বাকশাল থেকে মোশতাক মন্ত্রীসভার কুশীলবদের পরিণতি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর তাঁর রক্তের ওপর পা দিয়ে ক্ষমতায় বসেন মোশতাক আহমেদ। বঙ্গবন্ধুর চেয়ার দখল করে দেশের রাষ্ট্রপতি বনে যান তাঁরই মন্ত্রিসভার সদস্য মোশতাক। অবশ্য বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারের হত্যার পরপরই এই খুনের সঙ্গে মোশতাকের জড়িত থাকার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে যায়। হত্যা পরিকল্পনায় তার সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি পরবর্তীতে প্রমাণও পাওয়া যায়।

মোশতাকের পাশাপাশি বাকশাল সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য তাহের উদ্দিন ঠাকুরেরও সম্পৃক্ততা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে।

দু’জনই মূলত একইসঙ্গে পরিকল্পনা করেন।

হত্যার পেছনে বঙ্গবন্ধু সরকারের অন্য কোনও সদস্যের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া না গেলেও বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যই যোগ দিয়েছিলেন মোশতাকের মন্ত্রিসভায়।

মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যারা স্থান পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র একজন ছিলেন নতুন। বাকিরা সবাই ছিলেন বাকশাল সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর  ওই বছরের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটালে ৮৩ দিনের মাথায় ৫ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হয় মোশতাক সরকার।

পরে ৭ নভেম্বর আরেকটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান।

খন্দকার মোশতাক ১২ জন মন্ত্রী এবং ১১ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে তার মন্ত্রিসভা গঠন করেন। মন্ত্রিসভার ২৩ সদস্যের মধ্যে ২১ জনই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বাকশালের কেবিনেট সদস্য। তাদের দফতরও খুব একটা পরিবর্তন করা হয়নি। প্রায় সবাইকে আগের দফতর দেওয়া হয়েছিল।

বাকশালের মন্ত্রিসভার বাইরে খন্দকার মোশতাক কেবলমাত্র একজনকে তার মন্ত্রিসভায় নতুন করে যুক্ত করেন।

এছাড়া মোশতাকের মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন না, ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ।

মোশতাক ক্ষমতা গ্রহণের সময় প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করা হয়। ফলে তার সরকারে কোনও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৮ সালের ২৯ জুন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত ছিল।

বঙ্গবন্ধুর বাকশাল মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী ও বাকশালের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের ৪ নম্বর সদস্য খন্দকার মোশতাক তার কেবিনেটের রাষ্ট্রপতি হয়ে উপরাষ্ট্রপতি করেন বঙ্গবন্ধু সরকারের ভূমিমন্ত্রী মোহাম্মদ উল্লাহকে।

বঙ্গবন্ধু সরকারের ডেপুটি স্পিকার আব্দুল মালেককে স্পিকার মনোনীত করেন খন্দকার মোশতাক।

এছাড়া বাকশালের বিরোধিতাকারী মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গনি ওসমানীকে মন্ত্রীর মর্যাদায় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেন মোশতাক।

বাকশালের মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে বেশিরভাগই চাপের মুখে খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন বলে কথিত রয়েছে। অবশ্য দু-একজন স্বেচ্ছায় ওই মন্ত্রিসভায় যোগ দেন বলেও শোনা যায়।

এদিকে বাকশালের মন্ত্রিসভার ২৯ সদস্যের মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানিসম্পদ উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ শক্তি বিষয়ক মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে ১৫ আগস্ট ঘাতকরা হত্যা করে।

মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যের মধ্যে জাতীয় তিন নেতা উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী এম মনসুর আলী, শিল্পমন্ত্রী এইচ এম কামারুজ্জামান, কৃষিমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, তথ্য ও বেতার মন্ত্রী এম কোরবান আলী এবং ওই সময় বিদেশে থাকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেননি।

প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মোমিন তালুকদার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেননি।

এদের  মধ্যে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও কামারুজ্জামানকে মোশতাকের ক্ষমতাচ্যুতির দুই দিন আগে কারাভ্যন্তরে হত্যা করা হয়।

তাদের সঙ্গে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতার অন্যতম এবং বাকশাল পূর্ববর্তী সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকেও।

মন্ত্রিসভায় যেতে অস্বীকৃতি জানালে বাকশালের মন্ত্রীদের খন্দকার মোশতাকের শাসনামল বা তারপরে রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করতে হয়।

