২৩শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৭ই জুলাই, ২০২০ ইং

বিফলে মশা মারার সব চেষ্টা, ২০১৯ সালে সরকারি হিসেবেই ডেঙ্গু রোগী লক্ষাধিক

ডিসে ৩১, ২০১৯

এ বছরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বছরজুড়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ওঠা-নামার মধ্যেই রোগী সংখ্যা রেকর্ড করেছে। দেশে প্রথম ২০০০ সালে ডেঙ্গু ডায়াগনোসিস হয়। এতদিন পর্যন্ত ডেঙ্গুকে বর্ষা মৌসুমের অসুখ, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা শহরকেন্দ্রিক, ঢাকার বাইরে এর কোনও প্রকোপ নেই বলা হলেও বছরজুড়ে কোনও সূত্রই ডেঙ্গুকে রোধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। গত ১৮ বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ৭৬ জন। কিন্তু, ২০১৯ সালে আগের সব হিসাব ছাড়িয়ে কেবল সরকারি হিসেবেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা হয়েছে এক লাখ এক হাজার ৩৩৪ জন–দেশের ইতিহাসে কোনও একক রোগে এত মানুষের হাসপাতালে ভর্তির নজির আর নেই। আবার এই সরকারি সংখ্যাও বেসরকারি হিসেবের চেয়েও কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নির্মূলের জন্য মশক নিধন গুরুত্বপূর্ণ হলেও মশা মারার কোনও চেষ্টাই এ বছরে কাজে লাগেনি। সোর্স রিডাকশন অ্যান্ড ভেক্টর কন্ট্রোল ছাড়া এডিস মশা থেকে বাঁচার কোনও উপায় নেই বলেও জানাচ্ছেন তারা। তারা বলছেন, ডেঙ্গু এখন একটি ‘এনডেমিক ডিজিজ’। এটা এখন সারাবছরই থাকছে। আর ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন, ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তন, বাংলাদেশের তাপমাত্রা, অসচেতনতা, এডিস মশা নিধনে ওষুধ কার্যকর না হওয়া, মশার প্রজননস্থলে নজরদারির অভাব, ভবন নির্মাণসহ নির্মাণকাজে জড়িতদের স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান না থাকা এবং যে পরিমাণে মশার জন্ম হচ্ছে সেই হারে মশা নিধন না হওয়াতে এবারে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

একইসঙ্গে ডেঙ্গুকে এতদিন রাজধানীকেন্দ্রিক প্রাদুর্ভাব ধরে নিয়ে সব ধরনের নজরদারি, কর্মকৌশল ও সচেনতনামূলক কাজ করা হয়েছে। যার কারণ হিসেবে বলা হতো, ডেঙ্গুর বাহক এডিশ মশা শহরের; কিন্তু, ডেঙ্গুর সেকেন্ডারি বাহক অ্যালবোপিকটাস মশাকে তারা ধর্তব্যে আনেননি। কিন্তু এ বছর প্রথমে ঢাকার ভেতরে এর প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও একসময় তা সারাদেশে ছড়িয়ে যায়। একটা সময় দেখা যায়, ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। তাই এখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশার মতো ঢাকার বাইরে অ্যালবোপিকটাস মশাকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে।

তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন প্রথম থেকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ অস্বীকার করে এবং নানা ধরনের মন্তব্য করে সমালোচনার মধ্যে পড়েন। গত ১২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলামের স্ত্রী সাদেকুন নাহার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তিনি ডিএসসিসি মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠান ডেঙ্গু ও এডিস মশা নিধনে ব্যর্থতার জন্য ৫০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে। পরদিনই মেয়র সাঈদ খোকন তার বাসায় যান। সেখান থেকে বের হয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলতে বাধ্য হন ‘ডেঙ্গুর প্রকোপ বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বেশি।’ মেয়র আরও বলেন, ‘নগর কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আছে। সব শক্তি দিয়ে ডেঙ্গু মোকাবিলার জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্মানিত নাগরিকদের আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা সতর্ক থাকবেন। নাগরিকের সতর্কতা এবং কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ডেঙ্গুমুক্ত শহর উপহার দিতে পারবো বলে আশা করি। নাগরিকদের বলবো, ভয়ের কিছু নেই, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই; আমরা আপনাদের পাশে আছি।’

