বৃর্টিশদের ‘ম্যাগনেটিক’ পিলার স্থাপন বজ্রপাত রোধ করেছিল

 

বৃর্টিশ শাসনামলে সীমানা নির্ধারণী হিসেবে ‘ম্যাগনেটিক’ পিলার স্থাপন করা হয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলছেন, এর মাধ্যমে বৃটিশরা আসলে এদেশের সব গোপন তথ্য চুরি করে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পিলারগুলো চোরাচালানে বিক্রি হওয়ার তথ্য বেশ পুরোনো। এন্টিক বিষয় হিসেবে অনেক কিছু মানুষের সংগ্রহে রাখার অভ্যাস নতুন নয়, বলা চলে শখও।

আসল ঘটনা হচ্ছে-এদেশে বৃটিশদের শাসনের সময়কালে সীমানা পিলারগুলো ফ্রিকুয়েন্সি অনুযায়ী একটি থেকে আরেকটির দূরত্ব মেপে মাটির নীচে পুতে রাখা হয়েছিল। যেগুলোর মধ্যে পিতল, তামা, লোহা, টাইটেনিয়ামসহ ধাতব চুম্বক সমন্বয়ে গঠিত হওয়ার কারনে বজ্রপাত হওয়ার সময়ে ইলেকট্রিক চার্য তৈরি হয় সেটি সরাসরি এই পিলারগুলো শোষণ করে আর্থিং এর কাজ করতো।

এতে করে বজ্রপাত হতো কিন্তু মানুষ মারা যেত না। অসাধু কিছু লোক এই পিলারগুলো অনেক দামে বিক্রি করা যায় এরকম গুজব ছড়ায়। এ কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পিলারগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিছু লোক এগুলোকে মহামূল্যবান বলে অপপ্রচার করে খুঁজে বের করে চুরি করে নিয়ে যায়।

সীমান্ত পিলারগুলোর মধ্যে থাকা তামা পিতল, টাইটেনিয়াম জাতীয় ধাতবের সমন্বয়ে তৈরি বলে এগুলো বিদ্যুৎ সুপরিবাহী হয়ওয়াতে একে মহামূল্যবান বলে অপপ্রচারের ফলে এসব পিলার চুরি হতে থাকে।

বজ্রপাত হলো-হঠাৎ বিদ্যুৎয়ের ঝলকানি তারপর গুরু করে বিকট শব্দ। বজ্রপাত প্রকৃতির সব থেকে সুন্দর ও ভয়ঙ্গকর দৃশ্য। এই কারনে আগের দিনের মানুষ বজ্রকে দেবতা জ্ঞান করত। বজ্রপাত প্রকৃতির একটি সাধারণ ঘটনা। প্রতি সেকেন্ডে ৪০ টির মতো বজ্র সৃষ্টি হয়। পানি চক্রের নিয়ম আনুযায়ি জলীয় বাষ্প যখন সূর্যের তাপে উপরে উঠতে থাকে তখন অন্যান্য বায়ু ও জলীয় কনার সাথে ঘর্ষনের ফলে বিদ্যুৎ তৈরি হয় । ফলে একেকটা জলীয় কণা ব্যাটারির মতো কাজ করে।

ইলেক্ট্রন জলীয় কণার নিচের দিকে বেশি অবস্থান করে বলে এই অংশে ঋনাত্বক চার্জ জমা হয় আর উপরে ধনাত্বক চার্জ জমা হয়।যখন এই ধনাত্বক ও ঋনাত্বক চার্জ মিলিত হয় তখনই বজ্রের সৃষ্টি হয়। এই সময় তড়িৎ বিভবের পার্থক্য ১০ মিলিয়ন ভোল্ট পর্যন্ত হতে পারে আর তরিৎ প্রবাহের মাত্রা ৩০,০০০ এম্পায়ার পর্যন্ত হতে পারে।বিভবের পার্থক্যের উপর প্রবাহের মাত্রা নির্ভর করে।এই সময় বাতাসের তাপ মাত্রা ২০০০০ থেকে ৩০০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই প্রচন্ড শক্তির স্থায়িত্ব মাত্র সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগ। আপনি যদি বজ্রপাতের মধ্যে পরেন তাহলে সাথে সাথে মারা যাবেন।

তবে আশার কথা হলো মোট বজ্রপাতের মাত্র ২৫ ভাগ ভূপৃষ্টে পরে বাকি গুলো মেঘের মধ্যেই ঘটে থাকে। যখন মেঘের মধ্যে ধনাত্বক আর ঋনাত্বক চার্জ মিলিত হয় তখন তা মেঘের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। এই সময় মেঘের জল কনা ভেংগে অক্সিজেন আর হাইদ্রোজেনের এক বিস্ফোরন ঘটে ফলে প্রচন্ড শব্দ তৈরি হয়।শব্দ আর বিদ্যুৎ একি সাথে তৈরি হলেও গতির পার্থিক্যের কারনে আমরা আগে আলো দেখতে পাই আর পরে শব্দ শুনতে পাই।আগেই বলেছি জল কণার নিচের অংশে থাকে ঋনাত্বক চার্জ ।আর ভুপৃষ্ট হচ্ছে ধনাত্বক চার্জ।যখন এই দুই চার্জ একত্রিত হয় তখন যে বজ্রের সৃষ্টি হয় তা ভুপৃষ্টে আঘাত হানে। কিন্ত এই কাজ সহজ নয় কারন এই দুই চার্জের মধ্যে কোণ মাধ্যম নেই। বাতাস বিদ্যুৎ পরিবহন করে না।তাহলে কি ভাবে ঘটে এই দুই চার্জের মিলন?

