বিপদ শুধু কাশ্মীরিদেরই নয়, সবারই

উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মোন্মাদনা, বিদেশভীতি, কর্তৃত্ববাদ ও আধিপত্যবাদী মনোভঙ্গি মিলেমিশে যখন একটি রাজনৈতিক আদর্শ তৈরি করে এবং সেই আদর্শের প্রচারকেরা যখন ক্ষমতায় আসীন হয়, তখন একটি দেশে কী পরিস্থিতির সূচনা হতে পারে, তার উদাহরণ হচ্ছে বিজেপি এবং তার নেতা নরেন্দ্র মোদির শাসিত ভারত। ‘ব্রুট মেজরিটি’ বা বর্বর সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে এমন একটি সরকার কীভাবে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বদলে দিয়ে ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার দিকে এগোয়, সেই উদাহরণও মিলতে শুরু করেছে। জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদাসংবলিত ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা এবং সংশ্লিষ্ট ৩৫এ ধারা বাতিল, কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করা এবং কাশ্মীরের জনগণের ওপর কেন্দ্রীয় শাসনের নামে যে প্রত্যক্ষ দখলদারির শাসন চাপিয়ে দেওয়া হলো, তাকে বিবেচনা করতে হবে এই পটভূমিকায়।

কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদাসংবলিত সংবিধানের ৩৭০ ধারায় যে স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়েছে, তা কাশ্মীরের জনগণ অতীতে খুব বেশি ভোগ করেছে তা নয়, ১৯৫৭ সালের পর দফায় দফায় তাকে দুর্বল করা হয়েছে। ১৯৫৬ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির ৪৭টি আদেশের মাধ্যমে তাকে এমন জায়গায় নিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে, যেখানে স্বায়ত্তশাসন কেবল প্রতীকী হয়ে উঠেছে। এর পরের কথা বাদই দিলাম। এখন সেই প্রতীকী স্বায়ত্তশাসনেরই কেবল অবসান ঘটল তা নয়, একই সঙ্গে এই ধারার কারণে ৩৫এ ধারার মাধ্যমে ভূমির ওপর, চাকরির ওপর তাদের যে অধিকার ছিল এবং স্থায়ী বাসিন্দা বলে কারা বিবেচিত হবে, সে বিষয়ে রাজ্যের যে এখতিয়ার ছিল, তারও অবসান হওয়ার ব্যবস্থা হলো।

৩৭০ ধারা ছাড়া ৩৫এ ধারার কোনো বৈধতা থাকবে না, ইতিমধ্যেই সেই ধারাও বাতিল করার ব্যবস্থা হয়েছে। যাঁরা এই ৩৫এ ধারার ইতিহাস জানেন, তাঁরা নিশ্চয়ই মনে করতে পারবেন যে এর জন্মের উৎস ১৯২০ সালে কাশ্মীরের শেষ হিন্দুধর্মাবলম্বী মহারাজা হরি সিংয়ের আমলে। সেই সময়ে কাশ্মীরের ক্ষুদ্র হিন্দু জনগোষ্ঠীই দাবি করেছিল যে এমন ব্যবস্থা করা হোক, যাতে সমতলের হিন্দুরা এসে তাদের চাকরি নিতে না পারে। এখন এই ব্যবস্থা বাতিলের মধ্য দিয়ে যা অর্জিত হবে, তার মডেল হচ্ছে, ইসরায়েল কর্তৃক অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকায় বসতি স্থাপন; ওয়াশিংটন পোস্ট–এ প্রকাশিত এক লেখায় কাশ্মীরবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হাফসা কাঞ্জোয়াল একে বর্ণনা করেছেন ‘ভারতের সেটলার-কলোনিয়াল প্রজেক্ট’ বলে।

