প্রান্তিক গ্রাহকের জন্য স্মার্ট প্রিপেইড মিটার প্রহসনের শামিল

দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের গ্রাহক তিন কোটি ৬০ লাখ। এরমধ্যে দেড় কোটি গ্রাহকই প্রান্তিক (লাইফ লাইন)। এসব গ্রাহক মাসে ৫০ ইউনিটের মতো বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। এজন্য তারা সর্বোচ্চ বিল দেন ১৬৮ টাকার মতো। তাদের স্মার্ট প্রিপেইড মিটার দিলে প্রতিমাসে আরও ৪০ টাকা করে বেশি ভাড়া দিতে হবে। আর নিজেরা মিটার লাগালে প্রায় ছয় হাজার টাকা বাড়তি খরচ হবে। বিশেষজ্ঞরা প্রান্তিক গ্রাহকদের স্মার্ট প্রিপেইড মিটার দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা এ পদক্ষেপকে প্রহসনের শামিল বলছেন।

গ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে সরকার। এছাড়া চলতি বছরের মধ্যে সরকার সবার ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করছে। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়ের এই বোঝা সাধারণ গ্রাহকের কাঁধে চাপানো উচিত কিনা তা বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘লাইফ লাইনের গ্রাহকদের স্মার্ট মিটার দেওয়া একটি প্রহসনের শামিল। তাদের বিলের চেয়ে বেশি পড়বে মিটারের ভাড়া। প্রান্তিক গ্রাহক পর্যায়ে কি আসলেই কোনও চুরি হয়? তারা তো খুবই কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।’

তিনি বলেন, ‘মোট গ্রাহকের মধ্যে একটি বড় অংশ লাইফ লাইন গ্রাহক। তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ খুবই কম। এ ধরনের গ্রাহককে সরকার যেখানে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকি দিচ্ছে, সেখানে এই মিটার দেওয়া প্রহসনমূলক।’

জানা গেছে, সাধারণ মানের প্রিপেইড মিটারের দাম ২৮ (২৩৭৬ টাকা) ডলার থেকে শুরু। আর স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের দাম ৫৬ (৪৭৫২ টাকা) ডলার থেকে ‍শুরু। সাধারণ প্রিপেইড মিটারের তুলনায় দ্বিগুণ ব্যয় করতে হয় স্মার্ট প্রিপেইড মিটারে। এখন প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিলের আরও এক চতুর্থাংশ তাকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে তার স্মার্টনেস। যে গ্রাহক মাত্র ১৬৮ টাকা বা তার চেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তার জন্য স্মার্ট মিটারের প্রয়োজন কেন। এসব করে একটি পক্ষকে অর্থ আয়ের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘এমনিতেই গ্রাহকরা এখন মিটার ভাড়া দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরেই মিটার ভাড়ায় তো মিটারের দাম উঠে আসার কথা। আবার নতুন মিটার দিয়ে পুনরায়  মিটার ভাড়া নেবে। গ্রাহকের এখানে দোষ কী? তারা কেন এই দায় নেবেন?’

তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক গ্রাহকদের জন্য এই মিটার অনেক বড় বোঝার মতো। এটি অনৈতিক।’

প্রসঙ্গত, এখন এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কোনও রকম নির্দেশনা না নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে প্রিপেইড মিটারের ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে গ্রাহকের ৪০ টাকা করে প্রতিমাসে ভাড়া দিতে হয়। আগে ১০ টাকা করে মিটার ভাড়া নিতো বিতরণ কোম্পানি। অন্যদিকে খোলা বাজার থেকে মিটার কিনে সংযোজনের নীতিমালা থাকলেও বাজারে কোনও প্রিপেইড মিটার পাওয়া যায় না। ফলে বিতরণ কোম্পানির হাতেই মিটার বাণিজ্যটি থেকে যাচ্ছে।

বিইআরসি’র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা বিতরণ কোম্পানিকে বলেছি, ছোট গ্রাহকের অতিরিক্ত ব্যয় করে নিয়ন্ত্রণের কোনও অর্থ নেই। কারণ এই শ্রেণির গ্রাহক কোনও সময়ই বিদ্যুৎ চুরি করে না। এতো কম বিলের মধ্যে চুরি করা সম্ভবও না। ফলে কোথায় কোথায় স্মার্ট প্রিপেইড মিটার দিতে হবে, তা আগে চিন্তা করতে হবে। অতিরিক্ত ব্যয় করে এসব বসানোর কোনও মানে হয় না।’

কমিশন কেন এ বিষয়ে কিছু করছে না জানতে চাইলে হতাশার সুরে তিনি বলেন, ‘চাইলেই তো আর সবকিছু করা সম্ভব নয়। কোথাও সরকারের চিন্তার সঙ্গে কনফ্লিক্ট করছে কিনা, তাও আমাদের দেখতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘সরকার চাইছে প্রিপেইড মিটারে বিদ্যুৎ বিতরণ করতে। এখানে কমিশনের বিরোধিতা করা ঠিক নয়। তবে এই ব্যয় যৌক্তিক কিনা, তা বিবেচনা করতে হবে। যা সরকারের ওপর পর্যায় থেকে হওয়া উচিত।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, যারা প্রান্তিক গ্রাহক তাদের ক্ষেত্রে এই দামের স্মার্ট প্রিপেইড মিটার বসানোর কোনও যুক্তিই দেখছি না। সেখানে এখন যে মিটার আছে, তাই রাখা উচিত। বিদ্যুতের হিসাব রাখার জন্য একটা মিটার তো দিতেই হবে। তাদের জন্য একটি সাধারণ মিটারই যথেষ্ট। তাদের মিটারের ভাড়ার চেয়ে দেখা যাবে বিদ্যুতের বিল কম আসবে। যার বিদ্যুতের বিল ২০০ টাকার নিচে, তার জন্য মিটার ভাড়া বাবদ প্রতিমাসে ৪০ টাকা অনেকটা বোঝার মতো এবং যুক্তিহীন বিষয়। এক্ষেত্রে গ্রাহকভেদে যাচাই করে স্মার্ট মিটার দেওয়া উচিত। যাদের বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি তারা স্মার্ট মিটার ব্যবহার করবে, এটাই স্বাভাবিক।

(বাংলাট্রিবিউন, ঘাটাইলডটকম)/-