ভাষা আন্দোলন

… সে আজ বহুদিনের কথা, সপ্ততি বৎসরের কম নহে, আমি যে-কালে প্রথম বাংলা ভাষার চর্চা আরম্ভ করি, সে-কালে আমরা চারিজন ব্যতীত অন্য কোন মুসলমান লেখক ছিলেন না। সেই চারিজনের তিনজন কালের অতল সাগরে ডুবিয়া গিয়াছেন। মাত্র আমি একা এখন জীবিত থাকিয়া কবরের প্রান্তে আসিয়া দাঁড়াইয়াছি। সে তিনজনের নাম শুনিতে বোধ হয় আপনারা আগ্রহ প্রকাশ করিতে পারেন। একজন কুষ্টিয়া লাহিনী পাড়ার মীর মোশাররফ হোসেন ও অন্যজন পড়ানের পন্ডিত রেয়াজউদ্দিন। ইঁহারা দুজনেই গদ্য লেখক, মাত্র আমি কবিতা লিখিতাম। ইহার কিছু পরেই শান্তিপুরের মোজাম্মেল হক আসিয়া আমাদের সংগে মিলিত হন। ইনিও কবিতা লিখিতেন, মাঝে মাঝে গদ্য লেখাও তাহার অভ্যাস ছিল।

সেকালে হিন্দু লেখকগণ আমাদিগকে বিশেষ ঘৃণার চক্ষে দেখিতেন, তাহারা বলিতেন, ‘মুসলমান বাংলা লিখিতে জানে না’। এসব শুনিয়া আমার মনে বড়ই আঘাত লাগিত, বলিতে কি হিন্দুদের ঐসব শ্লেষ উক্তি আমার হৃদয়ে বিষম বাজিত। সে সময় হিন্দুদের মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা বেশী ছিল না। মাত্র ‘আর্য্যদর্শন’, ‘বঙ্গদর্শন’, ‘বান্ধব’, ‘সাহিত্য’, ‘ভারতী’, ‘বঙ্গবাণী’, ‘সোমপ্রকাশ’, ‘সঞ্জীবনী’ প্রভৃতি সাত-আটখানা পত্রিকা ছিল। রায় দীনবন্ধু মিত্র বাহাদুর ‘নীলদর্পণ’ নাটক লিখিয়াছিলেন। আমাদের বংগীয় সাহিত্যিক বন্ধু মীর মোশাররফ লিখিয়াছিলেন ‘জমিদার দর্পণ’ ও ‘বসন্ত কুমারী’ নাটক। ইহা আমাদের পক্ষে কতকটা লজ্জাকর বিষয় বটে, রায় বাহাদুরই হউন, কি বিদ্যাসাগরই হউন, আমরা কেন তাহাদের অনুকরণ করিতে যাইব? আমরা কি লিখিতে জানিনা? খোদাতালা আমাদিগকে যে শক্তি ও প্রতিভাটুকু দিয়াছেন, কেন আমরা তাহার অপব্যবহার করিতে যাইয়া কলংকের ডালি মাথায় তুলিয়া লইব? ইহার পরও তিনি ‘এর উপায় কি’ প্রহসন লিখিয়া হিন্দু লেখকদের দ্বারা নিতান্ত লাঞ্ছিত ও অপমানিত হইয়াছিলেন। সে সময় ‘বান্ধব’ সম্পাদক রায় কালীপ্রসন্ন ঘোষ বিদ্যাসাগর C.I.E. বাহাদুর ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সহিত লিখিয়াছেন, “এসব আগাছা সাহিত্যের উদ্যান হইতে কাটিয়া ফেলাই উচিত”।

আরও লিখিয়াছেন, ‘এর উপায় কি’? শুধু মীর সাহেবকে এইরূপ বিদ্রুপ করিলে প্রাণে এত বাজিত না। মুসলমান জাতিকে লক্ষ্য করিয়া এসব কটুক্তি করাতে বড়ই মর্মাহত হইয়াছিলাম। বলিতে কি, উহারা কোন বহি হাতে লইয়া মুসলমান গ্রন্থকারের নাম দেখিলেই ফেলিয়া দিত।