যদিও পরে তিনি কাজের গতি কিছুটা কমেছে বলে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘কিছুটা গতি কমেছে এটাও সত্য। তবে, আমাদের কাজকর্ম থামেনি। আগের মতো নিয়মিত কাজগুলো চলমান রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা পুরনো ওষুধ বাদ দিয়ে নতুন ওষুধ ব্যবহার শুরু করেছি।’

উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)-এর মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বছরব্যাপী কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে একটি বৈঠক করবো। আমাদের কার্যক্রম কীভাবে আরও জোরদার করা যায়, সেদিকে এখন নজর দিচ্ছি। এ জন্য আমরা একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।’ তবে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে এর খুব বেশি সুফল পাওয়া যায়নি। দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন তার এলাকায় এডিস মশার লার্ভা পেলেই সংশ্লিষ্ট ভবন বা প্রতিষ্ঠানের মালিক বা কর্মকর্তাদের জরিমানা করেছেন। অন্যদিকে, উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম তার এলাকায় এডিস মশা নির্মূলে প্রতিটি এলাকার পাড়া মহল্লায় কমিটি গড়ে ভবনে ভবনে ঘুরে মশার লার্ভা খুঁজেছেন। তবে এসব কাজেও মশার প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি না কমার মূল কারণ ছিল রাজধানীসহ দেশে মশা মারার কার্যকর ওষুধ না থাকা। পরবর্তীতে চাপে পড়ে বিমানযোগে মশার ওষুধ আনা হলেও তার কার্যকারিতা এখনও টের পায়নি রাজধানীবাসী।

এ বছরে সদ্যোজাত থেকে বিভিন্ন বয়সী শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, প্রৌঢ়-বৃদ্ধ-সব বয়সী মানুষই ডেঙ্গুর শিকার হয়েছেন। শিশু, প্রসূতি মা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষদের মৃত্যুগুলো খুব নাড়া দিয়ে গেছে পুরো জাতিকে। এদের অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। অনেকে মারা গেছেন জ্বরের ঘোরে, ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার আগেই। ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচিতে এসে মৃত্যু হয়েছে স্বাস্থ্য সহকারীর, মারা গেছেন চিকিৎসক, দেশে বেড়াতে এসে মারা গেছেন প্রবাসী, একাধিক সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন এমন পরিবারগুলোতে উদ্বেগের মাত্রা ছিল ভয়াবহ, এমনও হয়েছে কাউকে কবর দিয়ে এসে একই পরিবারের অন্য সদস্যকে থাকতে হয়েছে হাসপাতালের বেডে মশারির ভেতরে। আবার  আক্রান্ত স্বজনের সেবা করতে করতে এসে হাসপাতালের ভেতরেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন পরিবারের অন্য সদস্য।

ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এমন হয়েছিল যে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুরাতন-নতুন ভবনে জায়গা দিতে না পেরে পাশের নব নির্মিত শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি  ইন্সটিটিউটে রোগীদের রাখা হয়। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে আপদকালীন বেড পাতা হয় ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে, সিঁড়ির পাশে, বাথরুমের সামনে, লিফটের সামনে। কোথাও পা ফেলার জায়গা ছিল না। বেসরকারি ছোট ও মধ্যমমানের হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি স্কয়ার হাসপাতালের মতো হাসপাতালে রোগী ভর্তি না করাতে অনুরোধ করেছে, অ্যাপোলো হাসপাতাল-ইউনাইটেড হাসপাতালে রোগীরা অপেক্ষমাণ থেকেছে, ওয়ার্ডে বেডের অভাবে আইসিইউ থেকেও রোগীদের সরানো যায়নি। বাধ্য হয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে ফ্রি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এর বিভিন্ন পরীক্ষার ফি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় যা এখনও কার্যকর রয়েছে।

