প্যারী আদিত্যকে হানাদাররা ১৯৭১ সালের ৮ আগষ্ট ঘাটাইলস্থ সৎসঙ্গ আশ্রমে হত্যা করে

প্যারী মোহন আদিত্যের কথা তাঁর ভাই রাস বিহারী আদিত্যের কাছ থেকে শুনেছি: ”তিনি ছিলেন ছিপছিপেগড়নের অত্যন্ত সাদা মাটা মানুষ। সুন্দর অবয়ব, চোখে চশমা, কোন অহংকার নেই। তাঁর ছিল অনেক বন্ধু। উচ্চভিলাষ নেই। সরল সহজ ও পরিশ্রমী একজন অসাধারন মানুষ। অভাব ছিল কিন্তুু অভিযোগ ছিলনা, দুঃখ ছিল কিন্তুু হতাশা ছিল না। আবার তিনি দারিদ্রকে কখনোই গুরুত্ব দিতেন না। তিনি বলতেন,’দরিদ্র একটি মনের রোগ। এই রোগ মানুষকে অসুস্থ করে, কাজে অনিহা এনে দেয়। তখন সুকর্মের কথা মাথায় আসে না। আমি দারিদ্র বিষয়টি মাথায় আনতে চাই না, সৃষ্টির্কতা আমাদের সর্ব শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসাবে এই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, এটাই আমাদের বড় সম্পদ।”

প্যারী মোহন আদিত্য তিনি তাঁর বুকের তাজা রক্ত মাটির সাথে মিলিয়ে দিয়ে আরো উর্বর করে দিয়ে গেছেন মাতৃভুমির। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আশার বীজ বপন করে রেখে গেছেন। যাঁরা এ দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে গেলেন যদি তাদের স্মরণ করা না হয় তাহলে অনেক ইতিহাস হারিয়ে যাবে। নতুন প্রজন্মরা স্বাধীনতার ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হবে। যেমনটা হারিয়ে যাচ্ছে প্যারী মোহন আদিত্যের ইতিহাস।

১৯৫০ সালে শ্রীশ্রীঠাকুরের আর্শীর্বাদে পাকুটিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় সৎসঙ্গ আশ্রম। ১৯৫৮ সালে প্যারী মোহন আদিত্য ভারতের বিহারের ( বর্তমানে ঝাড়খন্ড) দেওঘর থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর ব্যবহৃত পাদুকা বহন করে এনেছিলেন বলেই আজ ’বাংলাদেশ সৎসঙ্গ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকুটিয়া মন্দিরে, আজও তা সংরক্ষিত আছে। শ্রীশ্রীঠাকুরের সেই পাদুকার জন্যই আশ্রমের নাম করণ করা হয় ’পূন্যপাদপীঠস্থান’।

১৯৫৮ সালেই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুলচন্দ্রের বানী ও আদর্শ প্রচার করার জন্য বড় ভাই রাস বিহারী আদিত্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সৎসঙ্গ সংবাদ নামে একটি ষাণ্মাসিক পত্রিকা। যার সহ সম্পাদক ছিলেন প্যারী মোহন আদিত্য। পরবর্তীতে এটি মাসিক পত্রিকায় রুপান্তরিত হয়। সমস্ত কাজেই তিনি বড় ভাইকে সামনে রেখে করেছেন। (তথ্য সূত্রঃ সৎসঙ্গ সংবাদ)

১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে প্যারী মোহন আদিত্য অগ্রনী ভূমিকা রেখেছেন। বাঙালীদের উপর পাকিস্তানীদের অমানুষিক অত্যাচারে মানুষের দু:খের সীমা ছিল না। দেশের কিছু মানুষ ভারতীয় ভূখন্ডে আশ্রয় নিয়েছিল। আর যারা এ দেশে থাকলেন, তাদের উপর দখলদার পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের দোসররা নির্বিচারে গণ হত্যা, সম্ভ্রমহনন, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, প্রভৃতির মত ধ্বংসলীলা শুরু করে। ৬৯,৭০ ও ৭১-এর উত্তাল মার্চে তাঁর ভূমিকা ক্ষুব্ধ করেছিল পাকিস্তানি হানাদার আর তাদের দোসরদের।

১৯৭১ এর ২১শে মে আনুমানিক ৯টায় পাক হানাদর বাহিনীর একটি দল টাঙ্গাইল থেকে মধুপুর যাওয়ার পথে পাকুটিয়ায় হঠাৎ করে সাঁড়াসি আক্রমন চালালে প্যারী মোহন আদিত্য পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পরেন। (তথ্য সূত্র: মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি/যুদ্ধক্ষেত্র চিহিৃতকবণ ও তথ্যাবলী, ঘাটাইল সেনানিবাস)

অত্যাচারী দল তাকে ঘাটাইলে পাকিস্তানী ক্যাম্পে নিয়ে নির্মমভাবে অত্যাচার করে। তিনি সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন এবং বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে থাকতেন। লোক চক্ষুর অন্তরালে সৎসঙ্গ আশ্রমে মাঝে মধ্যে তিনি থাকতেন।

১৯৭১ এর ৮ আগষ্ট টাঙ্গাইলের ঘাটাইলস্থ সৎসঙ্গ আশ্রমে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অর্তকিত আক্রমন চালায় প্যারী মোহন আদিত্য ও বামাচরন শর্মাকে হত্যা করে।(তথ্য সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক- ২১আগষ্ট ২০১৬, দৈনিক সমকাল- ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬, দৈনিক প্রথম আলো- ১০ ডিসেম্বর ২০০৫, সচিত্র বিচিত্র- অক্টোবর ২০১৮, স্মৃতি’৭১- ০৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭, ভারত থেকে প্রকাশিক মাসিক স্বস্তিসেক- চৈত্র ১৪২৪, টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত দৈনিক মফস্বল- ২৬ মার্চ ২০১৯)

প্যারী মোহন আদিত্য কখনোই কোন মানুষকে অকল্যাণকর কিছু বলেন নাই। যতরকম অসুবিধার মধ্যেই তিনি থাকুন না কেন,তাঁর কোন কথা বা আচরণ কাউকে কোন দুঃখ বা কষ্ট দেয় নাই। সবমিলিয়ে তিনি ছিলেন একজন ভাল মানুষ। তিনি সব সময় মানুষকে আলোকিত জীবনের পথে ডেকেছেন।

(লেখকঃ শব্দসৈনিক আশরাফুল আলম/ আবৃত্তিশিল্পী ও প্রশিক্ষক, স্বাধীন বাংলা বেতারের শব্দসৈনিক/ ঘাটাইলডটকম)/-