আমি এই সব অবমাননার বোঝা মাথায় লইয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম, মুসলমান লেখক বাংলা লিখিতে জানে কিনা, তাহা এই হিন্দু ভায়াদিগকে দেখাইতে হইবে। এই চিন্তা করিয়াই আমি ‘অশ্রুমালা’ লিখিয়াছিলাম। আমার সে আশা পূর্ণ হইয়াছে। ইহাতে এমন একটি শব্দও ছিল না যাহা পাঠ করিয়া হিন্দু ধুরন্ধরগণ মুসলমানের লেখা বলিয়া নাসিকা কুঞ্চিত করিতে পারেন। এমন কি উহা পাঠ করিয়া সেই সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ পত্রিকা ‘বঙ্গবাণী’ লিখিয়াছিল, ‘মুসলমান হইয়া এরূপ শুদ্ধ বাঙ্গালায় এমন সুন্দর করিয়া লিখিতে পারেন, দেশে এমন কেহ আছেন, আমাদের জানা ছিল না’।

মহাকবি নবীন সেন লিখিয়াছিলেন, ‘মুসলমান যে বাংলা ভাষায় এমন সুন্দর করিয়া লিখিতে পারেন, আমি আপনার উপহার না পাইলে বিশ্বাস করিতাম না। অল্প সুশিক্ষিত হিন্দুরই বাঙ্গালা কবিতার উপর এরূপ অধিকার আছে। আপনার ‘অশ্রুমালা’ তাহার প্রভাত শিশির-মালা স্বরূপ বঙ্গ-সাহিত্যের ইতিহাসে স্থান লাভ করিল’। বিক্রমপুর পন্ডিত সমাজের মুখপত্র ‘সারস্বতপত্র’ লিখিয়াছিলেন, ‘কবি কায়কোবাদ মুসলমান, কিন্তু তাহার বাঙ্গালা মুসলমানী নহে, কায়কোবাদের বাঙ্গালা সুসংস্কৃত, মার্জিত ও মধুর’।

এই সব লেখা দ্বারাই আপনারা বুঝিতে পারেন, মুসলমানদের লেখার উপরে হিন্দুদের কিরূপ বিজাতীয় ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছিল। আমি এইজন্যই আমার লেখাতে বিশুদ্ধ বাংলা শব্দ ব্যতীত অন্য কোন ভাষার শব্দ ব্যবহার করি নাই। আধুনিক লেখকদের মধ্যে কেহ কেহ সেজন্য বলিয়া থাকেন, আমি হিন্দুদের লেখার অনুকরণ করিয়াছি। বাস্তবিক তাহা নহে। হিন্দুরাই যে কেবল বিশুদ্ধ বাঙ্গালা লিখিতে পারেন, মুসলমানরা লিখিতে পারেন না, তাহাদের সেই অন্যায় ধারণা ও অযথা গর্ব চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিয়াছি। আমি অনেক অনাবশ্যক কথার উল্লেখ করিলাম, কারণ আমার উপরে আধুনিক মুসলিম লেখকদের যে একটি অন্যায় ধারণা ছিল উহা দূরীভূত করিবার জন্যই এই প্রয়াস।

এখন আর সেদিন নাই, আমরা উল্লিখিত চারিজন মুসলমান সাহিত্যিক মুসলিম বংগভাষার সেই শৈশব সময়ে যে ভিত্তি স্থাপন করিয়া সাহিত্যের উদ্যান সৃজন করিয়াছিলাম, সেই ফুলকুল শোভিত সাহিত্য-উদ্যানে আজ আধুনিক বহু মুসলিম সাহিত্যিক নূতন নুতন সুগন্ধি ফুল ও ফলের বৃক্ষ রোপণ করিয়া উহার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করিয়াছেন, তাহা দেখিলেও হৃদয়ে আনন্দের উদ্রেক হইয়া থাকে। এখন আর আমাদের সেই বংগভাষা দীনহীন দরিদ্রা নহে। দুনিয়ার মধ্যে যত ভাষা আছে, তাহাদের সকলের সম্মুখে আমাদের এই বংগভাষা রতনে, বসনে ও নানাবিধ অলংকারে বিভূষিতা রানীর মত দাঁড়াইতে সক্ষম।

