বঙ্গবন্ধু হত্যার আলোচনায় জিয়া কেন প্রাসঙ্গিক?

আগষ্ট মাস এলে, শাসককূল এত বেশী জিয়া জিয়া করে, যেটা জিয়া অনুসারীরাও বারো মাসেও করে না। অথচ তারা সব সময় জিয়ার মুর্দাবাদ চায়। অবশ্য, দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে পুনর্জীবন দিয়েছিলো জিয়া।

এমনকি আজকের প্রধানমন্ত্রী যখন ভারতে নির্বাসিত ছিলেন, তখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার নেপথ্যে কলকাঠিও নেড়েছিলেন জিয়া। তাঁর শাসনামলে ভারত থেকে তিনি দেশে ফিরে এসে বহুধাবিভক্ত আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ নিয়ে দলটিকে ফের এক সুতোয় গেথেছিলেন।

একটি রাজনৈতিক দলের এত উপকার যিনি করেছিলেন, তার নাম তো অবশ্যই প্রাসঙ্গিকভাবে উচ্চারিত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, দলটি জিয়ার নাম শ্রদ্ধার জন্য স্মরণ করে না। তাকে শাপশাপান্ত করার জন্যই স্মরন করে।

কিন্ত যারা ইতিহাসের সচেতন দর্শক কিম্বা পাঠক, তারা জানেন, এসব বলা হচ্ছে, স্রেফ নিজেদের মুখ রক্ষার জন্য।

গত কয়েকদিন ধরে সরকার প্রধান এবং আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর খুনী, ইতিহাসের খলনায়ক, ইতিহাসের ফুটনোট ইত্যাকার নানা কথা বলে চলছেন।

কেন বলছেন, কারন জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি এখন তাদের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বলেই।

আজ যদি জিয়া স্রেফ, খালেদ মোশাররফ, জেনারেল শফিউল্লাহ কিম্বা ওসমানির মত একজন নেহায়েত আর্মি অফিসার হতেন, তবে জিয়াকে এত গালমন্দ এত কটুকথা শুনতে হতোনা।

কেউ বলতো না জিয়া শেখ মুজিবের খুনীদের মদদদাতা।

এখন বলা হচ্ছে.. জাষ্ট নিজেদের ব্যার্থতা ঢাকতে কিম্বা উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর অভিপ্রায় থেকে।

আগেই বলেছি, ইতিহাসের সচেতন দর্শকমাত্র জানেন, পঁচাত্তরের পনেরই আগষ্টের আগে পরের ইতিহাস।

আগে পরার ইতিহাস বাদ দিয়ে সেদিনের ঘটনায় যদি আসি, তবুও কি জিয়াকে কোনোভাবে জড়ানো যায় এই মর্মন্তুদ হত্যার সঙ্গে।

জিয়া ছিলেন, সেনাবাহিনীর ডেপুটি চীফ। সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল শফিউল্লাহ।

শেখ মুজিবের বাড়ি যেদিন সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসাররা আক্রমন করে, সেদিন শেখ মুজিব সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে ফোন করে তাকে রক্ষার জন্য সাহায্য চেয়েছিলেন।

কিন্তু শফিউল্লাহ সেদিন শেখ মুজিবের কাছে তার অসহায়ত্ব প্রকাশ করে, ইংরেজিতে বলেছিলেন, ক্যান ইউ গেট আউট অব দ্য হাউস? তার মানে চোরের মত পালিয়ে যেতে বলেছিলেন।

সেনাপ্রধান হিসেবে এমন কথা শফিউল্লাহ বললেও তাকে আওয়ামী লীগ নিজের লোকই মনে করে। শুধু তাই নয়। তাকে দলের মনোনয়ন দিয়ে এমপিও বানায়।

ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কি তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি করার দরকার ছিলোনা?

এমনকি বত্রিশ নম্বরের কেয়ারটেকার মুহিতুল ইসলাম যে মামলাটি করেছিলেন, তাতেও তিনি তার নাম উল্লেখ করেননি।

অবশ্য বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আপিল শুনানীতে, বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলাম, কিন্ত ধরেছিলেন, শফিউল্লাহকে ছাই দিয়ে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার আপিল শুনানীর সময় আমি অবশ্য সৌভাগ্যবশত প্রতিটি কার্যাদিবসে পাখির চোখ নিয়ে ছিলাম।

আমি তখন রিপোর্টার ছিলাম। কোর্ট শফিউল্লাহকে কাপুরুষ বলেছিলেন।

কিন্তু কোথাও জিয়ার প্রসঙ্গ আসেনি, এমনকি কোনোপ্রকার সন্ধেহবশত জিয়ার নাম উচ্চারন করেনি কোর্ট।

তাহলে কেন? এখন জিয়াকে সব এমন অপবাদ দেয়া।

আমার মনে পড়ে, আমার দেশ পত্রিকায় শেখ মুজিবের মানসপুত্র কাদের সিদ্দিকী, (যিনি শেখ মুজিবের হত্যার পর ভারতে নির্বাসনে গিয়ে বাংলাদেশে অভ্যন্তরে নাশকতা চালিয়েছিলেন) পাকিস্তান প্রত্যাগত কর্নেল জামিল, জেনারেল শফিউদ্দীনকে শেখ মুজিব হত্যার জন্য অনেকটা দায়ি করেছিলেন।

কাদের সিদ্দিকী লিখেছিলেন, শেখ মুজিবের পার্সোনাল অফিসার থেকে চীফ সিকিউরিটি অফিসার সব কেন পাকিস্তান প্রত্যাগত?

