ভূঞাপুর চরাঞ্চলের ৮৫ ভাগ আবাদী জমিতে চাষ হচ্ছে ‘বিষবৃক্ষ তামাক’

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার চরাঞ্চলে শতকরা ৮৫ ভাগ ফসলের আবাদী জমি বিষবৃক্ষ’ তামাক চাষ দখল করে নিয়েছে। উপজেলায় বেশির ভাগ অংশ নদী বা চরানঞ্চল হওয়ায় আগে যে জমিতে ভূট্রা,বাদাম,আলুর আবাদ হতো এখন সে জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। চরাঞ্চলের প্রায় জমিতেই এখন তামাক চাষের দখলে। অগ্রিম ঋণ, বিনামূল্যে বীজ, ঋণে সার ও নানান প্রলোভন দেখিয়ে দিন দিন বাড়ছে মরণ চাষ তামাকের চাষাবাদ। পাশাপাশি তামাক বিক্রয়ের নিশ্চয়তা পেয়ে তামাক চাষে ঝুঁকে পড়ছেন এ অঞ্চলের চাষিরা।

তামাক চাষ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেও অধিক মুনাফার আশায় নারীসহ পরিবারের সবাই সমানভাবে কাজ করছেন তামাক ক্ষেতে। এ কাজে অংশ নিচ্ছে শিশুরাও। উৎপাদিত তামাক বিক্রি নিয়ে কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না তাদের। এমন নিশ্চয়তা অন্য কোনো ফসল চাষের ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। তাই তারা তামাক চাষে ঝুঁকে পড়ছেন।

সচেতন কিছু কৃষকরা বলেন, সরকার যদি কোম্পানীর মতো বিনা শর্তে ঋণসহ ফসল কেনার নিশ্চয়তা দেয় তাহলে তারা তামাক চাষ ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য ফসল চাষ করবেন। এজন্য সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন তারা। স্থানীয়রা তামাক চাষকে তাদের ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি মনে করে বিধায় তাদের স্কুল কলেজ পড়ুয়া শিশুরা তামাক ক্ষেতে কাজ করতে দেখা যায়।

সরে জমিনে আরও দেখা যায়, স্কুল পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরাও তামাক শ্রমিকের কাজ করছে। তারা কেউ তামাকের আইলচা বাঁধছে, গাছ থেকে পাতা ভাঙছে, পাতা শুকাচ্ছে, গাছের গোড়ায় থেকে আগাছা পরিষ্কার করছে আবার কেউ বা শুকানো তামাকগুলো বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে।

কথা হয় ২য় শ্রেণিতে পড়ুয়া স্কুল শিক্ষার্থী কাউসার হোসেনের সাথে। কাউসার বলেন, সকালে একটু সময় পড়ে সকাল ৯ টা পর্যন্ত তামাকের কাজ করি। তারপর স্কুলে চলে যাই। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে বিকেলে আবার তামাকের কাজ করি। কিন্তু শুক্রবার হলে সারা দিনই কাজ করি। মজুরি হিসেবে ২০ থেকে ৫০ টাকা করে দেয় তামাক ক্ষেতের মালিকরা।

৭ম শ্রেণিতে পড়ুয়া স্কুল ছাত্রী বিথী বলেন- সপ্তাহের শুক্রবার স্কুল বন্ধ। তাই তামাকের কাজ করছি। ৫ থেকে ৭ ফুট আইলচা বাঁধলে দেয় ৩ থেকে ৫ টাকা। সারাদিন কাজ করলে ৮০ টাকা ১শ ২০ টাকা দেয় ক্ষেতের মালিকরা।

স্কুল পড়ুয়া আঁখি বলেন- তামাকের কাজ যেদিন করি সেদিন আর ভাত খেতে পারি না। দু-হাত তেঁতো হয়ে যায়, ঠান্ডা-জ্বর, শুকনো কাশি লেগে যায়। তবুও কাজ করি লেখাপড়ার খরচ চালানোর জন্য।

প্রায় অর্ধ বয়সী এই তামাক শ্রমিকের কাজ করা দিন মজুরি বলেন, তামাকের কাজ করে দিনে ১ শ ৫০ টাকা দেয়। এ দিয়ে সংসার চলে না। তামাক চাষিরা তারা অনেক টাকা বিক্রি করেন। অথচ আমাদের কম মজুরি দেয়। মজুরি বাড়ানোর কথা বললে তামাক চাষিরা কাজ করা জন্য আর নেয় না। তাই কম টাকাতেই বাধ্য হয়ে কাজ করি।তবুও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কেননা আমরা নারীরা গ্রামে-গঞ্জে কাজ করতে পারি। না হলে পরিবার নিয়ে রাস্তায় নামতে হতো। স্বামী অসুস্থ। তার চিকিৎসার টাকাও যোগার করতে হয় কামলা দিয়েই।

উৎকন্ঠ ভাবে কথা গুলো বলছিলেন যমুনা নদীর অংশে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নের চরঞ্চল রায়ের বাসালিয়া গ্রামের তামাক শ্রমিক মোছাঃ রজিনা বেগম। বয়স আনুমানিক ৪৮।

সরেজমিনে আরো দেখা যায়, যমুনা নদী চরঞ্চলে ভূঞাপুর উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নের রায়ের পাড়া বাসালিয়া, গোবিন্দপুর, রুলীপাড়া, রামপুর, বামনহাটা, জংলীপুরসহ চরের বিস্তীর্ণ আরো বহুগ্রামে শত শত হেক্টর জমি এ বিষাক্ত তামাক চাষ করা হয়েছে। দেশ-বিদেশের তামাকজাত দ্রব্য বিভিন্ন কোম্পানিরা বেশী লাভের প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মাধ্যমে প্রজেক্ট তৈরী করেছে তামাক চাষের।

