ভয়ঙ্কর টাঙ্গাইলের কিশোর গ্যাং, অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ

‘গ্যাং কালচার’এর নামে দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে টাঙ্গাইলে কিশোরদের একটি অংশ। তবে কোনো নাম দিয়ে গ্যাং পরিচালনা না করলেও তারা সংঘবদ্ধভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ‘পার্টি’ করা, হর্ন বাজিয়ে প্রচন্ড গতিতে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালানো এবং বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করাটা এসব কিশোরের কালচারে পরিণত হয়েছে। এসব কিশোর অপরাধী ‘গ্যাংয়ের’ ব্যাপারে অভিভাবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উদাসীন। শহরবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা এসব কিশোর বখাটের উৎপাত দেখে আসছেন। তাদের উচ্চগতির মোটরসাইকেলের রেস পথচারীদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব গ্যাং মূলত ‘পার্টি’ বা ফুর্তির আয়োজন করে, হর্ন বাজিয়ে প্রচন্ড গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে এবং মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে দাপট দেখায়। এই কিশোরদের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। এদের বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান ও স্কুলছাত্র। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারেরও লেখাপড়া না করা বখাটে ছেলে এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।

জানতে চাইলে মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র বলেন, কখনো একটি দলের পাল্লা ভারী থাকে। যে দলের পাল্লা ভারী থাকে সেই দলের কিশোর সদস্যরা তখন বড় ভাই। তারাই খেলার মাঠের নিয়ন্ত্রণ, মোটরসাইকেল রেস ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে। রাস্তায় রোমিওগিরি করে। তখন আরেক দল ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার চেষ্টা করে। এ থেকে মারামারি হয়। সম্প্রতি শহরের আদালতপাড়ার একদল কিশোর সন্ধ্যার পর পার্শ্ববর্তী এলাকা মিরের বেতকায় গিয়ে একটি দোকানের সামনে মদ পান করতে থাকে। এ সময় ওই এলাকার লোকজন এতে বাধা দেন এবং কিশোরদের চলে যেতে বলেন। এ কথা শুনে কিশোররা চলে আসার কিছুক্ষণ পর আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় সেখানে গিয়ে বাধা দেওয়া লোকজনের ওপর হামলা চালায়। এ সময় চারজনকে কুপিয়ে আহত করে তারা। পরে আহতদের উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এর আগে দুই গ্রামের যুবকদের মধ্যে সংঘর্ষের জের ধরে ২৮ মার্চ রাতে সদর উপজেলার পোড়াবাড়ী ইউনিয়নের রক্ষিতবেলতা গ্রামে তিন বছরের মেয়ের সামনেই মা রোজিনা বেগমকে গলা কেটে হত্যা করে একদল কিশোর।

টাঙ্গাইলের সংঘবদ্ধ কিশোররা মারামারি-কাটাকাটিতেই নয়, ধর্ষণ এবং মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।

১২ এপ্রিল রাতে টাঙ্গাইল নতুন বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক দম্পতি। এ সময় কয়েজন বখাটে কিশোর ওই দম্পতিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বামীকে মারধর করে স্ত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে সারা রাত ধর্ষণ করে। এরপর ওই দিন রাত সাড়ে ৩টার দিকে পৌর এলাকার সাবালিয়া চোরজানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দা থেকে ওই গৃহবধূকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে পুলিশ কোদালিয়া এলাকার আলম মিয়ার ছেলে ইউসুফ রানা, আবদুর রশীদের ছেলে মো. রবিন, মো. রবিকুল ইসলামের ছেলে তানজীরুল ইসলাম তাছিন, তালতলা মোড় এলাকার মৃত মজনু মিয়ার ছেলে মো. মফিজ, একই এলাকার আল বিরুনীর ছেলে ইব্রাহিম ও দেওলা গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে জাহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করে। পরে গ্রেফতার কিশোররা ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়।

২০ মে দুপুরে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার বাড়িতে একা পেয়ে শতবর্ষী এক বৃদ্ধাকে ১৫ বছরের সোহেল নামের কিশোর ধর্ষণ করে। পরে এ ঘটনায় ২২ মে ওই বৃদ্ধার ছেলে বাদী হয়ে মধুপুর থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ রাতেই অভিযান চালিয়ে ধর্ষক সোহেলকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার সোহেল ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়।

সন্তানদের খোঁজখবর না রাখা এবং অসুস্থ রাজনীতির কারণে এসব কিশোর ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। এরা টাকার লোভে ছিনতাইসহ বন্ধুকেও হত্যা করতে পিছপা হচ্ছে না। এরই ধারাবাহিকতায় এক লাখ টাকার লোভে নিজের বন্ধুকে হত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে।

১৪ জুন বিকালে সদর উপজেলার মগড়া ইউনিয়নের বাহিরশিমুল গ্রামের নানার বাড়ি থেকে মোটরসাইকেলে করে বের হওয়ার পর থেকেই নিখোঁজ হয় সজীব মিয়া। এ বিষয়ে টাঙ্গাইল মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। ১৬ জুন দুপুরে কালিহাতী উপজেলার হাতিয়া এলাকায় গলায় রশি ও মুখে স্কচটেপ পেঁচানো অবস্থায় সজীবের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার সঙ্গে পুলিশ কনস্টেবল মোশারফ হোসেন হৃদয় ও নিহত সজীবের বন্ধু মো. সজীবের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। তারা দুজনই গ্রেফতারের পর এ হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।

এদিকে উঠতি বয়সের এসব কিশোর মাদক সেবনেও পারদর্শী। তারা সারাক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকছে নেশার ঘোরে। হয়ে উঠছে অসহিষ্ণু। ঠুনকো ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা জড়িয়ে পড়ছে সহিংসতায়। পাড়া-মহল্লায় দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো, স্কুল-কলেজের সামনে আড্ডা, মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া, তরুণীদের উত্ত্যক্ত করা, দল বেঁধে মাদক সেবন, একই স্টাইলে চুল কাটাসহ বিভিন্ন অপকর্ম করতে গড়ে তুলছে এসব কিশোর গ্যাং। দিন দিন তারা হয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারে এসব গ্রুপ গড়ে উঠছে হরদম। এক গ্রুপের দেখাদেখি জন্ম নিচ্ছে আরেক গ্রুপ।

প্রতিটি গ্রুপের কাছে রয়েছে ধারালো অস্ত্র। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে প্রতিপক্ষ ভাবলে ঘটছে খুনোখুনির ঘটনা। সিনিয়র-জুনিয়র বা নারীঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটছে হত্যাকাণ্ড। শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে এমন কিশোর গ্যাংয়ের নেটওয়ার্ক।

র‌্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের প্রতিটি ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পরিবারের উদাসীনতায় তারা কোনো না কোনোভাবে বখে গেছে। তারা কোনো না কোনো ধরনের মাদকে আসক্ত। গ্যাং কালচারে শিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত দুই শ্রেণির কিশোর আসক্ত। তাদের ভিতর নিজেদের জাহির করার একটা প্রবণতা কাজ করে।

কিশোর গ্যাং সম্পর্কে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় জানান, ইতিমধ্যে কিশোর অপরাধে জড়িত থাকায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে টাঙ্গাইলে যেন আর কিশোর অপরাধ না বাড়ে এ জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

(টাঙ্গাইল সংবাদদাতা, ঘাটাইলডটকম)/-