আজ আপনাদের অনুকরণের কোন প্রয়োজন নাই। আজ আপনারা আপনাদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিয়া মুসলিম বংগভাষার শ্রীবৃদ্ধি করিতে থাকুন, কোন বাধা নাই, বিঘ্ন নাই, নিন্দা করিবার কেহ নাই। আজ আপনাদের পথ উন্মূক্ত। আজ আপনাদের সাহিত্য-উদ্যানে ডক্টর শহীদুল্লাহ, মওলানা আকরম খাঁ, সৈয়দ এমদাদ আলী, নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, আব্দুল করিম সাহিত্য-বিশারদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রভৃতি বহু সাহিত্যিক আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। এখন আপনাদের চিন্তা কি?”মহাকবি কায়কোবাদ

[১৯৪৩ সালে ঢাকা মুসলিম হল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে পঠিত। ফাগুন, ১৩৪৯ সালে মাসিক মোহাম্মদীতে প্রকাশিত।]

তথ্যসূত্র: পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য / সম্পাদনা : সরদার ফজলুল করিম (অধ্যক্ষ, বাংলা একাডেমী) ॥ [বাংলা একাডেমী – মার্চ, ১৯৬৮ । পৃ: ৯৫-৯৭]

#০৬

“… রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি হইয়াও পাক-বাঙলার জাতীয় কবি নন। বাংলাদেশ ভাগ হওয়ার পর এটা রাষ্ট্রীয় সত্য হইয়াছে নিশ্চয়ই। কিন্তু বিভাগ পূর্ব বাংলাদেশেও এটা সাহিত্যিক সত্য ছিল। পাকিস্তান হওয়ার তিন বছর আগে ১৯৪৪ সালে কলিকাতার বুকে দাঁড়াইয়া এক সভাপতির ভাষণে আমি বলিয়াছিলাম : ” বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব ভারতীয় বিশ্বে কতবার শারদীয়া পূজায় ‘আনন্দময়ী মা’ এসেছে গিয়েছে, কিন্তু একদিনের তরেও সে বিশ্বের আকাশে মোহরমের চাঁদ উঠেনি।”

এটা বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের প্রতি অশ্রদ্ধা-অপমানের কথা নয়। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি হইয়াও বাংলার জাতীয় কবি নন। বাংলার জাতীয় কবি নন তিনি এই সহজ কারণে যে বাংলায় কোনও ‘জাতি’ নাই। আছে শুধু হিন্দু-মুসলমান দুইটা সম্প্রদায়। তিনি বাংলার জাতীয় কৃষ্টির প্রতীক নন এই সহজ কারণে যে, এখানে কোনও জাতীয় কৃষ্টিই নাই। এখানে আছে দুইটা কৃষ্টি : একটা বাংগালী হিন্দু-কৃষ্টি অপরটি বাংগালী মুসলিম-কৃষ্টি। সমগ্র বাংলায় মেজরিটি ছিল মুসলমান। মেজরিটি দেশবাসীর সাথে নাড়ীর যোগ না থাকিলে কেউ জাতীয় কবি হইতে পারেন না। বিশ্বের কাছে তিনি যত বড়ই হউন। এটা পশ্চিম-বাংলার কৃষ্টি সাহিত্যের প্রতি অবজ্ঞাও নয়। রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব-কবি হিসাবে আমাদের নমস্য। সর্ব অবস্থায় তা থাকিবেন। যুদ্ধেও থাকিবেন, শান্তিতেও থাকিবেন। এই খানেই সীমারেখার সূক্ষ্ম জ্ঞানের প্রয়োজন। ভারতের সংগে যুদ্ধ বাধিলেই রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতা নিষিদ্ধ হইবে এটা যেমন দোষণীয়, শান্তি হইলেই রবীন্দ্র-পূজা শুরু হইবে এটাও তেমনি দূষণীয়।

পশ্চিম বাংলার সাহিত্য উন্নত সাহিত্য হিসাবে নিশ্চয়ই আমাদের অনুকরণীয়। কিন্তু তা আমাদের নিজের সাহিত্য নয়। অমন মোহ যদি থাকে তবে তা ঝাড়িয়া ফেলিতে হইবে। আমাদিগকে অবিলম্বে আমাদের নিজস্ব জাতীয় ঐতিহ্য ও কৃষ্টির রিডিসকভারি করিতে হইবে নতুন জাতির মন লইয়া। সে রিডিসকভারি রূপায়ণেই আমাদের জাতীয় সাহিত্য রচিত হইবে নয়া যিন্দিগীর বাণী বহন করিয়া। বাংগালী হিন্দুর রেনেসাঁ যুগের মতো আমাদের মধ্যেও বাংগালী মুসলিম রেনেসা্ঁর বংকিম-রবীন্দ্র ও রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের জন্ম হইতে হইবে।