তামাক শ্রমিক আরেক নারী বলেন, তামাক চাষে বেশী ভাগই নারীরা কাজ করে থাকি। কাজের পারিশ্রমিক খুবই কম। বর্তমানে একজন পুরুষ শ্রমিকের মূল্য ৩শ ৫০ টাকা থেকে ৪শ ৫০ টাকা। আর আমরা পাচ্ছি মাত্র ১শ ৫০ টাকা। এতে করে আমরা নারী শ্রমিকরা নায্য মজুরি পাচ্ছি না।

সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তামাক শ্রমিক হিসেবে দিন মজুরির কাজ করি। দিনের মাঝখানে দু’বার খাবার সময় পাই। বিরতি শেষে কাজে। আবার সংসারের কাজকর্মও করতে হয়। খেয়াল রাখতে হয় ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার। মাথায় চিন্তা ঘুরপাক খায় তিন বেলা দু-মুঠো পেট ভরে ডাল ভাত খেতে পারব কি না।

এক পর্যায়ে কথা হয় নাম না প্রকাশে ইচ্ছুক তামাক চাষি এজেন্টের সাথে। তিনি বলেন- ভুট্টা চাষের তুলনায় তামাক চাষে লাভবান বেশী। তাই তামাকজাত দ্রব্য বিভিন্ন কোম্পানির খরচে ও সহযোগিতায় জেগে ওঠা চরে তামাক চাষ করেছি। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জেনেও বিষাক্ত মরণব্যাধি তামাক কেন চাষ করছেন এমন প্রশ্ন জবাবে বলেন-বেশী লাভের আশায় তামাক চাষ করছেন তারা। কথা হয় নারী শ্রমিকদের মজুরি নিয়েও। তবে নারী শ্রমিকদের কম মজুরি প্রদানের বিষয়ে কথা বলতে নারাজ।

যমুনার চরঞ্চলে দেখা যায়, তামাক চাষে নারী শ্রমিকের বেশী উপস্থিতি। সংসার চালানোর দায়েই তামাকের কাজ করছে নারীরা। এ চরঞ্চলে শুধু তামাকের কাজ করেন তা নয়। নারীরা বিভিন্ন ধরণের কাজ করছেন দিন মজুরি হিসেবে। রজিনার মত শত শত নারী ও শিশু শিক্ষার্থীরা তামাকসহ বিভিন্ন ধরণের কাজ করছে।

উপজেলার যমুনা চরঞ্চলে বিষাক্ত মরণব্যাধি তামাকের চাষের বিষয়ে ভূঞাপুরের উপজেলা কৃষি অফিসার মো. জিয়াউর রহমান বলেন- উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর থেকে তামাক চাষ না করার জন্য চরঞ্চলে মাঠ পর্যায়ে কৃষকের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তামাকের বিভিন্ন ধরণের ক্ষতিকর দিক নিয়ে প্রান্তিক কৃষকের নিয়ে করা হয়েছে আলোচনা। তবুও কিছু কৃষকরা প্রলোভনে পড়ে তামাকের চাষ করছে।

এবছর ভূঞাপুর উপজেলায় চাষ করছে ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো, ঢাকা ট্যোবাকো, আবুল খায়ের ট্যোবাকো, নাসির ট্যোবাকো, আকিজ ট্যোবাকো।

ভূঞাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক জানিয়েছেন, তামাক শোধনের সময় নির্গত নিকোটিনের কারণে এলাকার লোকজন হাঁপানি, কাশি এবং ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

ভূঞাপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. জিয়াউর রহমান জানায়, এক সময় ধান, ভুট্টা, আলু, বেগুন, লাউ, শিম, মূলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি সহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষের জন্য সুনাম ছিল এ উপজেলার। কিন্তু মাঠের পর মাঠ এখন চোখে পড়ে শুধু

তামাকের ক্ষেত। যত দিন যাচ্ছে, ততই বাড়ছে তামাক চাষ। কৃষিবিভাগ তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করলেও তামাক কোম্পানীদের লোভনীয় আশ্বাসে তামাক চাষের দিকেই ঝুঁকে পড়ছেন এ উপজেলার কৃষকরা।

গোটা বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সরব, তখন সবুজ বনায়নের পরিবর্তে তামাক চাষের প্রসার নিয়ে উদ্বিগ্ন অত্র উপজেলার সচেতন মহল। এখনিই পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক চাষ বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা না হলে আবাদি জমির উর্বরতা হ্রাস পেয়ে অচিরেই উপজেলায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।

ভূঞাপুর কৃষি অফিসার মো: জিয়াউর রহমান আরো বলেন- গত বছরের তুলনায় এ বছর অনেকটা তামাক চাষ কম হয়ে গেছে। আগামীতে তামাক চাষ আরও কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভূট্রা, চিনা বাদামসহ বিভিন্ন ধরণের ফসল চাষাবাদও বাড়ছে চরঞ্চলে। কৃষি অফিস থেকে চরঞ্চলসহ উপজেলার প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকদের বিভিন্ন মৌসুমে আর্থিক সহযোগিতা, কীটনাশক, বীজ বিনামূল্যে প্রদান করে আসছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়ে নিয়মিত কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা ও অসুবিধা সমাধানের জন্য পরামর্শ দেয়া হচ্ছে কৃষকদের। ব্লকে ব্লকে করা হচ্ছে আলোচনা সভা।

(মাহমুদুল হাসান, ঘাটাইলডটকম)/-