বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে আসাম ও ত্রিপুরায় যাচ্ছে ভারতীয় পণ্য

বাংলাদেশের বন্দর পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলে পণ্য পৌঁছে দিতে কলকাতার বন্দর থেকে একটি জাহাজ রওনা হয়েছে। সোমবার (২০ জুলাই) এটি চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছাবে।

বৃহস্পতিবার কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর থেকে চারটি কনটেইনার রড ও ডালের একটি চালান নিয়ে যাত্রা করেছে এমভি সেঁজুতি।

ভারতের হাই কমিশনার ও বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারত বাংলাদেশ ট্রান্সশিপমেন্ট এর চুক্তির আওতায় প্রথমবারের মতো এ জাহাজটি ১০৮ টি কনটেইনার নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে।

এরপর, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কাভার্ড ভ্যানে করে চারটি কনটেইনার আখাউড়া-আগরতলা স্থলবন্দর হয়ে প্রবেশ করবে ভারতের ত্রিপুরা ও আসাম রাজ্যে।

ভারতীয় হাইকমিশন ও বাংলাদেশের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক চিঠির সূত্রে জানা গেছে, এ চারটি কনটেইনারের মধ্যে দুই কনটেইনার রড ত্রিপুরার জিরানিয়ার এস এম করপোরেশনের। বাকি দুই কনটেইনার ডাল যাবে আসামের জেইন প্রতিষ্ঠানের কাছে।

এ চালানের মাধ্যমেই বাংলাদেশের বন্দর ও সড়কপথ ব্যবহার করে ভারতীয় পণ্য তাদের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে পরিবহনের প্রথম পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করলো।

‘এমভি সেঁজুতি’ জাহাজের এজেন্ট ম্যাঙ্গো লাইন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইয়াকুব সুজন ভূঁইয়া বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে কলকাতা বন্দর থেকে ভারতের আরেক বন্দর হলদিয়া বন্দরে যাবে এ জাহাজটি। সেখান থেকে কিছু কনটেইনার নিয়ে এটি চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে রওনা দেবে।’

‘জাহাজটিতে ১০৮টি কনটেইনারের মধ্যে বাংলাদশি ব্যবসায়ীদের জন্য রয়েছে ১০৪টি। বাকি চার কনটেইনার সড়ক পথে ভারতে যাবে। বিস্তারিত কাগজপত্র আমাদের হাতে এলেই জাহাজটি বাংলাদেশের বন্দরে ভেড়ানোর জন্য কাস্টমসের কাছে অনুমতি চাইবো।’

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘এখন বন্দরের কোন জাহাজ জট নেই। ফলে জাহাজটি আসা মাত্রই আমরা বার্থিং কার্যক্রম শুরু করতে পারবো।’

বাংলাদেশের অন্যান্য আমাদানিকারকদের মতোই নির্ধারিত হারে মাশুল আদায় করে জাহাজটিকে ছাড়পত্র দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

চুক্তি অনুযায়ী, ভারতীয় পণ্য ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সাত ধরনের মাশুল আদায় করবে। এই সাতটি হলো প্রতি চালানের প্রসেসিং ফি ৩০ টাকা, প্রতি টনের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট ফি ৩০ টাকা, নিরাপত্তা মাশুল ১০০ টাকা, এসকর্ট মাশুল ৫০ টাকা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক মাশুল ১০০ টাকা।

এ ছাড়া প্রতি কনটেইনার স্ক্যানিং ফি ২৫৪ টাকা এবং বিধি অনুযায়ী ইলেকট্রিক সিল ও লক মাশুল প্রযোজ্য হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের অক্টোবরে দিল্লিতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য সরবরাহ করতে দুই দেশের চুক্তি হয়।

চুক্তির আর্টিক্যাল-৪ (পোর্ট এন্ড আদার্স ফ্যাসিলিটিজ) এ বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে যে ধরণের সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে পরিবাহিত ইন্ডিয়ার পণ্যের ক্ষেত্রেও একই সুবিধা প্রদান করবে। এছাড়াও এ ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ‘প্রায়োরিটি’র ভিত্তিতে ‘স্পেস’ প্রদান করবে ‘ডেডিকেটেড’ নয়।

