ভুঞাপুরের গোবিন্দাসী হাটে কোরবানির পশু থাকলেও নেই ক্রেতা!

আসন্ন পবিত্র ঈদুল-আজহাকে সামনে রেখে পরম যত্নে পশু কোরবানি হাটে বিক্রির জন্য লালন-পালনে ব্যস্ত সময় পাড় করেছেন পশু খামারিরা। গত বছর কোরবানির ঈদে পশুর ভাল দাম পেলেও মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে এ বছর খামারিরা মুখ থুবরে পড়েছে। হাটে ক্রেতাদের তেমন সাড়া না পেয়ে চরম দুশ্চিন্তায় প্রহর গুণছেন তারা। আশঙ্কা করছে লোকসানের।

শুধু খামারিরা নয়, পশু ব্যবসায়ীরাও করোনাকালে হাটে পশু-বেচাকেনা না করতে পেরে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এদিকে, দেশের অন্যতম দ্বিতীয় বৃহত্তম পশুর হাট হিসেবে পরিচিত টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী গরুর হাট। এই দ্বিতীয় বৃহত্তম গরুর হাটে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা সারি সারি পশু বাঁধা রাখলেও ক্রেতা শূন্য হয়ে পড়েছে।

গেল বছর এই সময়টাতে গোবিন্দাসী হাটে ক্রেতাদের আনাগোনায় মুখরিত ছিলো। এবার সরেজমিনে গোবিন্দাসী গরুর হাট ঘুরে দেখা গেছে তার উল্টো চিত্র।

এ উপজেলা গোবিন্দাসী ছাড়াও নিকরাইল, শিয়ালকোল, নলিন ও চরশশুয়ার পশুর হাটগুলোত একই চিত্র দেখা যায়।

উপজেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলাতে স্থায়ী, মৌসুমি খামার ও পারিবারিকভাবে গরু, ছাগল, ভেড়াসহ, ১৬ হাজার ৮’শ ৫৬ টি গবাদিপশু কোরবানীর জন্য প্রস্তুুত রয়েছে। এরমধ্যে ষাড় রয়েছে ১০ হাজার ৬’শ ০২টি, বলদ ১ হাজার ৭’শ ৫৪টি, ছাগল ৩ হাজার ৮’শ ৫০ টি ও ভেড়া রয়েছে ৬’শ ৫০টি।

উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নের পুংলিপাড়া গ্রামের পশু পালনকারী দরিদ্র কৃষক আব্দুল আলিম জানান, প্রতি বছরের ন্যায় চরাঞ্চলে লাভের আশায় গরু পালন করে থাকি। ঈদের আগে বিক্রি করে বউ বাচ্চাদের নিয়ে খেয়ে পড়ে বাঁচি। কিন্তু এবার আমি দুইডা গরু নিয়া গুয়াদাইর আটে (গোবিন্দাসী) গেছিলাম কেউ দাম না কওয়ায় ফেরৎ নিয়া আইছি। লাভ তো হবোই না যে খাবার খাওয়াইছি সে দামও কেউ কয় নাই।

উপজেলার সর্ববৃহৎ গরুর খামারী দুলাল হোসেন চকদার জানান, এ বছর আমার খামারে ৫৫ টি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেছি। প্রতিটি গরুকে দেশীয় পদ্ধতিতে গো-খাদ্য খাইয়ে মোটাতাজা করা হয়েছে। খামারে সর্বনিম্ন ৩ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা দামের গরুও রয়েছে। ঈদের দু-সপ্তাহ বাকি। কিন্তু করোনাকালে পাইকার ও ক্রেতা তেমন না থাকায় চরম বিপাকে পড়ার আশঙ্কা করছি।

যদি কোরবানি ঈদে গরুগুলো না বিক্রি করতে পারি তাহলে ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকা লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

খামারে থাকা শ্রমিকরা জানায়, ঈদকে কেন্দ্র করে গরু মোটাতাজা করতে তারা নির্ঘুম রাত পাড় করছেন। এখন পর্যন্ত কোনও পাইকারের দেখা মিলছে না। খামার মালিক যদি গরুর ন্যায্য দাম না পায় তাহলে তাদের শ্রমের মজুরি নিয়ে শঙ্কায় পড়তে হবে। খামারে কাজ করে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসার চলে বলে জানান তারা।

