিমধ্যে সব স্যাররা পৌছে গেছেন। দরজার কাচে নক শুনে দেখি দৈনিক বাংলার রিপোর্টার, ফটোগ্রাফার গোলাম মাওলা ভাই, কামরুজ্জামান ভাই, আমাকে ইশারা করছেন, দরজা খুলে দাও,– ছবি তুলব মৃত ভাসানীর। এত তাড়াতাড়ি তারা এলেন কেমন করে?

মওলানাকে মাটিতে শুইয়ে মতিয়র রহমান স্যার রিসাসটিকেসন শুরু করলেন, “জয়নাল, ফ্লুইড লাইনটি ফুল খুলে দাও, ইন্ট্রাকার্ডিয়াকটা দাওতো আমার হাতে, আর সাথে চলছে কার্ডিয়াক ম্যাসাজ।

আমি ঘাবড়ে গেলাম, সবাইকে খবর দিলাম উনি মারা গেছেন, পত্রিকার স্টাফরা দরজা ধাক্কাচ্ছেন ক্যামেরা নিয়ে, আর মতিয়ার স্যার ভাসানীর হৃদপিন্ড ধাক্কাছেন, সচল করার জন্যে। হচ্ছেটা কি?

এরমধ্যে মতিয়র রহমান স্যার মওলানার গাল স্পর্শ করে বলতে শুরু করেছেন, ‘ হ্যালো, মৌলানা, গুড ইভিনিং, হাউ আর ইউ নাউ, কেমন বোধ করছেন ?”

স্যার বহুদিন লন্ডনে ছিলেন, তাই তার চালচলন ছিলো ক্লাসিক ব্রিটিশ। আবার ডাক্তারী থাপর, “গুড ইভনিং, হাউ ডু ইউ ফীল?” কে জেনো একজন বললো, স্যার, ওনাকে হুজুর বলেন।

“ও সরি, জি সালাম আলাইকুম হুজুর, কেমন লাগছে এখন আপনার? ”

ওনার কি লাগছিলো তাতো আমি জানিনা, কিন্তু আমার লাগছিল পাগলের মত। এতবড় মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করলাম! ফটো সাংবাদিক গোলাম মাওলা ভাই দরজা ধাক্কাচ্ছেন আমার দিকে ইশারা করে, আমি কোনো সাড়া দিচ্ছিনা। ভাবছি এতবড় নেতার মৃত্যর সংবাদ দিলাম সবাইকে, অথচ উনি মরেন নাই!

পরবর্তী ঘটনাগুলি চিন্তা করে ঘাবড়ে গেলাম, অনুভব করলাম মাথা থেকে ঘাম পিঠের শিরদাড়ার খাদ বেয়ে নীচের দিকে নামছে পা পর্যন্ত। এরকম অবস্থানে আপনি কি করতেন?

মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে শুরু করলাম, আল্লাহ কি হবে, কি হবে এখন? জয়নাল ভাই বললেন, কার সাথে কথা বলছ?

মতিয়র রহমান স্যার তখনো, “হুজুর, সালাম আলাইকুম – বলেই চলছেন। বেড সাইড মেডিসিনের দুই কিং ইউসুফ আলী স্যার আর কাদরী স্যার দাড়িয়ে দেখছিলেন সব, দুজনে প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলেন, “মতি, এখন ছেড়ে দাও, উনি আর আসবেন না।”

ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত মতিয়ার রহমান স্যার বললেন, ” জি স্যার, হুজুর আসলে চলে গেছেন।” তখন প্রায় রাত নয়টা।

১৭ নভেম্বর আসলে মনে পড়ে যায় মওলানাকে, যে প্রশ্নগুলির জবাব জানা হয়নি, তা হলো, জয়নাল ভাই তো আগেই তাকে মৃত দেখে এসেছেন। তারপরে কি তিনি আবার ফিরে এসেছিলেন, এরপর কি আমার সংবাদ সত্যি করতে আবার চলে গেলেন?

খুলে গেলো কেবিনের দরজা, ক্রন্দনরত হাজার হাজার মানুষ সব স্তরের, বিশেষ করে অতি দরিদ্র মানুষের ভিড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল জনারণ্য হলো মুহুর্তের মধ্যে।

পরের দিন দৈনিক বাংলার সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিলো এই ভাবে, “আমাদের মেডিক্যাল রিপোর্টার আরিফ যখন টেলিফোনে জানালো, মওলানা ভাসানী আর নেই, আমাদের বিশ্বাস হয়নি, কারণ এভাবে তার মৃত্যুর খবর আরো অনেকবার বেরিয়েছিলো, যা সত্যি ছিলনা। এবারেও ভেবেছিলাম তা মিথ্যা, কিন্তু আরিফের দুসংবাদ সত্যি হলো”। সম্পাদক আহমেদ হুমায়ুন ভাই দুইবার আমার নাম লিখেছিলেন সম্পাদকীয়তে।

আল্লাহ মওলানা ভাসানীকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোত্তম জায়গাটি দান করুন।

(লেখক আরিফুর রহমানের ফেসবুক টাইমলাইন হতে সংগৃহীত, ঘাটাইলডটকম)/-