কাশ্মীর ইতিমধ্যেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সামরিক উপস্থিতির এলাকা বা মিলিটারাইজড জোন বলে পরিচিত; সেখানে ভারতীয় সৈন্যদের আচরণ দখলদার বাহিনীর মতোই। যে কারণে গত ৩০ বছরে কমপক্ষে ৩০ হাজার কাশ্মীরিকে প্রাণ দিতে হয়েছে। সংবিধানের ৩৭০ ধারা যে তার আসল অর্থ হারিয়ে ফেলেছিল, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের হাত থেকে কাশ্মীরের মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারেনি, তার অসংখ্য উদাহরণ আছে। ভারতের সব কটি রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে যে আর কোনো রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকার এতবার হস্তক্ষেপ করেনি। সরকার বাতিল করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বহুবার, কেন্দ্রের ইচ্ছামাফিক। সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রের শাসন কোথায় চলেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আর কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে, ভারতের সেনাবাহিনীর সদস্যরা আর কোথাও এত দীর্ঘ সময় ধরে এত নগ্নভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেনি এবং তার জন্য দায়মুক্তি পায়নি।

ফলে ৩৭০ একটা সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে যে খুব কার্যকর বিষয় ছিল তা নয়, কিন্তু এর যে প্রতীকী মূল্য তৈরি হয়েছে, এর যে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্মের ওপর পড়েছে এবং যা বাস্তবে ভারতের সঙ্গে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছে, এক ঘোষণার মধ্য দিয়ে তার অবসান ঘটেছে। বিজেপি ও তার বন্ধুরা, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ মনে করতে পারেন যে রাজ্যের মর্যাদা লোপ করে দিয়ে, বিশেষ ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে তাঁরা ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের ইন্টিগ্রেশনের—ভারতের সঙ্গে একীভূতকরণে সাফল্য লাভ করলেন, তাঁরা তাঁদের নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পালন করে রাজনৈতিক শক্তি দেখালেন।

কিন্তু আমার ধারণা, তাঁরা কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভারতীয় ইউনিয়নের যে মানসিক বন্ধন, তা ছিন্ন করলেন। মোদি সরকারের এই পদক্ষেপ আদালতে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, সেটা আমরা নিশ্চিত করেই বলতে পারি। সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যদি এই আদেশ বাতিলও করে দেন, তবু এই ছিন্ন সুতো আর জোড়া দেওয়া যাবে না। গত কয়েক দশক কাশ্মীরে যে রাজনীতিবিদেরা কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে মানুষকে এই বলে যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের আরও বেশি অধিকার দিতে প্রস্তুত—নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ সরকারের এই পদক্ষেপ তাঁদের যুক্তিকে মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এতে কাদের যুক্তি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠল, তা নিশ্চয়ই কাউকেই বোঝাতে হবে না।

কাশ্মীর বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের প্রভাব কাশ্মীরে পড়বে, তা সহজেই অনুমেয়। হাজার হাজার সৈন্যের উপস্থিতি এবং কার্যত সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কাশ্মীরিরা কতটা প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারবে, সে বিষয়ে সংশয়ের বাস্তব কারণ রয়েছ। এই অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের ‘আইনি ব্যবস্থা’ করা হয়েছে, তাতে বোঝা যায় সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া মোকাবিলার কৌশল কী হবে। গত সপ্তাহে কোনো রকম আলাপ-আলোচনা ছাড়াই ‘অবৈধ কার্যক্রম নিবারণ আইন’ (আনলফুল অ্যাকটিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট—ইউএপিএ) এবং ‘জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইন’ (ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি অ্যাক্ট) সংশোধন করা হয়েছে। এই সংশোধনীর ব্যাপারে পার্লামেন্টে কার্যত আলোচনাই হয়নি, কোনো নোটিশ না দিয়েই এই সব সংশোধনী পাস করানো হয়েছে। ফলে এখন পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় বসে কোনো ভারতীয় নাগরিক যদি লেখায় বা কথায় ভিন্নমত প্রকাশ করেন, তবে তাঁকে সন্ত্রাসী বলে চিহ্নিত করে আটক এবং জামিন ছাড়াই মাসের পর মাস আটকে রাখা যাবে। রাষ্ট্র তার সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। এই আইন সারা ভারতেই প্রয়োগ হবে, ফলে কাশ্মীরে অভিযানের আগে এগুলোকে শাণিয়ে তোলা হলেও তার লক্ষ্য কেবল কাশ্মীর নয়।