খালেদ মোশাররফ, ক্ষমতা পাগল একজন মুক্তিযোদ্ধা। যে বলেছিলো, আমি সেনাপ্রধান হতে চাই, মোশতাক প্রেসিডেন্ট থাকলেও।

অথচ মোশতাককে মনে করে আওয়ামী লীগের প্রধান শত্রু, অথচ এই মোশতাক, শেখ মুজিবের মরদেহকে যথোপযুক্ত সম্মানের সাথে সমাধিস্থ করতে জেনারেলদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। হয়েছিলো ও তাই।

এবার আসি, শেখ মুজিবের খুনীদের কারা চিনতেন, কারা জানতেন।

তাজউদ্দীন তো জানতেন, সেটা সর্বজনবিদিত। ডালিম তার সঙ্গে দেখা করে অনেক কিছু বলেছিলো।

আরেক নেতার বাসায় ডালিম গিয়েছিলো, তিনি তথন মশগুল ছিলেন, গানে এবং পানাহারে! এই নেতা ছিলেন নজরুল ইসলাম।

তারপর, তিন নবেম্বর যখন তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নেয়া হলো.. তখন কি হয়েছিলো?

সুতরাং জিয়াকে দোষ দিয়ে কি কোনো লাভ হবে? হতে পারে, রাজনীতিকভাবে।

তাতে কি শাপমোচন হবে, মনে হয়না।

আর তাছাড়া, শেখ মুজিবের কাছের এগারোজন মন্ত্রী মোশতাকের সাথে গিয়েছিলো।

আরো আশ্চর্য্য যে মোশতাক সরকারের শপথ পরিচালানা করেছিলো এখন শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম।

এতই যদি তারা শেখের ভক্ত হবে, তাহলে মোশতাকের মন্ত্রীসভার রাষ্ট্রিয় আনুষ্টানিকতায় তিন কেন?

কেন শফিউল্লাহ রাষাট্রদুত। কেন এ কে খন্দকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী?

এগুলোর বিচার নেই। যত দোষ, নন্দ ঘোষ।

এটাতো ঠিক, জিয়া ছিলেন, শফিউল্লার সিনিয়র, কেন তাকে সেনাপ্রধান করা হলোনা। তিনি শুধু নিজের জীবন বিপন্ন শুধু নয় নিজের পরিবারকে বিপন্ন করে স্বাধীনতার ঘোষনা দিযেছিলেন।

আজ যারা তার সমালোচনা করে তারা সেদিন কই ছিলেন?

তাজউদ্দীন আহমদ জিয়া ম্বাধীনতার ঘোষনার প্রসংশা করছেন। প্রথমা প্রকাশনি থেকে প্রকাশিত উপধারাতে তিনি লিখেছেন।

আর ডা. এ কে ইউ এম বদরুদ্দোজা চৌধূরী যখন রাজনীতিতে আসেন, তখন তিনি জিয়ার কাছ থেকে, যে প্রশ্নের উত্তর জেনে নিয়েছিলেন। যেহেতু আপনি রাজনৈতিক দলের নেতা হয়েছেন, সেইহেতু আপনার ক্যাবিনেট এখন ‘পলিটিক্যাল ক্যাবিনেট’। আপনার দলে না থাকলেও আপনার রাজনীতি সম্পর্কে এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কীয় প্রশ্নের জবাব হয়তো আমাকেও দিতে হবে। সেই সুবাদে আমার কিছু প্রশ্ন আছে।

প্রশ্ন? জিয়াউর রহমান অনুসন্ধিৎসু হলেন।

জ্বী। আশা করি প্রশ্নগুলো ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে ধরে নেবেন।

জিজ্ঞাসু জিয়াউর রহমান – কী প্রশ্ন?

আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ পরোক্ষে প্রায়ই শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ড সম্পর্কে আপনাকে জড়িয়ে কথা বলেন। এর জবাব কী? এর আসল ঘটনা কী?

তিনি চোখে চোখ রেখে বললেন – ডাক্তার সাহেব, would you trust me fully?

of course না হলে এ প্রশ্ন কেন?

তেমনি চোখে চোখ রেখে স্থিরভাবে তিনি বললেন – I had absolutely no involvement direct or indirect in the matter.

তারপর একটু মুচকি হাসলেন।

are you satisfied? আপনার অন্য প্রশ্নগুলো কি?

আরো দুটো প্রশ্নের উত্তর জেনেছিলাম অন্য বিষয়ে। সেগুলো বারান্তরে আলোচ্য।

কিন্তু প্রথম প্রশ্নোত্তরেই মন আমার দারুণ হালকা হলো। যার সঙ্গে কাজ করবো, তাকে জড়িয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী (তৎকালীন) রাজনৈতিক দল, তার আসল জবাব জিয়াউর রহমানের নিজ মুখে শুনেছিলাম।

তাই এখনো যখন রাজনীতির সুযোগে কেউ কেউ এসব কথা তোলেন, তখন জিয়াউর রহমানের সেই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা স্পষ্ট কথাগুলি আমার মনে পড়ে।

তার দৃষ্টি তার বাক্য – সবটুকু।

(নাম বলা নিষেধ/ কমপ্রিন্ট বার্ড পাবলিকেশন -১৯৯২/ পৃষ্ঠা ৫৯-৬১)

এখন একটি কথাই মনে পড়ে তুমি মহারাজ, সাধু হলে আজ….!

(মুজতবা খন্দকার, ঘাটাইল ডট কম)/-

Print Friendly, PDF & Email