বড়াল ব্রীজ ও স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং আমেনা

বড়াল ব্রীজের ওপর দিয়ে যখনই যাই তখনই চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের লেখা ‘বড়াল ব্রীজের সেই মেয়েটি’র কথা মনে পড়ে।

নুরুদ্দিনের কথা লিখতে গিয়ে আরেক জনের কথা মনে পড়ল। শুধু দেখছিলাম তাকে কয়েক মুহূর্তের জন্যে। সে-ও ছিল মানসিক ব্যাধি- আক্রান্ত, এক মহিলা । সম্পূর্ণ উলঙ্গ। উঠে বসেছিল বড়াল রেলওয়ে ব্রিজের ওপর। হেলেদুলে হাসছিল সে, কখনো কাঁদছিল। ব্রিজের নিচে বৃত্তাকার যে আকাশমুখো জঁলা, মাঝে মাঝে তার উপর থুথু ছিটাচ্ছিল সে।

সিরাজগঞ্জ ঘাট থেকে যে রেল পথটি চলে গেছে ঈশ্বরদী জংশন পর্যন্ত তারই মাঝামাঝি জায়গায় বড়াল ব্রীজ স্টেশন। পাশেই বড়াল নদী। এই নদী ধরে দক্ষিণে যাওয়া যায় পাবনার এক থানা-জনপদ ফরিদপুরে। উত্তরে ভাঙ্গুরার বিভিন্ন গ্রাম। বছর সতের আগের কথা। তখনো শ্যালো-ইঞ্জিনের নৌকা আসেনি।, বড়ালব্রীজ থেকে ফরিদপুরের সড়কও তৈরি হয়নি।

আমি একটা দাঁড়-টানা নৌকা করে ফরিদপুরের বনওয়ারীনগর থেকে বড়াল ব্রীজ স্টেশনে আসছি। এখান থেকে ঈশ্বরদী ট্রেন ধরব। ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহীতে।

আমার নৌকার মাঝি সেকেন্দার ওরফে সেকেন। সেটা ছিলো শুকনো মৌসুমের এক সকাল, নৌকা ভিড়ল ব্রিজ থেকে একটু দূরে। সহকারীকে নৌকা বাঁধতে বলে সেকেন মাঝি নিজের কাঁধে তুলে নিল আমার ব্যাগপত্র। আগেই কথা হয়েছে সে আমাকে ট্রেনে তুলে দেবে।

চৈত্রের শুকিয়ে-ওাঠা বড়ালের ধার ঘেঁষে আমরা হাঁটছি পাশাপাশি। সামনেই মূল নৌকাঘাট, তারপর স্টেশনের প্লাটফরমে উাঠবার সিঁড়ি। একটি পাকা, অপরটি নদীর ঢাল কেটে কেটে তৈরি করা। আমরা একটুখানি ঘুরে প্লাটফরম-লাগোয়া পাকা সিঁড়ি বেয়েই উাঠলাম, কেননা টিকিট করতে হবে, চা খেতে হবে। আর ট্রেন আসতেও ঘণ্টাখানিক দেরি আছে।

হাঁটছি। সেকেন মাঝির সাথে টুকটাক কথা হচ্ছে। হঠাৎ চোখে পড়লো ব্রিজের নিচে বেশ জটলা প্রথমে ভাবলাম: বুঝি মাছ কেনাবেচা হচ্ছে। ধারে কাছেই তো মাছের বাজার, আড়ত। কিন্তু না, আরো একটুখানি এগোতেই দেখলাম চক্রাকারে দাঁড়িয়ে আছে একদল মানুষ। সবার চোখ উপর-মুখো। তাকিয়ে আছে সবাই ব্রিজের স্প্যানের দিকে। আছে যুবক, বৃদ্ধ, মায় কিশোর পর্যন্ত।

সেখানে বইখাতা বগলে স্কুল-ছাত্র, কলেজ পড়ুয়া, মাছ ব্যবসায়ী, ঝাঁকা হাতে হলধর, তরকারিওয়ালা, নৌকার হইলা-মাঝি, টুপি মাথায় গামছা কাঁধে মৌলবি সাহেব। প্যান্ট-শার্ট পরা কয়েকজন ভদ্রলোককেও দেখলাম দাঁড়িয়ে হা করে আছে উপরের দিকে, জঁলা থেকে একটুখানি দূরে। হাতের ব্যাগ সুটকেশ দেখে বোঝা যায় ট্রেনের যাত্রী এরা।