তরুণরা ভুল বুঝিবেন না। এটা পিছন ডাক নয়। এটা সামনে চলার আহ্বান। রিভাইভাল নয়, রেনেসাঁ। এটা বাদশাহি আমলে বা খিলাফত যুগে ফিরিয়া যাওয়ার পরামর্শ নয়। ওটা হইবে অবাস্তব। ভ্রান্ত মরিচীকা। দুনিয়া আজ প্রগতি ও সাধনার পথে অনেক অনেক দূর আগাইয়া গিয়াছে। আমাদেরও সে প্রগতির নাগাল ধরিতে হইবে। তার শরিক হইতে হইবে। কাজেই গতি হইবে আমাদের অতি দ্রুত। আমাদের কালচারকেও আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক হইতে হইবে। এটা ফিউডাল যুগ নয়, গণতন্ত্রের যুগ। আমাদের কালচারকেও তাই গণ-ভিত্তিক হইতে হইবে। এটা কৃষি-যুগ নয়, এটা এটা শিল্প-যুগ। কাজেই জনগণও আজ আর শুধু কৃষক নয়, তারা মিল-মজুরও বটে। শিল্পও আর শুধু আর্বান ইন্ডাষ্ট্রী নয়, রুরাল ইন্ডাষ্ট্রীও তার শক্তিশালী শরিক। কালচারের ধারক যে পল্লীগ্রাম, তাও আর আগের পল্লী নাই। শহর ও পল্লীর ব্যবধান দ্রুত সংকীর্ণ হইতেছে। কালচার ও সিভিলিযেশনের মধ্যে তাই নতুন করিয়া সমঝোতা হইতেছে।

পাক-বাংলার কৃষ্টিক রেনেসাঁ হইবে এই পরিবেশে। সে কৃষ্টি-সাহিত্যের ইমারত গড়িয়া উঠিবে আধুনিক মাল-মসলাতেই। তার বুনিয়াদ হইবে পাক-বাংলার মাটিতে, রূপ-রস-গন্ধে হইবে তা অপূর্ব। সে কৃষ্টি-সাহিত্য রূপে হইবে বাংগালী, রসে হইবে তা মুসলিম, আর গন্ধে হইবে তা বিশ্বজনীন।

… পূর্ব-পাকিস্তান অর্থাৎ বাঙলা ও আসামের সাহিত্য বলতে আজ আমরা যা বুঝি তা বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্র-শরৎচন্দ্র যুগের সাহিত্যিকদের সাহিত্য। এটা খুবই উন্নত সাহিত্য। বিশেষত: রবীন্দ্রনাথ এ সাহিত্যকে বিশ্ব-সাহিত্যের দরবারে স্থান দিয়ে গেছেন।

তবু এ সাহিত্য পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্য নয়। কারণ এটা বাঙলার মুসলমানের সাহিত্য নয়। এ-সাহিত্যে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কোন দান নাই। অর্থাৎ এ-সাহিত্য থেকে মুসলিম সমাজ কোনো প্রেরণা পায়নি এবং পাচ্ছে না। এর কারণ আছে। সে কারণ এই যে এ-সাহিত্যের স্রষ্টাও মুসলমান নয়, এর বিষয়বস্তুও মুসলমান নয়। এর স্পিরিটও মুসলমান নয়, এর ভাষাও মুসলমানের ভাষা নয়।