ডেঙ্গুর প্রকোপের শুরুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে বিদেশ সফর করায় সমালোচিত হন। তবে দ্রুত ফিরে এসে মোকাবিলায় অল আউট প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে জানিয়েছিলেন। এরপর চিকিৎসক, নার্সসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঈদের ছুটি বাতিল করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, প্যাথলজি ল্যাবে দিনরাত কাজ করেছেন সংশ্লিষ্টরা, গঠন করা হয় একাধিক মনিটরিং সেল। ঢাকার বেশকিছু হাসপাতালসহ ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট  বিষয়ে একাধিক ট্রেনিংয়ের আয়োজন করে অধিদফতর।

তবে বছরের শেষ মাসের শেষ সপ্তাহে নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমে আসে। গত ( ২৯ ডিসেম্বর) ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন পাঁচজন রোগী, যেখানে গত আগস্ট মাসে ২৪ ঘণ্টাতে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা এক হাজার ৯২৯ জন পর্যন্ত ছিল। তবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা নেমে আসে এক হাজার ২২৭ জনে। তা সত্ত্বেও এই সংখ্যা গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় অনেক বেশি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে রোগীর সংখ্যা ছিল ২৯৩ জন।

দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। সেসব প্রতিবেদনে সরকারি ও বেসরকারি হিসাবে রোগী সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যার পার্থক্য, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা ও সাধারণ মানুষের ভীতির কথাও জানানো হয়।

মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির শিরোনাম ছিল দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু প্রকোপের সঙ্গে লড়ছে বাংলাদেশ। সেখানে তারা বলে, ডেঙ্গু রোগীদের জায়গা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি –বেসরকারি হাসপাতাল, যা গোটা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়  একটি বিপর্যয়ের মতো হাজির হয়েছে এবং শহর কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কূটনীতিবিষয়ক সাময়িকী ডিপ্লোম্যাট বলেছে, বাংলাদেশের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব মহামারি পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনবরত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ, বাংলাদেশজুড়ে আতঙ্ক শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে এশিয়া নিউজ।  যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানায়, অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি।

দেশের এমনই এক পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে আসেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ডা. ভুপেন্দর নাগপাল। ডা. নাগপাল সে সময়ে সাংবাদিকদের বলেন, মাত্র এক চা-চামচ পানিতেও এডিস মশা ডিম পাড়ে, যে ডিম পানি ছাড়াও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে।

ডা. নাগপাল বলেন, এডিস কেবল বর্ষা মৌসুমে ডিম পারে-এমন ধারণা ভুল। প্রকৃত তথ্য হচ্ছে-এই মশা বছরের ৩৬৫ দিনই ডিম পারে আর এসব ডিম এক বছরেও নষ্ট হয় না। পানি পেলেই সেই ডিম থেকে মশার জন্ম হয়, তাই ভেক্টর কন্ট্রোল করা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। একইসঙ্গে তিনি আরও বলেন, যদি শহরের নির্মাণাধীন ভবনের প্রজনন স্থানগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে ডেঙ্গু রোগের ৪০ শতাংশ প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়াতে হস্তক্ষেপ করতে হয় উচ্চ আদালতকেও। গত ২ জুলাই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদালত বলেন, আপনারা কী ওষুধ দিচ্ছেন, তাতে তো নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। এমনকী পৃথিবীর আর কোনও দেশে মশা মারতে আদালতকে রুল দিতে হয় না।

কেন হঠাৎ করেই চলতি বছরে ডেঙ্গুর এমন প্রাদুর্ভাব হলো জানতে চাইলে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চলতি বছরে যে হঠাৎ করে বিষয়টি হয়েছে তা নয়, এটা ধীরে ধীরে বেড়েছে। গতবছর থেকেই ওষুধ কার্যকর ছিল না, একইসঙ্গে ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তন হয়েছে এবং এই রোগের জটিলতা বেড়েছিল এবারে।