মেঘের বিপুল শক্তিশালী বিদ্যুৎক্ষেত্র তার চারপাশের বাতাসের অপরিবাহী ধর্মকে নষ্ট করে দেয়, যাকে বলে Dielectric Breakdown. মেঘে অবস্থিত বিদ্যুতক্ষেত্র যখন যথেষ্ঠ শক্তিশালী হয় (প্রতি ইঞ্চিতে প্রায় ১০,০০০ ভোল্ট) ,তখন তার আশেপাশের বাতাস পজিটিভ এবং নেগেটিভ চার্জে বিভক্ত হয়ে যায়। এই আয়োনিত বাতাস প্লাজমা নামেও পরিচিত। বাতাস আয়োনিত হয়ে মেঘ এবং ভূপৃষ্ঠের মধ্যে বিদ্যুৎ চলাচলের পথ বা শর্ট সার্কিট তৈরি করে দেয় এবং বজ্রপাত ঘটায়। এই বিদ্যুৎ তখন প্রায় ৬০০০০ কিলো মিটার বেগে উপরে উঠে যায় ।

সবদিক বিবেচনা করে বৃটিশ আমলে বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য এই প্রযুক্তির পিলার গুলো সারা দেশ জুড়ে মাটির নিচে পুতে রাখা হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর ফ্রিকুয়েন্সি মেপে মেপে। এখন যেমন মোবাইল ফোনের টাওয়ার বসানোর সময় একটা থেকে আরেকটার দুরত্ব আর ফ্রিকুয়েন্সি মেপে ম্যাপ করে বসানো হয় ।

আগেকার আমলে বজ্রপাতে নিহত হওয়ার সংখ্যা ছিল অনেক কম যেটি এখন এতটা বেড়ে গেছে যে, মানুষ রীতিমতো চিন্তায় পড়ে গেছে। এখন সবাই বুঝতে পারছে কেন বৃটিশ আমলে এগুলো মাটির নিচে পুতে রাখা হয়েছিল।

বজ্রপাতে মৃত্যু রোধকল্পে সরকারকে বৃটিশদের মতো করে পিলার স্থাপনের উদ্যোগ আবার গ্রহণ করা উচিৎ বলেও মতামত দিচ্ছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। আবার এই পরিস্থিতিতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমানোর জন্য দেশব্যাপী ১০ লাখ তালগাছ লাগানো শুরু হয়েছে। ‘ম্যাগনেটিক’ পিলারগুলোর অঙ্গহানীর বিকল্প এখন তালগাছ।

সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, বজ্রপাত যেহেতু সাধারণত উঁচু কোন কিছুতে আঘাত করে, সেজন্য উঁচু গাছ হিসেবে তালগাছকেই তারা বেছে নিয়েছেন বজ্রপাত ঠেকানোর জন্য।
২০১৭ সালে বিবিসি বাংলা অনলাইনকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল বলছিলেন,বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে উঁচু গাছ হিসেবে তালগাছকে বেছে নেয়া হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেছেন,থাইল্যান্ডে তাল গাছ লাগিয়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। সেখানকার বিশেষজ্ঞের পরামর্শও বাংলাদেশ নিয়েছে।

দেশের একজন বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আসাদুল হক মনে করেন, বজ্রপাত যেহেতু উঁচু জায়গায় আঘাত করে, সে হিসেবে তাল গাছ মৃত্যু কমাতে সহায়ক হবে।

কিন্তু বজ্রপাতের আঘাত পাওয়া গাছটি নষ্ট হয়ে যাবে। সেখানে হাওর এলাকায় টাওয়ার নির্মাণ করা হলে স্থায়ী ব্যবস্থা হতো বলে তিনি মনে করেন।

সচিব শাহ কামাল অবশ্য জানিয়েছেন, ভিয়েতনামে টাওয়ার দিয়ে মৃত্যুর হার কমানো হয়েছে। বাংলাদেশ হাওর এলাকায় তালগাছের পাশাপাশি টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য ভিয়েতনামের বিশেষজ্ঞদের আলোচনা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৯ এই এক দশকে দেশে বজ্রপাতে মোট মৃতের সংখ্যা দুই হাজার ৮১ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে ২০১৮ সালে। ওই বছর বজ্রপাতে মারা গেছে ৩৫৯ জন। এর আগের বছর মারা যায় ৩০১ জন, যা গত এক দশকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০১৬ সালে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা ছিল ২০৫। এছাড়া ২০১৫ সালে ১৬০, ২০১৪ সালে ১৭০, ২০১৩ সালে ১৮৫, ২০১২ সালে ২০১, ২০১১ সালে ১৭৯ ও ২০১০ সালে ১২৩ জনের মৃত্যু ঘটে বজ্রপাতে।

(জিবলু রহমান, ঘাটাইল ডট কম)/-