আর এখানেই আমাদের বোঝা দরকার যে কাশ্মীরে যা ঘটেছে, ঘটছে ও ঘটবে, তা কেবল কাশ্মীরের জনসাধারণ বা সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্যই নয়, এর মধ্য দিয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী কর্তৃত্ববাদের নখদন্ত শাণানো হচ্ছে। অমুসলিম বা কাশ্মীরি নয় বলে অন্যরা রেহাই পাবে, এমন আশা করার কারণ নেই। গত কয়েক বছরে ঘৃণা-বিদ্বেষের যে চাষাবাদ করা হয়েছে, তার পরিণতি গো-রক্ষকদের তাণ্ডবে, জয় শ্রীরামকে হিংসাধ্বনিতে পরিণত করার মধ্যে দেখতে পেয়েছি। রাষ্ট্র সেখানে সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে। আর এখন রাষ্ট্রের সব শক্তি দিয়েভিন্ন মত, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন ভাষার বিরুদ্ধেই যেন যুদ্ধের ঘোষণা করেছে।

সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের আশু লক্ষ্য হচ্ছে কাশ্মীর, অবশ্যই সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ধারার ওপর ভিত্তি করেই আরও পাঁচটি ধারা সংবিধানে যুক্ত হয়েছে, যার আওতায় নাগাল্যান্ডে নাগারা, অরুণাচল রাজ্যে নাগাদের একাংশ, মিজো এবং অন্য উপজাতিরা, মেঘালয়ে গারো, খাসি ও মিকির উপজাতির সদস্যরা সাংবিধানিক সুবিধা পেয়ে আসছে। ৩৭০ ধারা বাতিলের পর সেগুলো নিয়ে কেবল প্রশ্ন উঠবে তা নয়, বিজেপি ও তার নেতারা এই উদাহরণ দিয়েই সেগুলো বাতিল করে দেবেন না, তার গ্যারান্টি কোথায়? যে হিন্দুত্ববাদী আদর্শের কথা তাঁরা বলেন, সেখানে এই ভিন্নতা, এই বৈশিষ্ট্য অগ্রহণযোগ্য। আর সেই বিবেচনায়ই সাবেক অর্থমন্ত্রী চিদাম্বরমের হুঁশিয়ারির কথাগুলো শুনতে হবে।

একসময়কার সংবিধানবিষয়ক আইন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘আজ পার্লামেন্টে যে অসাংবিধানিক ও অবৈধ প্রস্তাব পাস হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে যে ভয়াবহ উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়েছে, তার ভয়াবহ বিপদ সম্পর্কে ভারতের জনগণকে, প্রতিটি রাজ্যের জনগণকে জেগে উঠতে হবে। আজ আমি সব দল, সব রাজ্য, সব নাগরিককে এ বিষয়ে সতর্ক করতে চাই যে রাজ্যগুলোর সমাহার (ইউনিয়ন অব স্টেটস) হিসেবে ভারতের যে ধারণা, তা আজ ভয়াবহ বিপদের মুখে।’

ভারতের এই ঘটনাবলির প্রতিক্রিয়া কেবল ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রের মধ্যে সীমিত থাকবে, এমন ভাববার পক্ষে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। এটা কেবল এই কারণে নয় যে কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তান-ভারতের ৭০ বছরের দ্বন্দ্ব-সংঘাত আছে। এই কারণেও যে এখন কোনো ঘটনাই সীমান্তে কাঁটাতার দিয়ে আটকানো যায় না। আপাতত যদি ভারতের সৈন্যরা কাশ্মীরে তাঁদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষমও হন, তবে তার অর্থ এই নয় যে কাশ্মীরে অনন্তকালের জন্য কবরের শান্তি নেমে আসবে।

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

Views