এদিকে মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া বেশ কয়েকজন সদস্য মোশতাকের পতনের পর আবারও আওয়ামী লীগে ফেরত আসেন। তারা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার পাশাপাশি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আবার কেউ কেউ জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মন্ত্রিসভার সদস্য হন। দু’একজন রাজনীতি থেকে ইস্তফা দেন।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তাঁর মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী ও বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন।

তবে, ক্ষমতা গ্রহণের ৮৩ দিনের মাথায় তার পতন হয়।

এরপর কিছুদিন বন্দি থাকলেও ১৯৭৬ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পান। এ সময় ডেমোক্রেটিক লীগ নামে নতুন একটি দল গঠন করলেও তাতে জনগণের সাড়া মেলেনি। পরে তিনি আরও একাধিকবার জেলে যান। দুর্নীতির মামলায় ৫ বছরের সাজাও হয় তার।

১৯৯৬ সালের ৫ মার্চ তিনি মারা যান।

মোহাম্মদউল্লাহকে ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রবর্তন হয়েছিল বাকশাল ব্যবস্থা। বাকশাল ব্যবস্থার অধীনে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হলে মোহাম্মদউল্লাহকে বাকশাল সরকারের ভূমিমন্ত্রী হিসেবে নিজের মন্ত্রিসভায় স্থান দেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই খন্দকার মোশতাকের সরকারে যোগ দেন তিনি। মোশতাক তাকে উপরাষ্ট্রপতি করেন।

তিনি জিয়ার সরকারেও মন্ত্রী ছিলেন। তিনি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মাত্র সপ্তাহখানেক আগে ৮ আগস্ট বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে বাকশালের মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়। তাকে এর আগে রাষ্ট্রপতিও বানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মোশতাকের মন্ত্রিসভায়ও যোগ দেন তিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। মোশতাকের পতনের পর তিনি রাজনীতিতে আর সক্রিয় ছিলেন না। ১৯৮৫ সালে তিনি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

একাত্তরে মুজিবনগর সরকারের ঘোষণাপত্র পাঠ করা অধ্যাপক ইউসুফ আলী বাকশাল সরকারের শ্রম, সমাজ কল্যাণ এবং সংস্কৃতি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

১৫ আগস্টের পর তিনি আবারও খুশি মনে যোগ দিয়েছেন খুনি মোশতাকের সরকারে। দায়িত্ব পান পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের।

মোশতাকের পতনের পরে তিনি জিয়ার আমলেও মন্ত্রী হন। এরশাদের আমলেও মন্ত্রী ছিলেন তিনি। পরে তিনি আবারও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

বঙ্গবন্ধু সরকারের আইনমন্ত্রী  মনোরঞ্জন ধরও (ময়মনসিংহ) আইনমন্ত্রী হিসেবে মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। তবে মোশতাকের পতনের পর ১৯৭৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন।

বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা থেকে তাজউদ্দীন আহমদ সরে দাঁড়ালে অর্থমন্ত্রী হন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান মল্লিক।

তিনি বাকশাল সরকারেও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। অন্যদের মতো অধ্যাপক মল্লিকও মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

অবশ্য মোশতাকের পতনের পর তিনি ফের শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান, যোগ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি ড. মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীকে বাকশাল সরকারে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেন বঙ্গবন্ধু।

শিক্ষাবিদ মোজফ্ফর আহমদ চৌধুরীও মোশতাকের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। মোশতাকের পতনের পর শিক্ষকতা পেশায় ফিরে আসেন। তিনি ১৯৭৮ সালে মারা যান।

বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার প্রবীণ সদস্য এলজিআরডি মন্ত্রী ফণী ভূষণ মজুমদার (মাদারীপুর) মোশতাকের মন্ত্রিসভায়ও একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

জানা যায়, তাকে হাসপাতালে  চিকিৎসাধীন অবস্থা থেকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় মোশতাকের মন্ত্রিসভায় শপথ নেওয়ার জন্য।

মোশতাকের পতনের পর তিনি ১৯৭৮ সালে ফের আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন। এর আগে তিনি ১৯৭৭ সালে গ্রেফতারও হন। তিনি ১৯৭৯ সালে আওয়ামী লীগের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন।

বঙ্গবন্ধু সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবদুল মান্নান (টাঙ্গাইল) মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। দায়িত্ব পান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।