প্রথমত: এ সাহিত্যের স্পিরিটের কথাই ধরা যাক। এ সাহিত্য হিন্দু-মনীষির সৃষ্টি। সুতরাং স্বভাবতই হিন্দু সংস্কৃতিকে বুনিয়াদ করেই তারা সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। ঠিকই করেছেন তারা। নইলে ওটা জীবন্ত সাহিত্য হতো না। হিন্দু ধর্মেরই সন্তান। হিন্দু ধর্ম ত্যাগ, বৈরাগ্য ও মুনি ঋষির ধর্ম। হিন্দুর সংস্কৃতিও তাই ত্যাগ, প্রেম ও ভক্তিবাদের সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির বুনিয়াদ প্রতীক পূজা। কাজেই হিন্দুর শিল্পী মন সুন্দরের পূজারী। এতে করে এই বাঙলা সাহিত্যের প্রাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সত্যম শিবম সুন্দরমের সাধনা। সে সাধনার কামনা হচ্ছে “আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ-ধুলার তলে।” সুন্দর ও প্রতীক-পূজারী এই রসিক মন স্বচ্ছন্দে “আর্টের জন্যই আর্ট” এই মতবাদ প্রচার করেছে। প্রতীক পূজারী নিত্যানন্দ রস-পিপাসু মন স্পন্দিত হয়েছে পরকীয়া প্রেমে। আত্মার তসল্লির জন্য ভক্তিবাদ ও আর্ট বাদের মিল ঘটাইবার উদ্দেশ্যে রাধা-কৃষ্ণ প্রেমের সৃষ্টি হয়েছে। এইভাবে বাঙলা সাহিত্য গড়ে উঠেছে নারী-প্রেমকে কেন্দ্র করে। নারী এখানে সৌন্দর্যের প্রতীক। নারী-প্রেমের সাধনা করতে গিয়ে নারী-মনকে করে তোলা হয়েছে গভীর রহস্যপুরী। সে দূজ্ঞেয় রহস্যপুরীর ঘুমন্ত নারী প্রেমকে জাগাবার সোনার কাঠির সন্ধানে গোটা তরুণ-বৃদ্ধ জাতীয় মনকে তোলা হয়েছে ক্ষেপিয়ে। ক্রমে শিল্পীর তুলিতে বৈরাগ্য ভক্তি-প্রেম প্রভৃতি হিন্দু সংস্কৃতির বড় বড় মহান মূল সূত্রগুলিও শিল্পিত হয়ে উঠেছে নারী-প্রেমকে কেন্দ্র করেই। ত্যাগের আদর্শ, বৈরাগ্যের আদর্শ, ভক্তিবাদের আদর্শ, প্রেমের আদর্শ সমস্তই উঁচু দরের আদর্শ। এইসব আদর্শকে বুনিয়াদ করে নারী-প্রেমকে কেন্দ্র করে হিন্দু শিল্প-মনীষা যে সাহিত্য রচনা করেছে, সে সবই হযেছে উচ্চাঙ্গের সাহিত্য এবং তা পড়ে অপর সকলের মতই মুসলমান রস-পিপাসীরাও পিপাসা নিবারণ করে থাকে।

কিন্তু সত্য কথা এই যে, ঐ সাহিত্যকে মুসলমানরা তাদের জাতীয় সাহিত্য মনে করতে পারে না। কারণ ত্যাগ-বৈরাগ্য-ভক্তি-প্রেম যতই উঁচুদরের আদর্শ হোক, মুসলমানের জীবনাদর্শ তা নয়। হিন্দুর ধর্ম যেমন ত্যাগ বৈরাগ্য মুনি-ঋষির ধর্ম, মুসলমানের ধর্মও তেমনি হক-ইনসাফ ও জেহাদ-শহীদের ধর্ম। প্রতীকবাদী সুন্দর-পূজারী আর্টবাদী হিন্দু সংস্কৃতি যেমন ব্যক্তি-কেন্দ্রিক, মুসলিম সংস্কৃতি তেমন ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নয়। হক-ইনসাফবাদী কল্যাণমুখী মুসলিম সংস্কৃতি তাই সমাজ-কেন্দ্রিক। মুসলমানের বিচারে তাই আর্টের জন্য আর্ট নয়, আর্ট সমাজের জন্য। এই সমবেত কল্যাণমুখীতার ফলে মুসলমান মূলত: কর্মবাদী, ভক্তিবাদী নয়। এই জন্যই মুসলমানের সমাজ-ব্যবস্থা ত্যাগের বা বৈরাগ্যের বা দান-দক্ষিণার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। মুসলিম সমাজ-ব্যবস্থা হক ও ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত। নারী মুসলমানের নজরে দেবী নয়, রহস্য-পুরীর রাক্ষসীও নয়। সে মানবী। বিধবা ও ‘সতী’ হিসেবে ত্যাগের মূর্তিমান দেবী রূপে তার যতই পূজা-অর্চনা করা হোক, তার ওয়ারিশী সম্পত্তি এবং দেনমোহরের টাকা আদায় না করা পর্যন্ত তার উপর ন্যায় বিচার করা হল না বলে মুসলমান মনে করে। হক ও ইনসাফের দ্বারা, অধিকার ও সাম্যের দ্বারা সমাজের অপর সব মেম্বরের মতোই নারীরও মন পাওয়া যেতে পারে। অভিসারের ঘোড়ায় চড়ে, ‘দেহি পদ-পল্লব-মুদারমে’র সোনার কাঠি নিয়ে তার অন্তরের রহস্যপুরীতে প্রবেশ করে কান্নাকাটির বাণে রাক্ষস-খুক্ষস মারবার কোনো দরকার করেনা।