ব্রিজের ওপরে চড়ে বসা মেয়েটি ভরা-যুবতী, সম্পূর্ণ উলঙ্গ। সে নাচের ভঙ্গিতে হাত নাড়ছে।

মাথার উপর, তার বিকৃত কণ্ঠে ভীষণ চিৎকারের গান: ‘ধাজা মেওে বলমা, তেরা এন্তেজার হ্যায়’।

একটি লাইন শেষ করেই সে তৎক্ষণাৎ বাংলার দিকে চলে গেছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই গানটি গাইতে লাগল।

সে প্রায় গলা ফাটিয়ে ‘আজ দূজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে।’

বেঁকে উচ্চারণের সাথে সাথে তার কণ্ঠ আরো কর্কশ শোনায়।

গান থামিয়ে হঠাৎ ধমকে ওঠে যুবতী : যাহ্ শালারা ভাগ… ভাগ… । তারপর ঐ অতদূর থেকে ভীষণ শব্দ মুখে নিয়ে থুথু ছিটাতে থাকে।

মেয়েটির প্রতিটির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন গিলে-চেটে খাচ্ছে সবাই। নিষ্পলক চোখ। চকচকে মণি। থুথু ছিটানো শুরু হলে ব্রীজের নিচে হাসির রোল ওঠে।

মেয়েটিকে ব্রীজের ওপর থেকে নামতে বলছেনা কেউ, বরং ভিড়ের ভেতর থেকে একজন চিৎকার কওে ওাল: ‘হই পাগলী, এইবার একখানা নাচ দেখাও তো।’

এই বলে হ্যাংলা-পাতলা যুবকটি উর্ধ্বমুখে তাকিয়ে নিজের নাচের অঙ্গভঙ্গি করতে থাকে। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে সবাই।

… এবার হঠাৎ ‘আঁউ বলে আকাশ ফাটানো চিৎকার করে ওঠে ব্রীজের যুবতী, তারপর ততোধিক জোর শব্দে হাসতে থাকে হা হা। সেই অট্রহাস্যে বুঝিবা কেঁপে ওঠে বড়ালের দুই তীর, পুবদিকের প্লাটফরম, সংলগ্ন বাজার এবং অদৃশ্য শয়তানের হৃদয়।

মেয়েটির হা হা হাসির সাথে যুক্ত হয় জনতার বিচিত্র ভঙ্গিও হাসি।

এসময় এক বালক পাশেরই এক চা-দোকানের বয়, মাটির শক্ত ঢেলা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারতে থাকে পাগলীর দিকে। প্রথমটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, দ্বিতীয়টিও, কিন্তু তৃতীয় ঢিলটি লাগে মেয়েটির মাথার পেছনের দিকে।

আহ্ শব্দে ভীষণরকম চিৎকার করে ওঠে মেয়েটি।

একটু আগেই যে কিনা অট্টহাস্য করছিল, এখন সে মাথার পেছন দিকটি দুহাতে চেপে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতেই সে যৌন-সম্পর্ক স্থাপন করে ঢিলছোড়া কিশোরের পিতা এবং মাতা উভয়ের সাথে। শালা… হারামজাদা… কুত্তার বাচ্চা… তোর মায়ওে আমি… তোর বাপরে আমি…

মেয়েটি কাঁদছে। কাঁদছেই। নিজের চুল নিজেই টানছে।

এই অবস্থায় নিচের জঁটলা আরো পুলকিত, উল্লাসিত, ভীষণরকম মজা পাচ্ছে সবাই এরকম হাসছে।মৌলবি সাহেব, চকচকে চোখে গিলছিল যে যুবতীর শরীর এবং থেকে থেকে উচ্চারণ করছিল ‘নাউজুবিল্লাহ’, পাগলীর কান্না এবং গালাগালির মাত্র বৃদ্ধিও সাথে সাথে তার ঠোঁট চাপা হাসি আরো বিসৃত হয়।

ঐ ছেলেটি, যে ঢিল মেরেছিল যুবতীর আকাশ-কাপানো কান্নার বিপরীতে দাঁত বের করে হাসতে থাকে সে-ও। এবার ঢিল মারার ভঙ্গিতে হাত ছুঁড়েছে মেয়েটিও।

একবার কিশোরের দিকে, একবার ব্রীজের নিচে ঊর্দ্ধমুখী মানুষগুলোর দিকে।

আমার খুব খারাপ বোধ হতে থাকে। বুকের ভেতর বিচিত্র রকম অনুভতি হচ্ছে। মানুষের এই অপমান, মনে হচ্ছে…

জটলা সরাতে আমার কিছু করা দরকার কি? মেয়েটিকে নামানো যায় না ব্রীজের ওপর থেকে? কী করে ঐ উঁচুতে উঠল সে ? কবে কোত্থেকে এই জনপদে এসে পড়ল উলঙ্গ যুবতী? ভাবনার ছেদ পড়ে।

আমার ব্যাগ দুটো মাটির ওপর নামিয়ে রাখে সেকেন মাঝি, তারপর ছুটে গিয়ে হামাল দেয় জটলায়। তার কণ্ঠে হুংকার : সব ব্যাটারা সর! ভাগ! ভাগ!