মোশতাকের পরে তিনি ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগে ফেরত আসেন।

১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০২ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। তিনি ২০০৫ সালে মারা যান।

সোহরাব হোসেন (মাগুরা) ছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের পূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। মোশতাকের মন্ত্রিসভায়ও তিনি একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

মোশতাক সরকারের পতনের পরে তিনি আওয়ামী লীগে (মিজান) যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। ১৯৯৮ সালে তিনি মারা যান।

বঙ্গবন্ধু সরকারের খাদ্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রী আবদুল মোমিন (নেত্রকোনা) মোশতাকের খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগে ফেরত আসেন।

২০০২ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আসাদুজ্জামান খান (কিশোরগঞ্জ) ছিলেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। তিনিও যোগ দেন বাকশালের মন্ত্রিসভায়। পান নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

মোশতাকের পতনের পর তিনি ফিরে আসেন আওয়ামী লীগে। ১৯৭৯ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতাও নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে তিনি মারা যান।

বাকশাল সরকারের ডাক, তার ও টেলিযোযোগ প্রতিমন্ত্রী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা কে এম ওবায়দুর রহমান (ফরিদপুর) মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

মোশতাকের পতনের পর তিনি জিয়ার মন্ত্রিসভায় যোগ দেন এবং বিএনপির রাজনীতি শুরু করেন। তিনি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির মন্ত্রিসভারও সদস্য হয়েছিলেন।

জেল হত্যা মামলায় তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। পরে বিএনপির আমলে রায় হওয়া মামলায় খালাস পান।

দেওয়ান ফরিদ গাজী (সিলেট)  বাকশালের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। মোশতাকের মন্ত্রিসভায়ও তিনি একই পদ মর্যাদা পান।

পরে তিনি আওয়ামী লীগে ফেরত আসেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। এ সময় তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে জাতীয় সংসদের চিফ হুইফ ছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন (মুন্সীগঞ্জ)। মোশতাকের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ভূমি ও বিমান মন্ত্রকের দায়িত্ব পান।

পরবর্তী সময় এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হন। সর্বশেষ তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। জেল হত্যা মামলার আসামি শাহ মোয়াজ্জেম বিএনপির আমলে রায় হওয়া এ মামলায় খালাস পান।

অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী (চট্টগ্রাম) ছিলেন বাকশালের শিল্প ও প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মোশতাকের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। জেল হত্যা মামলায় আসামি ছিলেন।

বিএনপির আমলে ২০০৪ সালে এ মামলার রায় হলে তিনি বেকসুর খালাস পান।

তাহের উদ্দিন ঠাকুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) বাকশালের তথ্য ও বেতার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। মোশতাকের মন্ত্রিসভায়ও একই মর্যাদা ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

পরে তিনি জিয়া ও এরশাদ সরকারের সুবিধাভোগী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে তাহের ঠাকুরের  সম্পৃক্ততা ছিল। জেল হত্যা মামলায় তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাহের ঠাকুর এ মামলা থেকে খালাস পান।

মোসলেমউদ্দিন খান হাবু মিয়া (মানিকগঞ্জ) বাকশালের পাট প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন। মোশতাকের মন্ত্রিসভায়ও পাট প্রতিমন্ত্রী হন।

মোশতাকের পতনের পর ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন। পরবর্তী সময় মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

বাকশালের রেল ও যোগোযোগ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন নুরুল ইসলাম মঞ্জুর (পিরোজপুর)। অবশ্য বাকশাল সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালের ২১ জুলাই তাকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়।

অবশ্য খন্দকার মোশতাক তার মন্ত্রিসভায় মঞ্জুরকে জায়গা দেন। দায়িত্ব পান একই মন্ত্রণালয়ের। পরবর্তী সময়ে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। জিয়া সরকারে মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি ১৯৯৬ সালেও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

মঞ্জুরের অপসারণের পর সৈয়দ আলতাফ হোসেনকে (কুষ্টিয়া) রেল প্রতিমন্ত্রী করেন বঙ্গবন্ধু। ন্যাপ নেতা আলতাফ বাকশাল গঠনের সময় দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাকশালে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা হন।

