প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : কী পেল বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বহুল প্রত্যাশিত চীন সফর শেষ করেছেন। এই চীন সফরের ব্যাপারে প্রত্যাশা ছিল অনেক। বলা হচ্ছিল, চীন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে একটা মধ্যস্থতা করতে পারে! বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এটা স্পষ্ট করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুটি প্রাধান্য পাবে বেশি। আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে চীনা সাহায্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন। চীন বাংলাদেশে তার ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করবে, এ প্রত্যাশা আমাদের ছিল। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে?

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ৯টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একটি চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের জন্য চীন ২ হাজার ৫০০ টন চাল সরবরাহ করবে। অন্য চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পর্যটন কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা স্মারক, ইয়ালু জাংবো ও ব্রহ্মপুত্র নদীর তথ্যবিনিময়-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক এবং তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা, ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ নিয়ে ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট, অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি ইত্যাদি।

শেখ হাসিনা-লি খ্যাছিয়াং আলোচনায় বিসিআইএম (ইঈওগ) অর্থনৈতিক করিডরকে শক্তিশালী করতে এই রুটের মধ্যকার অবকাঠামো খাত উন্নয়নের আহ্বান জানানো হয় (সিজিটিএন, ৫ জুলাই)।

বলা ভালো, চীন ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’র (বিআরআই) যে বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে, তাতে যে মোট ছয়টি অর্থনৈতিক করিডর রয়েছে, বিসিআইএম করিডর তার একটি।

বাংলাদেশ-চীন (ইউনান প্রদেশ)-ভারত (উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্য) ও মিয়ানমারকে নিয়ে প্রস্তাবিত এই অর্থনৈতিক করিডরটি গড়ে উঠছে। এর ফলে সড়কপথে ইউনান প্রদেশের সঙ্গে বাংলাদেশ সংযুক্ত হবে। ইউনান প্রদেশের কুনমিং থেকে সদর কক্সবাজার পর্যন্ত সড়কপথ তৈরি হবে। অদূর ভবিষ্যতে এ পথে রেললাইনও চালু হবে। তবে বিসিআইএম নিয়ে প্রশ্ন আছে। ভারত শেষ পর্যন্ত এই করিডরের ব্যাপারে তার সম্মতি জানালেও ভারত বিআরআইতে যোগ দেয়নি। অথচ বাংলাদেশ দিয়েছে।

বিআরআই পরিকল্পনার আওতায় কক্সবাজারের সন্নিকটে সোনাদিয়ায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হওয়ার কথা ছিল। এ ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষরের কথা থাকলেও তা আর স্বাক্ষরিত হয়নি ভারতের আপত্তির কারণে। ফলে শেখ হাসিনা-লি খ্যাছিয়াং দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিসিআইএমের অবকাঠামো খাত নির্মাণের আহ্বান জানালেও, ভারতের পূর্ণ সমর্থন পাওয়া না গেলে এই অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।

চীনা সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া বার্তা সংস্থার এক প্রতিবেদনে (৫ জুলাই) চীন-বাংলাদেশ বিআরআই (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ)-এর ব্যাপারে সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন বাংলাদেশকে কী আশ্বাস দিয়েছে, সে সম্পর্কে কোনো সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। তবে সাউথ এশিয়ান মনিটরের খবরে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে চীন।’

চীনা প্রধানমন্ত্রী এমন আশ্বাসও দিয়েছেন যে, ‘রোহিঙ্গা সমস্যার একটি সমাধানে পৌঁছাতে দরকার হলে চীন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আবারও মিয়ানমারে পাঠাবে।

দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠকের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, চীন চেষ্টা করবে যাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার আলোচনার মধ্যেই একটি সমাধান খুঁজে পায়। চীন মিয়ানমারকে এ ব্যাপারে বোঝাবে বলছে এবং বলবে।’ (সাউথ এশিয়ান মনিটর, ৫ জুলাই)। এটা এক ধরনের আশ্বাস। কোনো কমিটমেন্ট নয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, চীনের এই আশ্বাস রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আদৌ কোনো ভূমিকা পালন করবে কি না। কিংবা আমরা কি চীনের এই আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে বসে থাকব? যদিও চীনের প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, চীন আবার তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে মিয়ানমারে পাঠাবে। এ ধরনের ‘আশ্বাস’ কিংবা চীনা মন্ত্রীর আবার মিয়ানমার সফর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে জট খুলবে বলে মনে হয় না! মিয়ানমার অত্যন্ত কৌশলে সময়ক্ষেপণ করছে। রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে বলে আশ্বাসও দিচ্ছে!

