ভুঞাপুরের গোবিন্দাসী হাটে গরু আছে ক্রেতা নেই

টাঙ্গাইলের বৃহত্তর ভূঞাপুরের গোবিন্দাসী গরুর হাটে গরু আছে ক্রেতা নেই। আসন্ন ঈদুল আযহা উপলক্ষে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আকর্ষনে কর্তৃপক্ষের কোন তৎপরতাও নেই। উন্নয়নে তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও ইজারা না দেয়ায় হাটটি স্থানীয় আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি গোবিন্দাসী গরুর হাট ঐতিহ্য হারাচ্ছে। এতে, সরকার বিপুল পরিমান রাজস্ব হারাচ্ছে।

জানাগেছে, টাঙ্গাইল শহর থেকে বঙ্গবন্ধুসেতু হয়ে ৩১ কিমি., ভূঞাপুর উপজেলা সদর থেকে ৬ কিমি. এবং বঙ্গবন্ধুসেতু থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে যমুনার কোল ঘেষে ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসীতে অবস্থিত এ হাট। গোবিন্দাসীতে সপ্তাহের রোব ও বৃহস্পতিবার এই দুই দিন হাট বসে। তবে ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদের এক মাস আগে থেকে প্রতিদিনই গরু কেনা-বেচা হয়। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঈদুল আযহা’র আগে ১, ৪ ও ৮ আগস্ট হাটবার। অথচ হাটে গরু থাকলেও ক্রেতা নেই, জমে ওঠেনি গরুর হাট। প্রতিবছর এ সময়ে হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যাপক সমাগম ঘটত। প্রতিদিন গরুভর্তি শ’ শ’ ট্রাক গরু ক্রেতারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যেত। হাটে পা ফেলার জায়গা থাকত না। স্থানীয় প্রশাসনের উদাসিনতা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তহীনতা ও স্থানীয়দের অসম প্রতিযোগিতার কারণে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর এ গরুর হাটটি ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

হাট সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে গোবিন্দাসী হাট উন্নয়নে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল দরপত্র আহ্বান না করে কোটেশনের মাধ্যমে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ২৪ লাখ ৯৫ হাজার ৭৭৯ টাকার উন্নয়ন কাজ করেন। কাজের মধ্যে ছিল, হাটের চারদিকে কাটা তারের বেড়া তৈরি, জিআই পাইপ ও ডগা নির্মাণ এবং হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির অফিস বিল্ডিং নির্মাণ। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। পরে হাট উন্নয়নের অর্থ আত্মসাত সহ নানা অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল আওয়ালকে অন্যত্র বদলি করা হয়। সূত্রমতে, মূলত সেই সময়ই গোবিন্দাসী গরুর হাট ঐতিহ্য হারাতে শুরু করে। ব্যক্তি মালিকানায় ইজারা দেয়া হলে হাটটি আবার সরগরম হবে বলে সূত্র মনে করে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯০ সালের আগে গোবিন্দাসী একটি ছোট বাজার ছিল। চরাঞ্চলের মানুষ প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করত। ১৯৯১ সালের পর সপ্তাহে দুইদিন রোববার ও বৃহস্পতিবার হাট বসানো হয়। সে সময় সাধারণত বিকালে হাট বসত। সন্ধ্যার পর ‘মশাল’ জ্বালিয়ে রাত ৭-৮টা পর্যন্ত দোকানপাট চালানো হত। তখন স্থানীয়রা ৮-১০টা করে করে গরু হাটে তুলে বিক্রি করার চেষ্টা করে। কখনো বিক্রি হয়, আবার কখনো হয়না। ১৯৯৫ সালে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা ইকরাম উদ্দিন তারা মৃধা গোবিন্দাসী হাটটি মাত্র ৩২ হাজার টাকায় ইজারা নেন। গোবিন্দাসী হাটটিতে নদী ও স্থল পথে যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনা করে দেশের সিলেট, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের গরু ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ করেন। তাদেরকে হাটে আনতে নানা রকম প্রণোদনা চালু করেন। যেমন রংপুর, রাজশাহী বিভাগ ও ভারত থেকে গোবিন্দাসী হাটে গরু আনলে যমুনা নদী পাড়াপাড়ের জন্য টোল ফ্রি, হাটে গরুর পাহারা ফ্রি এ রকম হরেক রকম প্রণোদনা। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাটমুখো করতে ট্রাক নিয়ে বিভিন্ন জেলায় মাইকিং করা হয়। ধীরে ধীরে গোবিন্দাসী গরুর হাটের প্রসারতা বাড়ে, জমে ওঠে গোবিন্দাসী গরুর হাট। ক্রমান্বয়ে হাটটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর গরুর হাট হিসেবে বিবেচিত হয়।

হাটের সাবেক ঠিকাদার মো. লিটন মন্ডল বলেন, হাটে প্রণোদনা বন্ধ হওয়ায় পাইকাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে ঐতিহ্য হারাচ্ছে। এছাড়া, ইজারা না দিয়ে খাস কালেকশন করায় রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে।

বয়সের ভারে ন্যূব্জ গোবিন্দাসী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আ’লীগ নেতা ইকরাম উদ্দিন তারা মৃধা জানান, তিনিই স্থানীয় লোকদের নিয়ে গোবিন্দাসী গরুর হাট প্রতিষ্ঠা করেন। মাইকিং করে, প্রণোদনা দিয়ে, বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে পাইকার ও ক্রেতাদের হাটমুখী করেছেন। ব্যক্তি ও ইজারাদারের কল্যাণে কিছুটা উন্নয়ন করা হয়েছে। সরকারিভাবে হাট উন্নয়নের টাকা ঠিকাদারের সঙ্গে ভাগভাগি করায় তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার অন্যত্র চলে গেছেন। তারপর থেকে অদ্যাবদি হাটটি আর ইজারা দেয়া হয়নি। ব্যক্তি মালিকানায় ইজারা না দেয়ায় হাটের প্রতি স্থানীয়দের দরদ কমে গেছে। ফলে হাট ঐতিহ্য হারিয়ে ধংসের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে। ব্যক্তি মালিকানায় ইজারা দেয়া হলে আবার পুরনো ঐতিহ্য ফিরে আসতে পারে।

ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ঝোটন চন্দ বলেন, যথাসময়ে হাট ইজারার দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্ত সরকারি দর অনুযায়ী সন্তোষজনক দর না পাওয়ায় ইজারা দেয়া সম্ভব হয়নি। ভারত সীমান্ত বন্ধ থাকায় গরু আসতে পারছেনা। তাছাড়া গোবিন্দাসী হাটের কাছাকাছি বেশ ক’টি গরুর হাট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এজন্য ক্রেতা-বিক্রেতারা যেখানে সুবিধা পাচ্ছে সেখানে চলে যাচ্ছে। গোবিন্দাসী হাটে ক্রেতা-বিক্রেতা বাড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রণোদনার ব্যবস্থা গ্রহনের কোন সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।

ভূঞাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুল হালিম বলেন, সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর গরুর হাটটির বারোটা বাজিয়ে গেছেন। আমাদের কারো কথা না শুনে স্থানীয় এক হুন্ডি ব্যবসায়ীকে সুবিধা পাইয়ে দিতে একক সিদ্ধান্তে খাস কালেকশনের মাধ্যমে টোল আদায়ের ব্যবস্থা করেন। টেন্ডারে অংশগ্রহনকারী সর্বোচ্চ দরদাতাকে হাট ইজারা না দেয়া পর্যন্ত হাটের আগের অবস্থান ফিরে আসবেনা।

(বুলবুল মল্লিক, ঘাটাইলডটকম)/-