ভারতীয় পণ্য অগ্রাধিকার (প্রায়োরিটি) দেয়ার প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক বলেন, এর অর্থ এই নয়, ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজ ভেড়ানোর জন্য আমরা দেশীয় জাহাজকে জেটি থেকে বের করে দেবো। বন্দরের জেটি ও ইয়ার্ড খালি থাকা সাপেক্ষেই তাদের এ সুবিধা দেয়া হবে।

একই দিনে একটি বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের পণ্য বোঝাই জাহাজ ও ভারতের পণ্য বোঝাই জাহাজ বন্দরে এলে কোনটি আগে বন্দরে ভিড়বে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী অবশ্যই ভারতের পণ্যবাহী জাহাজটিকেই আগে প্রায়োরিটি দিতে হবে।’

এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে হওয়া একটি চুক্তিকে সবারই সম্মান করা উচিত।’ বন্দরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ভারতের পণ্যের ক্ষেত্রে যে প্রায়োরিটি দেয়ার কথা বলা হয়েছে তাতে বন্দরের কিছু করার নেই। চুক্তি অনুযায়ী তা আমাদের করতে হবে। যদিও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি রপ্তানি বাড়ার কারণে বছরে কয়েক দফা, প্রায় ৫-৬ মাস জাহাজ জটে পড়তে হয়।’

তিনি বলেন, ‘শুরুতে ভারতের পক্ষ থেকে তাদের পণ্যবাহী জাহাজের জন্য একটি ডেডিকেটেড জেটি ও ইয়ার্ড দাবি করা হয়েছিল। বন্দর বিভিন্ন চেষ্টার মাধ্যমে ‘ডেডিকেটেড’ এর পরিবর্তে ‘প্রায়োরিটি’ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

দেশীয় ব্যবসায়ীদের চেয়ে ভারতের ব্যবসায়ীরা বেশি সুযোগ সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে বিভিন্ন ব্যবসায়ী মহলে। তবে ভারতীয় পণ্যের এ সুবিধার পক্ষেও মত দিয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘আপনার বাড়িতে কোন মেহমান এলে নিজে খাওয়ার আগে অবশ্যই মেহমানদের খাওয়ানো উচিত। সে হিসাবে ভারতীয় পণ্য বেশি প্রায়োরিটি পেতে পারে।’ এতে দেশি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের তেমন কোন সমস্যা হবে না বলে দাবি করেন তিনি।

তবে তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজেএমইএর সহ সভাপতি এ এম চৌধুরী সেলিম বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্দরে যেহেতু জাহাজ জট ও কনটেইনার জট নেই সেহেতু আপাতত কোন সমস্যা হবে না। তবে যখন বন্দরের জাহাজ জট শুরু হবে এবং চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ভারতের পণ্য পরিবহন আস্তে আস্তে বাড়বে তখন দেশিয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।’

তিনি বলেন, ‘একজন ব্যবসায়ী যখন নিজ দেশে প্রায়োরিটি পাবেন না তখন সে কোথাও ভাল কিছু করতে পারবেন না।’

বিজেএমইএর সাবেক প্রথম সহ সভাপতি নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমদানি পণ্য হাতে বুঝে পেতে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের। ঈদ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাজেটের আগে-পরে চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ জট তীব্র হয়ে পড়ে। তা কাটিয়ে উঠতে কয়েক মাস সময় লাগে। এমন অবস্থায় ভারতীয় পণ্য অগ্রাধিকার পেলে দেশের অর্থনীতিতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তৈরি পোশাক ক্রেতাদের কাছে জাহাজের গড় অবস্থান ও পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। ভবিষ্যতে তা আরো বাড়বে এবং রপ্তানিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।’

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এখনো জানি না বছরে ভারত থেকে কী পরিমান পণ্য এ বন্দর দিয়ে পরিবহন করা হবে। ফলে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। যদি ভারতের পণ্য পরিবহন বাড়ার পাশাপাশি আমাদের বন্দরের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ না হয় তাহলে তা দেশের আমদানি-রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (অপারেশন) এনামুল হক বলেন, ‘বর্তমানে বন্দরে কোন জাহাজ জট কিংবা কনটেইনার জট নেই। ফলে এখন প্রায়োরিটি দেয়া না দেয়া একই কথা।’

করোনার শুরুতে প্রতিটি জাহাজের গড় অবস্থান চার দিন হলেও তা কমে এখন একদিনে চলে এসেছে বলেও জানান তিনি।

(ডেইলি স্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

Print Friendly, PDF & Email