মিয়ানমারের মন্ত্রী বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোও ঘুরে গেছেন। প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে একটি চুক্তিও হয়েছে। কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। চীনও মিয়ানমারকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সংকটের গভীরতা বেড়েছে বৈ কমেনি।

চীনের বড় স্বার্থ রয়েছে মিয়ানমারে। ফলে চীন যে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য করাতে পারবে, এটি আমার মনে হয় না।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে চীন মিয়ানমারের পাশেই ছিল এবং মিয়ানমারের বক্তব্য সমর্থন করে আসছিল। সাম্প্রতিককালে রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীনের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ২৫ জুন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং জুয়ো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ঢাকায় সাক্ষাৎ করেন। এ সময় রাষ্ট্রদূত বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে তার দেশ গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী চীনা রাষ্ট্রদূতকে বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের অবশ্যই বাংলাদেশ থেকে তাদের নিজ মাতৃভূমিতে ফেরত যেতে হবে এবং এ বিষয়ে মিয়ানমারকে বোঝানোর জন্য তিনি চীনের প্রতি আহ্বান জানান। (সাউথ এশিয়ান মনিটর ২৫ জুন, ২০১৯)।

এটাই বাংলাদেশের অবস্থান, রোহিঙ্গা নাগরিকদের তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত যেতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে চীন একটা ভূমিকা পালন করতে পারে। অতি সম্প্রতি তালেবান প্রশ্নে চীনের একটি ভূমিকা অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে।

তালেবানদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সংলাপ’ যখন কোনো সমাধান বয়ে আনছিল না, ঠিক তখন চীন একটি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। চীনের এই ভূমিকা নতুন। অতীতে চীন কখনো অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীনের এ অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে। চীন এখন বিশ্বশক্তি। অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশ চীন। আর এ কারণেই ‘বিশ্বশক্তি’ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে, চীন এখন বিশ্বরাজনীতি তথা আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি ভূমিকা রাখতে চায়। এ কারণেই চীন আফগানিস্তানের ‘তালেবান’ সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসেছে। চীন এখন আফগান শান্তি চুক্তিতে গ্যারান্টার হিসেবে ভূমিকা রাখতে চায়। গত ২৬ জুন আফগান সরকারের এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়। জুন মাসে চীনের বিশেষ দূত দেং শিজুন কাবুল সফর করেছিলেন এবং সেখানে তিনি দেশটির নিরাপত্তা উপদেষ্টা হামদুল্লাহ মুজিবের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। চীন এরই মধ্যে কাতারে নিযুক্ত তালেবানদের রাষ্ট্রদূত আবদুল গণি বারাদারকে পেইচিংয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। (ডন, জুন ২০১৯)।

চীনের এই তৎপরতা প্রমাণ করে, চীন আফগানিস্তানের তালেবান সমস্যা সমাধানে একটি ‘ভূমিকা’ রাখতে চায়। চীন আফগান সরকার ও তালেবানদের মধ্যকার আলোচনাকে সমর্থন করছে। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীন একটি মধ্যস্থতা করতে পারে, এমন একটি সম্ভাবনা তৈরি হলেও চীন-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে আমার কাছে এটা প্রতীয়মান হয়েছে, চীন দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যা সমাধানের ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি। বাংলাদেশের চেয়ে মিয়ানমারের গুরুত্ব চীনের কাছে অনেক বেশি।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চীনের কাছে যে প্রত্যাশা করেছিল, তা পূরণ হয়েছে বলে মনে হয় না।

রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীনের ‘সহযোগিতা’ কিংবা ‘আশ্বাস’ এক ধরনের ডিপ্লোম্যাটিক ভাষা। কূটনৈতিক ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে তো সমস্যার সমাধান হবে না। চীন হয়তো ভবিষ্যতে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে মিয়ানমারে পাঠাবে। চীনের ‘অনুরোধ’ কি আদৌ রাখবে মিয়ানমার? মিয়ানমার এ ধরনের কথা বারবার বলে আসছে। কিন্তু আদৌ তাতে কোনো ফল হয়নি।

চীনের আর্থিক সহযোগিতা মিয়ানমারের প্রয়োজন। চীন-মিয়ানমার সহযোগিতা ও সমর্থন আন্তর্জাতিক আসরে মিয়ানমারের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। মিয়ানমার তার ‘একাকিত্ব’ কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। চীনের সমর্থন বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারেনি। অর্থাৎ রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে যায়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের পর চীন রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে যাবে কিংবা এক ধরনের দূতিয়ালি করবে, এমন কোনো সম্ভাবনাও তৈরি হয়নি। ফলে সমস্যা যা ছিল, তাই রয়ে গেছে। এমনকি চীনের মধ্যস্থতায় পেইচিংয়ে তিন দেশীয় একটি আলোচনা হতে পারত। কিন্তু তারও কোনো লক্ষণ আমরা দেখলাম না।

এমনকি চীনের আর্থিক সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রকল্প এখন বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে বা হবে। এ ক্ষেত্রে চীনা ঋণের শর্ত কী? সুদের হার কী, আমরা তা জানি না। সাম্প্রতিককালে ‘চীনা ঋণ’ নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ঋণগ্রহীতা দেশগুলো এক ধরনের ‘চীনা ঋণ ফাঁদ’-এ পড়েছে, এ ধরনের দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে (শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, মালদ্বীপ ও মালয়েশিয়া)।

তবে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি নিজে একজন অর্থনীতিবিদও বটে, তিনি আমাদের জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থরক্ষা করেই চীনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হবে। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, ‘আমরা যাতে চীনের ঋণের ফাঁদে না পড়ি, সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছি।’ (জাগো নিউজ, ২৮ জুন)। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ যে চীনা ঋণ পাচ্ছে (৩১ বিলিয়ন ডলার), তা পাকিস্তানের সিপিইসি’র (ঈচঊঈ) পর (৬০ বিলিয়ন ডলার) দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঋণ। (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ৫ জুলাই)। সুতরাং, চীনা ঋণ নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই।

(লেখক: তারেক শামসুর রেহমান, অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক/ দেশরুপান্তর/ ঘাটাইলডটকম)/-