বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত মধুপুরের দোখলা বাংলো

বেলা দ্বিপ্রহর তখনো কুয়াশায় ঢাকা সূর্য আকাশে উঁকি দেয়নি। কালো রঙের জিপ গাড়ি থেকে নেমে পা রাখলেন বাংলোর সবুজ লনে। সফেদ পাঞ্জাবির ওপর চাপানো কালো কোট। গলায় জড়ানো নকশাকার পাতলা চাদর। ততক্ষণে সশস্ত্র বনকর্মীরা তটস্থ হয়ে উঠেছেন। সামনে এগিয়ে কেতাদুরস্ত কায়দায় শ্রদ্ধা জানালেন দীর্ঘাঙ্গী এক মহামানবকে।

এভাবেই ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের দোখলা ডাকবাংলোয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগমনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বনকর্মী মোশারফ হোসেন।

বঙ্গবন্ধু তখন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। সত্তরের ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পর বাঙালি জাতি এ মহানায়ককে ঘিরেই তখন স্বপ্ন দেখছিলেন। মোশারফ হোসেন তখন দোখলা ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার। স্মৃতি হাতড়ে তিনি জানান, সেদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা, শিশু শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন (অব.) মনসুর আলী এবং টাঙ্গাইলের গোপালপুর-কালিহাতী থেকে নির্বাচিত এমএনএ হাতেম আলী তালুকদার উপস্থিত ছিলেন।

ডাকবাংলোর পাশেই শ্বেতপাথরে খোদাই করা শিলালিপিতেও একাত্তর সালের ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর এ বাংলোতে অবস্থানের কথা উল্লেখ রয়েছে।

মোশারফ হোসেন আরো জানান, বঙ্গবন্ধু এখানে অবস্থানকালে সকালে রুটি-ডিম, দুপুরে মোরগপোলাও এবং রাতে মাছভাত খেয়েছেন।

মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জেলা পরিষদের সদস্য খন্দকার সফিউদ্দীন মনি বঙ্গবন্ধুর আগমনের সত্যতা স্বীকার করে জানান, দেশের সেই উত্তাল সময়ে বঙ্গবন্ধু প্রিয় সহচর নিয়ে গোপন শলাপরামর্শের জন্য এখানে এসেছিলেন।

মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সম্পাদক আব্দুর রহমান বিএসসিকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্থানীয় জাতের কলা উপহার দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

আচিকমিচিক সোসাইটির পরিচালক গারো নেত্রী সুলেখা ম্রং জানান, বঙ্গবন্ধু গারো গ্রাম চুনিয়া ঘুরে দেখেন। বঙ্গবন্ধুকে গারোরা ভুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সংবর্ধনা দেয়।

সুলেখা আরও জানান, তিনি তখন এ স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। সংবর্ধনায় সভাপতিত্ব করেন প্রয়াত গারো নেতা পরেশ মৃ। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর বঙ্গবন্ধু সুলেখাকে মাথায় হাত দিয়ে আদর করেন। তাকে ৫০০ টাকা বকশিশ দেন। সেই বকশিশের টাকা খরচ না করে মধুপুর সোনালী ব্যাংকে ডিপোজিট রাখেন। পরে সুদের টাকায় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ফরমফিলাপ করেন।

দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, বঙ্গবন্ধু এখানে অবস্থানকালে বাংলো চত্বরে একটি রক্তচন্দন ও আমগাছ রোপণ করেন। কালের করালগ্রাস পেরিয়ে এখনো তা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু যে চেয়ার ও টেবিল ব্যবহার করেছিলেন বন বিভাগ এখনো তা আগলে রেখেছে।

তবে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকার-আলবদররা দুই মাসের জন্য বাংলোতে আস্তানা গেড়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত খাটপালঙ্ক ও আসবাবপত্র ধ্বংস করে।

মধুপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফা জহুরা জানান, জাতির পিতা ও বঙ্গমাতার স্মৃতিধন্য এ ডাকবাংলোটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং এর পাশে আরেকটি পৃথক বাংলো করার কথা রয়েছে।

(জয়নাল আবেদিন, সভাপতি, গোপালপুর প্রেস ক্লাব/ ঘাটাইল ডট কম)/-