ফেসবুক কি ভারতের নির্বাচন প্রভাবিত করেছিল?

ভারত-সহ বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ফেসবুক যে অতীতে ব্যর্থ হয়েছে, ওই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে তা কার্যত স্বীকারই করে নিয়েছেন। তবে তিনি সেই সঙ্গেই কথা দিয়েছেন, আগামীতে সব ভুল শুধরে ফেসবুক সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যই কাজ করবে। বিবিসির প্রতিবেদন

নির্বাচনে ফেসবুকের ডেটা ব্যবহার নিয়ে ভারতের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল বিজেপি ও কংগ্রেস এর আগেই বিতর্কে জড়িয়েছিল।

জাকারবার্গের এই স্বীকারোক্তির পর স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে ফেসবুক ভারতের ভোটকে কীভাবে ও কতটা প্রভাবিত করতে পেরেছে? ভারতে বিশেষজ্ঞরাই বা এ ব্যাপারে কী বলছেন?

কোটি কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ডেটা যে তারা ঠিকমতো সামলাতে পারেননি এবং তার মাধ্যমে নানা দেশের নির্বাচনকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে, মার্কিন কংগ্রেসে পাঁচ ঘন্টার দীর্ঘ শুনানিতে মার্ক জাকারবার্গ সেটা অবশেষে মেনেই নিয়েছেন। তবে সেই সঙ্গেই তিনি একরকম মুচলেকা দিয়েছেন, এই ভুল আর হবে না।

তিনি বলেছেন, “আগামী এক বছরে ভারত-ব্রাজিল-মেক্সিকো ইত্যাদি নানা দেশের নির্বাচনে সততা বজায় রাখার জন্য যা করতে হয় ফেসবুক তা করবে।”

আগে যে সেটা হয়নি, মেনে নিয়েছেন তাও। কীসের ভিত্তিতে তিনি আগেকার ভুল শুধরে নেওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, সে প্রশ্নের জবাবে বলেছেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগানোর কথা।

যে সব ভুয়ো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা কিংবা ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে, সেগুলোও এই পদ্ধতিতে চিহ্নিত করে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

কিন্তু ভারতের মতো দেশের ভোটে ফেসবুক ডেটা কাজে লাগানো হয়েছে বলে যে সন্দেহটা এখন দানা বাঁধছে, সেটা সত্যি হলে করা হয়েছে কীভাবে?

ভারতের দ্য সেন্টার ফর ইন্টারনেট অ্যান্ড সোসাইটির গবেষণা-প্রধান সুমন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলছিলেন, “আমাদের ফোনে ফেসবুক, কম্পিউটারে ফেসবুকে। ফোনে হয়তো আপনি হোয়াটসঅ্যাপ বা ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করেন, সেগুলোও ফেসবুক। ফেসবুকের এই সুবিস্তৃত ইকোসিস্টেমের বাইরেও হয়তো আপনি নানারকম ওয়েবসাইট দেখেন, সেখানেও লগইন করেন ফেসবুক আইডি ব্যবহার করেই। ফলে আপনার দৈনন্দিন জীবনে আপনি কোন সাইটে কত সময় কাটাচ্ছেন, এরকম ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রায় সব তথ্যই পৌঁছে যায় ফেসবুকের হাতে।”

“ফেসবুক একটা ব্যক্তি মানুষের সম্পর্কে এভাবে যা যা জানতে পারে, সেই ডেটা আর কার কার কাছে যায় সেটা একটা প্রশ্ন। দ্বিতীয় প্রশ্নটা হল ফেসবুক থেকে একটা মানুষ সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করে সেই মানুষটাকে কীভাবে প্রভাবিত করা যায় বা তার ভাবনাচিন্তাকে কীভাবে দিশা দেওয়া যায় … কেম্ব্রিজ অ্যানালিটিকার মতো সংস্থা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিলে ঠিক সেই কাজটাই করার চেষ্টা করেছে”, বলছিলেন মি চট্টোপাধ্যায়।

“সাফল্যের অনেক দাবিদার থাকে”, এই যুক্তি দিয়ে বিজেপি নেতা সম্বিত পাত্র আগেই অবশ্য কেম্ব্রিজ অ্যানালিটিকার মতো সংস্থা – যাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকের ডেটা রাজনৈতিক কারণে অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে – তাদের সঙ্গে দলের সব সংস্রবের কথা অস্বীকার করেছিলেন।

ঠিক একই ধরনের কথা বলেছেন কংগ্রেসের আই টি সেলের প্রধান দিব্যা স্পন্দনাও, তিনি জানিয়েছেন কেম্ব্রিজ অ্যানালিটিকা নির্বাচন নিয়ে দলের কোনও কোনও নেতার সঙ্গে হয়তো কথা বলেছে – কিন্তু কংগ্রেস তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।

তবে ঘটনা হল, কেম্ব্রিজ অ্যানালিটিকার সাইটে মক্কেল হিসেবে বিজেপি ও কংগ্রেস – এই দুই দলেরই নাম ছিল মাত্র কিছুদিন আগেও।

সুমন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও বলছিলেন, ফেক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কিংবা ইনফর্মেশন ওভারলোড বা তথ্য-ঝড়ে বেসামাল করে আম ভারতীয় ভোটারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে অনেকদিন ধরেই।

“ফেক আ্যাকাউন্টের একটা উদ্দেশ্য হল ট্রোলিং। ধরুন আপনি এমন কিছু পোস্ট করলেন, যা কোনও রাজনৈতিক দলের মতের বিরুদ্ধে যায়। তখন আগে থেকেই অটোমেট করা বট-রা বা ট্রোলরা আপনার অ্যাকাউন্টে গিয়ে নানারকম উল্টোপাল্টা কমেন্ট করতে শুরু করবে। আপনি হয়তো ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবেন।”

“আবার ধরুন ভারতের মতো দেশে মফঃস্বল শহরের সাধারণ একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী – তার কাছে এইটাই প্রশ্ন থেকে যায় সে তার পারিপার্শ্বিক থেকে যা শুনছে সেটাই তার মূল নির্বাচনী অবস্থান স্থির করে দিচ্ছে, না কি ফেসবুকের মাধ্যমে যে কথাবার্তা হচ্ছে কিংবা যে ধরনের কনটেন্ট অ্যাকসেস করার সম্ভাবনা হচ্ছে সেটা দিয়েই তার রাজনৈতিক মতামত তৈরি হচ্ছে?”, বলছিলেন সুমন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

এই ধরনের চেষ্টার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কাজটা পুরোপুরি বেআইনি কি না, তা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ।

তা ছাড়া ফেসবুক ডেটা কাজে লাগিয়ে ভারতে কোন দল আদৌ কতটা রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিল করতে পেরেছে, সেটাও খুব স্পষ্ট নয়।

কিন্তু নির্বাচনে ফেসবুকের ভূমিকা যে সন্দেহের ঊর্ধ্বে ছিল না, সেটা কিন্তু এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।

(বিবিসি, ঘাটাইল.কম)/-