অন্যদের মতো আলতাফ হোসেনও যোগ দেন মোশতাকের মন্ত্রিসভায়। দায়িত্ব পান একই মন্ত্রণালয়ের। মোশতাকের পতনের পর তিনি ন্যাপে ফিরে আসেন। মোজাফফর ন্যাপের একাংশের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

বাকশালের সাহায্য ও পুনর্বাসন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ডা. ক্ষীতিশ চন্দ্র মণ্ডল (পিরোজপুর)। তিনি মোশতাকের মন্ত্রিসভায়ও একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন। ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগে ফেরত এবং পরবর্তী সময় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত। পরে ডা. ক্ষিতিশ জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হন।

বাকশালের বন, মৎস্য ও পশুপালন প্রতিমন্ত্রী রিয়াজউদ্দিন আহমদ ভোলা মিয়া (রংপুর) মোশতাক সরকারের একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন। মোশতাকের পতনের পর ভোলা মিয়া বিএনপি হয়ে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হন।

মোশতাকের মন্ত্রসভায় একমাত্র নতুন সদস্য হিসেবে যুক্ত হন মোমিন উদ্দিন আহমদ (খুলনা)। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি পান যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের। পরে তিনি বিএনপি হয়ে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। এরশাদ সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত নিলে এর প্রতিবাদ জানান মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করা জেনারেল এম এ জি ওসমানী। প্রতিবাদে জাতীয় সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। কিন্তু সেই ওসমানীই আবার মোশতাকের নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন।

খন্দকার মোশতাক সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে মহিউদ্দীন আহমদ বিশেষ দূত হন। মোশতাকের পতনের পরে মহিউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন। ১৯৮৩ সালের ৮ আগস্ট তিনি দল থেকে  বহিষ্কার হলে বাকশাল গঠন করে তার চেয়ারম্যান হন। ১৯৯৩ সালে বাকশাল আওয়ামী লীগে অন্তর্ভুক্ত হলে তাকে প্রেসিডিয়াম সদস্য করা হয়।

মোশতাক ক্ষমতায় এসে আগের জাতীয় সংসদই বহাল রেখেছিলেন। স্পিকার ছিলেন আবদুল মালেক উকিল। স্পিকার হিসেবে বিদেশে স্পিকারদের একটি সম্মেলনেও যোগ দেন তিনি। পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। মালেক উকিল আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আসার আগ পর্যন্ত।

বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় সংসদে হুইপ ছিলেন আবদুর রউফ (নীলফামারী)। ওই সরকারের চিফ হুইপ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনকে মোশতাক প্রতিমন্ত্রী করার পর শূন্য হওয়া চিফ হুইপের পদে আবদুর রউফকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন ১৫ আগস্টের আগে সরকারি কাজে বিদেশ সফরে ছিলেন। জাতির পিতার হত্যার খবর পাওয়ার পর তিনি দেশে আসতে অস্বীকৃতি জানান। অভিযোগ আছে, বঙ্গবন্ধুর জীবিত দুই কন্যার একজন তখন ড. কামাল হোসেনকে লন্ডনে মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করতে বললেও তখন তা করেননি ড. কামাল। অবশ্য দেশে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পরে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পরে দল ত্যাগ করে নিজেই নতুন দল গঠন করেন। বর্তমানে তিনি গণফোরামের সভাপতি।

বাকশাল সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন আবদুস সামাদ আজাদ (সিলেট)। তিনি মোশতাকের সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। যার কারণে আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের মতো তাকেও কারাগারে যেতে হয়।

১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পরই তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। পরে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে একাধিকবার এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় তার মৃত্যু হয়।

মোশতাক সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি  জানানো বাকশাল মন্ত্রিসভার সদস্য এম কোরবান আলী বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে  বাকশালের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই মন্ত্রী গ্রেফতার হন এবং প্রায় দুই বছর কারান্তরীণ থাকেন।

কোরবান আলী ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।

১৯৮১ সালে তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন।

এম কোরবান আলী ১৯৮৪ সালে এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। তিনি প্রথমে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের এবং পরে পূর্ত ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯০ সালের ২৩ জুলাই ঢাকায় তার মৃত্যু হয়।

বাকশালের প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র আবদুল মোমিন তালুকদার (সিরাজগঞ্জ) মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যাননি।  তিনি বাকশালের স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ‍

তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। পরে দলের উপদেষ্টা হন। ১৯৯৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি মারা যান।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম)/-

Print Friendly, PDF & Email