একটু বাদে, জনতার ভিড় এলোমেলো এবং ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যাবার পর, দুপদাপ পায়ে দ্রুত পূর্ব-অবস্থানে ফিরে আসে সেকেন মাঝি। হাঁপাচ্ছে সে, আক্রোশে কাঁপছে হাত দুটো।

ঘাড় ফিরিয়ে ঘন ঘন তাকাচ্ছে ঘটনাস্থল থেকে সওে যাওয়া মানুষগুলোর দিকে। সে কাঁপা হাতে আরো শক্ত কওে বাঁধার ব্যর্থ চেষ্টা কওে লুঙ্গিও ওপর খাটো গামছাটি।

সেকেন মাঝি এবার এবার বেশ গম্ভীর আবার সে ব্যাগ তুলে নিল কাঁধে হাঁটতে লাগল সামনের দিকে। আমি অবাক হয়ে কৃষ্ণবর্ণ দীর্ঘ এবং পেশিবহুল মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকি। ব্রীজের ওপর মেয়েটি তখনো কাঁদছে।

এবার সামনে হাঁটছে সেকেন মাঝি। পেছনে আমি। হঠাৎ সে থামল। ঘুরে দাঁড়াল বলে উঠল : ‘ দেখছেন স্যার কাণ্ডকারখানা !’

আমি কিছু বলতে চাইলাম। একটু থেমে আমাকে অবাক করে সে বলে উঠল: ‘আপনিই কন স্যার পাগল কিডা? উপরের ঐ পাগলী না নিচের এই হারামজাদাগুলা?’

প্রশ্ন ছুড়ে দেয়ার সাথে সাথে একদলা থুথু ছিটাল সে চৈত্রের ঝাচটা বাতাসে সেই থুথুর একটুখানি আমার মুখেও এসে পড়ল। শার্টের আস্তিনে মুছে নিলাম তা আস্তে করে। নীরবে।

বছর খানেক বাদে আবার ভাঙ্গুরা গেলাম। সেই বড়ালব্রীজ স্টেশন চায়ের দোকানে বসে মেয়েটির কথা জানতে চাই। কোথায় সে? দেখছি না তো?

চা দোকনদার নতুন এসেছে এখানে কিছু বলতে পারে না। কিন্তু প্রশ্নের জবাব জানাল পাশের আরেকটি দোকানের কর্মচারী। কার কথা বলছেন? আমেনা? সেই ল্যাংটা পাগলী ? সে তো স্যার মারা গেছে ট্রেনে কাটা পড়ে। …

গতবছর… ঐদিকের লাইনের ওপর বসেছিল সে…। ঐ সময়… ভীষণরকম একটা আতঙ্কে শিউরে উঠি। কান ঝাঁ ঝাঁ করছে । গলার কাঁটার কাছে বিচিত্ররকম শিরশির একটা অনুভতি হচ্ছে …।

বুঝতে পারি বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল… ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে কান্না।

সেই সময়ে, চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, পৃথিবীর সমস্ত মানুষ আমেনার মতো উলঙ্গ, প্রত্যেকে চড়ে বসে আছে একেকটি ব্রিজের ওপর, হা হা করে হাসছে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙে পড়ছে।

মৃত্যুর বেদনার সঙ্গে অপেক্ষা করছিল বিষ্ময়। শুনলাম : আমেনা নামের ঐ মেয়েটির বাড়ি ছিল ঈশ্বরদীর এক গ্রামে। একাত্তরে পাকসেনা আর স্থানীয় কতিপয় অবাঙালি যুবক তার বাবা মাকে হত্যা করে, আমেনাকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। যুদ্ধশেষে, জনতা যখন বিজয়ের উল্লাসে মাতোয়ারা, অনেক যুবতীর সাথে এই মেয়েটিকেও ঐ ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করা হয় এবং মন্তিষ্কবিকৃত অবস্থায়…।

(ফেসবুক থেকে প্রাপ্ত, ঘাটাইল ডট কম)/-