দ্বিতীয় বৃহত্তম গরুর হাটের ইজারাদার মো. লিটন মিয়া জানান, করোনার সংক্রমণ এড়াতে গরুর হাট বন্ধ ছিল। লকডাউন তুলে নেওয়ার পর আবার হাট চালু করা হয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ গোবিন্দাসীর এই গরুর হাটে এসময়ে গত বছর কানায় কানায় ভরে ছিল কোরবানির পশু।

মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে অন্যান্য জেলা থেকে গরু কম আসলেও স্থানীয় খামারিরা সপ্তাহে বৃহস্পতিবার ও রবিবার কোরবানির পশু হাটে তুললেও ক্রেতা ও পাইকারের দেখা নেই।

ইজারাদার লিটন মিয়া আরও জানান, ঈদের সময়ে প্রতি হাটে প্রায় ৫ লাখ থেকে ১০ টাকা টাকা খাজনা উঠতো। বর্তমানে সেখানে ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খাজনা আদায় হচ্ছে। এতে করে হাট পরিচালনা কর্তৃপক্ষ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লোকসানে পড়বে।

অন্যদিকে, কারোনাকালে কোটি কোটি টাকা লোকসানের বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি দরখাস্ত পাঠানো হয়েছে।

উপজেলা ভেটেনারি সার্জন শরীফ বাছেদ জানান, চরাঞ্চলসহ ভূঞাপুরের প্রতিটি গ্রামেই কৃষকরা গরু, ছাগল ও ভেড়া লালন-পালন করে থাকে। এরকম ছোট-বড় খামারি ও অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যতে হানা দিয়েছে করোনার থাবা।

তারা জানিয়েছেন, ক্রেতা ও পাইকার না আসলে তাদের পথে বসতে হবে। তিনি আরও জানান, ভারত থেকে গরু না আসলে দেশের খামারিরা কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে।

উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা.স্বপন চন্দ্র দেবনাথ জানান, এ উপজেলায় বাণিজ্যিক ভাবে ছোট-বড় ১হাজার ৮’শ ৫০টি গরুর খামার গড়ে উঠেছে। তবে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পারিবারিকভাবে ও কিছু ক্ষুদ্র প্রান্তিক খামারিরা পশু পালন করেন। আশা করছি, এ বছরও তারা লাভবান হবে। গত বছর উপজেলায় কোরবানির জন্য ১২ হাজার ৫’শ পশুর চাহিদা ছিল। এ বছরে ১৩ হাজারের মতো পশুর চাহিদা রয়েছে। আমাদের প্রাণী সম্পদ অফিসের লোকজন সব সময় খামারীদের পরার্মশ দিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. নাসরীন পারভীন জানান, গোবিন্দাসী, নিকরাইল ও শিয়ালকোল হাট ইজারাদারদের আবেদন পেয়েছি, কিন্তু আমাদের বিবেচনার সুযোগ নেই। এটা হাট ইজারা কমিটির বিষয়।

আবেদনটা সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে, সরকার বিবেচনা করলে আমরা সেটা বাস্তবায়ন করবো। হাট মালিকদের ক্ষতি হচ্ছে সেটা আমরা বুঝতে পারছি। তবে দেশ করোনামুক্ত হলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সব সেক্টরের পাশে দাঁড়াবে সরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘অবৈধপথে এবার ভারতীয় গরু না আসায় বাজারে দেশি গরু দেখা যাচ্ছে। তবে করোনার কারণে মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় অনেকে কোরবানি দিতে পারবেন না। সেই হিসাবে বাজারে ক্রেতা কম এবং গরুর দামও তুলনামূলক অনেক কম। ঈদের আরও কিছু দিন বাকি আছে, বেচাকেনা হয়তো বাড়তে পারে।’

(ফরমান শেখ, ঘাটাইল ডট কম)/-