মশক নিধন হয়নি উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, এক কথায় বলবো মশা নিধন করা হয়নি। যেভাবে মশার প্রজনন হয়েছে সেভাবে মশা নিধন হয়নি বলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ এবারে এত বেশি। এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া বিষয়ক কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ যখন বাড়লো তখন মশার প্রজনন বন্ধ করতে যে সক্ষমতা দরকার সেটা আমাদের ছিল না।

এদিকে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যেখানে ডেঙ্গু রোগী আছে সেখানেই মশা নিধনের জন্য কাজ করতে হবে বলছেন আইসিডিডিআর,বির গবেষক আতিক আহসান। তিনি বলেন, যেখানে ডেঙ্গু রোগী আছে, সেখানেই মশা নিধনের কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ কোথায় কম বা কোথায় বেশি সেটি জানা সবার আগে জরুরি। আর ডেঙ্গু রোগীর পরিমাণ জানা গেলেই সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি-বেসরকারি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। এখন থেকেই একটি কার্যকর সার্ভিল্যান্স সিস্টেম তৈরি করতে হবে এবং এটা অত্যন্ত জরুরি। একই কথা বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখন থেকেই কাজ করতে হবে, বছরব্যাপী কর্মপরিকল্পনা – কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে, না হলে আগামী বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা তার।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ  ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, এতদিন কেবল ডেঙ্গুকে ঢাকার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে, কিন্তু এবারে ডেঙ্গু পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেজন্য অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে কাজ করবে আর ডেঙ্গু চিকিৎসার গাইড লাইনেও পরিবর্তন আনতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘পুরো দেশে মশা নিয়ন্ত্রণে এখন থেকেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে, মশক নিধন কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ার কোনও সুযোগ নেই। নয়তো আগামী বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও ভয়াবহ হতে পারে।

প্রসঙ্গত, স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের হিসাব থেকে জানা যায়- ২০০০ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন পাঁচ হাজার ৫৫১ জন, মারা যান ৯৩ জন; ২০০১ সালে আক্রান্ত হন দুই হাজার ৪৩০ জন, মারা যান ৪৪ জন; ২০০২ সালে আক্রান্ত হন ছয় হাজার ২৩২ জন, মারা যান ৫৮ জন; ২০০৩ সালে আক্রান্ত হন ৪৮৬ জন, মারা যান ১০ জন; ২০০৪ সালে আক্রান্ত হন তিন হাজার ৩৩৪ জন, মারা যান ১৩ জন; ২০০৫ সালে আক্রান্ত হন এক হাজার ৪৮ জন, মারা যান চার জন; ২০০৬ সালে আক্রান্ত হন দুই হাজার ২০০ জন, মারা যান ১১ জন; ২০০৭, ২০০৮, ২০০৯ এবং ২০১০ সালে যথাক্রমে আক্রান্ত হন ৪৬৬, এক হাজার ১৫৩, ৪৭৪ এবং ৪০৯ জন; এই চার বছরে কেউ মারা যাননি। আবার ২০১১ সালে আক্রান্ত হন এক হাজার ৩৬৯ জন ও মারা যান ৬ জন, ২০১২ সালে আক্রান্ত হন ৬৭১ জন, মারা যান একজন; ২০১৩ সালে আক্রান্ত হন এক হাজার ৭৪৯ জন ও মারা যান ২ জন; ২০১৪ সালে আক্রান্ত হন ৩৭৫ জন, তবে কেউ মারা যাননি, ২০১৫ সালে আক্রান্ত হন তিন হাজার ১৬২ জন, মারা যান ছয় জন; ২০১৬ সালে আক্রান্ত হন ছয় হাজার ৬০ জন, মারা যান ১৪ জন; ২০১৭ সালে আক্রান্ত হন দুই হাজার ৭৬৯ জন, মারা যান ৮ জন এবং গত বছর ২০১৮ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৪৮ জন এবং মৃতের সংখ্যা ছিল ২৬ জন।

(বাংলা ট্রিবিউন, ঘাটাইলডটকম)/-

Recent Posts

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

Doctors Dental

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

বিভাগসমূহ

পঞ্জিকা

July 2020
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031