মুসলিম সমাজ-মনের রায় এই যে, নিষ্কর্মা অলস ও নিদ্রাহীন হতভাগ্য অভিজাতেরাই নারী-হৃদয়কে রহস্যময় ও নারী-প্রেমকে সমস্যাপূর্ণ করে তুলেছে। বড় লোকের অনর্জিত অর্থ-রাশি ব্যয়ের অবসর-প্রচুর জীবন অতিবাহিত করবার জন্য ইনডোর খেলা হিসেবে রহস্যপূর্ণ নারী-হৃদয় খুবই চিত্তাকর্ষক। তা ছাড়া তাদের আদর নিষ্ঠাহীন জীবনে নারী-প্রেম সত্যই দুর্লভ বস্তু। তাদের বহুভোগী চঞ্চল চপল মনের কাছে নারী-হৃদয় সত্যই রহস্যপুরী। বাঙলার মুসলমান অনর্জিত বিত্তশালী অবসর-প্রচুর শ্রমকুন্ঠ অভিজাত শ্রেণী নয়। কাজেই নারী-প্রেম তাদের দুর্লভও নয়, নারী-মন তাদের কাছে রহস্যপুরীও নয়। এই জন্যই বর্তমান বাঙলা সাহিত্য মুসলিম সমাজ মনে কোনো প্রেরণার স্পন্দন জাগাতে পারেনি। তাই রাধা কৃষ্ণের প্রেমে প্রতিবেশী হিন্দু ভাইকে আনন্দে নৃত্য করতে দেখেও মুসলিম সমাজ-মনের একটা তারও ঝনাৎ করে উঠেনি। তাই বিশ্ব কবির ‘মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ-ধুলার তলে’র অত বড় আবেদনে একটি মুসলমানেরও মাথা এক ইঞ্চি হেঁট হলো না।

তার বদলে বরঞ্চ যেদিন এক অচেনা অজানা বালক হঠাৎ জিকির দিয়ে উঠলো : “বল বীর উন্নত মম শির”, সেদিন রিক্ত ক্লান্ত ঘুমন্ত ও জীবন্মৃত মুসলমান ধচমচ করে জেগে উঠে চোখ রগড়াতে রগড়াতে হুঙ্কার দিয়ে উঠলো : “উন্নত মম শির”। কারণ এ যে তারই অন্তরের ঘুমন্ত শিশুর চীৎকার। এ যে তারই জীবনের কথা। তাই নজরুল ইসলামের আকস্মিক আবির্ভাব মুসলিম সমাজ-মনকে এমন করে আলোড়িত করতে পেরেছে। মুসলমানের বিবেচনায় মানব-জীবনের সুখ-দু:খ আলো-আঁধার হাসি-কান্না, তাদের দেবত্ব-পশুত্ব, তাদের হীনতা-ক্ষুদ্রতা, তাদের সংগ্রাম সাধনা, এ সবই সাহিত্যের বুনিয়াদ এবং নজরুল ইসলাম এই জীবনকে কেন্দ্র করেই সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। শুধু এই কারণেই নজরুল ইসলাম পূর্ব-পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় কবি॥”

তথ্যসূত্র: আবুল মনসুর আহমদ / বাংলাদেশের কালচার ॥ [আহমদ পাবলিশিং হাউস – ফেব্রুয়ারি, ২০০৪ (পঞ্চম মুদ্রণ) । পৃ: ৩৯-৪০/১০০-১০২]