ফিরোজা মুখার্জি; জানা অজানা মওলানা ভাসানী

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিন ও স্টকহোম শান্তি সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে মওলানা ভাসানী তখন লন্ডনে। লন্ডনের তসদ্দক আহমেদ আর ‘লন্ডন মজলিশ’ সারাক্ষণ তাঁর তদারকিতে। তসদ্দক আহমেদই একদিন ফিরোজা মুখার্জি আর নিশীথ মুখার্জিকে নিয়ে গেলন ভাসানীর কাছে। প্রথম দর্শনেই ভাসানীতে মুগ্ধ দু’জন ধীরে ধীরে তাঁর লন্ডন জীবনে ওতপ্রতভাবে জড়িয়ে গেলেন। ফিরোজা মুখার্জি হয়ে উঠলেন মওলানার ব্যক্তিগত সচিব। তারপর ছায়ার মতো তাঁর কর্মসূচী ঠিক করা, বিবৃতির ডিকটেশন দেয়া, বই-পত্রিকা পড়ে শোনানো থেকে দেখাশোনার সমস্ত ভার ফিরুজা মুখার্জির।

ফিরোজা মুখার্জির বংশগত উপাধি ‘সারশার’। উর্দু সাহিত্য এবং তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের ওপর পি.এইচ.ডি. করা ফিরোজা সারশারের জন্ম ব্রিটিশ ভারতের লক্ষ্ণৌতে। ১৯৪৭-এ এম.এ. করেছেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারপর ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পরও চলতে থাকা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার মুখে তাঁর পরিবার পাকিস্তানের করাচী চলে যান। তখনকার ফিরোজা সারশার তাঁর পেশাজীবন শুরু করেন ডন-এ সাংবাদিকতা দিয়ে। সাংবাদিকতার জন্যই ৫২ তে পাড়ি জমান লন্ডনে। গ্রহন করেন ব্রিটিশ নাগরিকত্ব। ধর্ম অন্তপ্রাণ পরিবারের মেয়ে সারশার লন্ডনে এসে জড়িয়ে পরেন বাম রাজনীতির সাথে। লন্ডন মজলিসের ছাত্র সংগঠন ‘ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস’ এর জার্নাল সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময়ই কলকাতা থেকে ব্যারিস্টারি পড়তে আসা নিশীথ মুখার্জির সাথে পরিচয় হয় তাঁর। পরিচয় থেকে পরিণয়। তারপর ফিরোজা সারশার থেকে ফিরোজা মুখার্জি।

তখনকার সময় (বিশেষ করে যুক্তফ্রন্ট গঠনের পর) সসস্ত ইউরোপ জুড়েই মওলানা ভাসানী এক মহাবিস্ময়ের নাম। শেরে বাংলা ফজলুল হক কিংবা শহীদ সোহরাওয়ার্দী নন, লন্ডনে তখন সবার মুখে মুখে মওলানা ভাসানীর নাম। তাঁকে কাছে পেয়ে লন্ডনের বাম কর্মীরা তাই আপ্লুত। আর ফিরোজা মুখার্জী ততদিনে তাঁর আত্মজ।

মওলানা ভাসানী তাঁকে ফিরুজা মা বলে ডাকতেন, তখন তিনি বুঝে নিতেন তাকে নোট নিতে হবে নয়তো ড্রাফট করতে হবে নতুবা তাঁকে বই পড়ে শোনাতে হবে। আর যখন মা ফিরুজা বলে ডাকতেন তখন তিনি বুঝে নিতেন গল্প গুজব অথবা তাঁর শুকনো স্বাস্থ্যের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাঁর সাথে কিছু খেতে বলবেন তিনি।

পাশাপাশি লন্ডন মজলিশের গোপন এজেন্ডা নিয়ে ভাসানীকে মার্কসিষ্টে জড়ানোর ভারও তখন ফিরোজার কাঁধে। তিনি তাঁকে দ্বান্দিক বস্তুবাদ, কান্ট, হেগেল, মার্কস, এঙ্গেলস থেকে বিশ্ব ইতিহাস পড়ে শোনাতেন। মওলানাও তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। গভীরভাবে বোঝারও চেষ্টা করতেন।

তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো বলতে বলতে ফিরোজা মুখার্জি যখন খেই হারিয়ে ফেলতেন ভাসানী তখন তাঁকে খেই ধরিয়ে দিতেন। ভুল ব্যাখ্যা করলে নির্ভুল পথ বাতলে দিতেন। ভেতরে ভেতরে মুখার্জি তখন অবাক হয়ে যেতেন।

তাঁর ভাষায়, “তিনি মার্কসবাদ বুঝেছিলেন কিনা আমি জানি না। কিন্তু মার্কসবাদের মধ্যে নিজের সিমিলারিটি দেখতে পেয়েছিলেন। ইসলামের একটা ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। মওলানা ছিলেন প্রখর ধর্মবোধ ও ধর্মজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ। ফলে ইসলামের সাথে মার্কসবাদের যে পার্থক্য ও ফাঁকগুলো তাঁর চোখে পড়েছিল, ইসলামের আওতার মধ্যে তিনি চাইছিলেন তার সমাধান।

তিনি চাইছিলেন ইসলামের ভিতর দিয়ে মার্কসবাদের বাস্তবায়ন। একটা সমন্বয়ের পথ বের করার চেষ্টায় তাঁর ভাবনা আবর্তিত হয়েছে বছরের পর বছর। তসদ্দক ও আমার সাথে এই নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন কথা বলেছেন মওলানা।

পাকিস্তান ও ভারতের তাবড় তাবড় বামপন্থীরা এ নিয়ে বৈঠকের পর বৈঠক করেছেন লন্ডনে। রুদ্ধদ্বার কক্ষে শাসরুদ্ধ বিতর্ক হয়েছে অনেকদিন। আমি নিজেও অনেক সময় অংশ নিয়েছি তাতে। আমরা প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে করতে উত্তেজিত হয়ে পড়তাম মাঝে মাঝে। কেবল তিনি শান্ত-সহাস্য।

মওলানার কথা ঐ একটাই- ‘মানবাধিকার বাস্তবায়নের জন্য, বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, একটা শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন তো দেখি না। ইসলাম বর্ণ, গোত্র, ধনী, নির্ধন, জাত-পাতের ভেদরেখা চিরকালের জন্য ঘুচিয়ে দিয়েছে। ইসলাম মানেই তো শান্তি। ইসলামের সৌজন্য প্রকাশের মধ্যেও রয়েছে শান্তি। আর শোষণমুক্তির বার্তা নিয়েই তো আমার নবীর পৃথিবীতে আবির্ভাব।’

সূত্রঃ জানা অজানা মওলানা ভাসানী।

[উল্লেখ্য, কৌশলগত কারণেই খোন্দকার মোঃ ইলিয়াস তাঁর ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ গ্রন্থে ফিরোজা মুখার্জিসহ আরও অনেকের নাম বাদ দিয়েছিলেন। আর ১৯৯৫ খ্রিঃ আমাদের হাই ভাই (আব্দুল হাই শিকদার) তাকে খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর ‘জানা অজানা মওলানা ভাসানী’ গ্রন্থে। দু’জনের প্রতিই কৃতজ্ঞতা।]