পোল্ট্রি মাংসের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে তবুও উপেক্ষিত!

ঢাকা সহ সারাদেশে লাল মাংসের (রেড মিট) চাহিদা কমছে আর বাড়ছে সাদা (পোল্ট্রি) মাংসের চাহিদা। সাধারণ মানুষ প্রোটিন তথা পুষ্টির চাহিদা মেটাতে সাদা মাংস বেশি খাচ্ছে। লাল মাংসের দাম বেশি এবং শরীরের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় খাদ্য হিসেবে গরু-ভেড়ার মাংসের চাহিদা কেবলই কমছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১২৫ থেকে ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

প্রতি ১০০ গ্রাম গরুর মাংসে ক্যালরির পরিমাণ ২৭৫ এবং ভেড়ার মাংসে ৩৯৮। এতে চর্বির পরিমাণ যথাক্রমে ২০ ও ৩০ গ্রাম। অন্যদিকে মুরগিতে ক্যালরির পরিমাণ গড়ে ১৪০ এবং চর্বির পরিমাণ ১২ গ্রাম। এ কারণে দিনদিন গরুর মাংসের চেয়ে সাদা মাংসের চাহিদা ক্রমশই বাড়ছে।

পুষ্টিবিদদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, দেশের মানুষের প্রয়োজনীয় প্রাণিজ আমিষের ৪০ শতাংশ আসে পশু-পাখি থেকে। বাকি ৬০ শতাংশ আসে মৎস্য সম্পদ থেকে। পশু-পাখি থেকে আসা মোট প্রাণিজ আমিষের এক তৃতীয়াংশ আসে পোল্ট্রি থেকে।

দেশে বর্তমানে পোল্ট্রির সংখ্যা প্রায় ৩১ কোটি। এর ৪০ শতাংশ গ্রামীণ চড়ে খাওয়া পাখি। বাকি ৬০ শতাংশই নিবিড় ও আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে প্রতিপালিত খামারের পাখি।

পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের মানুষের আমিষ তথা পুষ্টির চাহিদা পূরণে পোল্ট্রি শিল্প গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এ শিল্প এখনও অনেকটাই অবহেলিত। গত দুই যুগেরও বেশি সময়ে ঢাকা সহ সারাদেশে এ শিল্পের সঙ্গে ৪০ লাখ মানুষ সম্পৃক্ত হয়েছে।

তারা জানান, বর্তমানে ৪০ হাজার কোটি টাকার বাজার গড়ে উঠলেও শিল্পটি সামগ্রিকভাবে দেখভালের জন্য অদ্যাবধি পৃথক সংস্থা বা বোর্ড গড়ে ওঠেনি। পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থাকলেও প্রকৃতপক্ষে সমস্যা সমাধানের জন্য যেন কেউই নেই। ব্যবসায়ীরা যেকোনো সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো একজন কর্মকর্তার কাছে গেলে তিনি বিষয়টি তাদের এখতিয়ারভুক্ত নয় বলে দায় এড়িয়ে আরেক সংস্থার কাছে পাঠিয়ে দেন। ফলে ব্যবসায়ীদের নিত্য হয়রানির শিকার হতে হয়।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তঃসমন্বয়ের অভাবে সহজেই সমাধানযোগ্য সমস্যার সমাধান হতে বিলম্ব হয়। পোল্ট্রি শিল্পের জন্য পৃথক পোল্ট্রি বোর্ড গঠন এখন সময়ের দাবি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন মানুষের সুস্থ ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, সবল ও সুস্থ দেহে বেঁচে থাকার জন্য খাবারের তালিকায় মাংস, ডিম ও দুধ অপরিহার্য।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৮ এর পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৭ লাখ। এ জনসংখ্যার অনুপাতে বার্ষিক মাংসের চাহিদা ৭২ দশমিক ১৪ লাখ মেট্রিক টন, দুধ ১৫০ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টন ও ডিম ১ হাজার ৭১২ কোটি ৮৮ লাখ পিস। এ চাহিদা মোতাবেক একজন মানুষের প্রতিদিনের খাবার মেন্যুতে ১২০ গ্রাম মাংস, ২৫০ মিলিগ্রাম দুধ এবং বছরে ১৭৪টি ডিম থাকা অত্যাবশ্যক।

কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে মোট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাংস ৭২ দশমিক ৬০ লাখ মেট্রিক টন, দুধ ৯৪ দশমিক ৬ লাখ মেট্রিক টন এবং ডিম ১ হাজার ৫৫২ কোটি পিস। উৎপাদনের এ হিসাবে বর্তমানে একজন ব্যক্তির প্রতিদিনের খাবার মেন্যুতে মাংস ১২২ দশমিক ১০ গ্রাম, দুধ ১৫৮ দশমিক ১৯ এমএল এবং বছরে ৯৫ দশমিক ২৭টি ডিম পাচ্ছেন। মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই নয় বরং চাহিদার চাইতেও শূন্য দশমিক ৪৬ লাখ মেট্রিক টন বেশি উৎপাদন হচ্ছে। অপরদিকে ডিম ও দুধ উৎপাদনে যথাক্রমে ঘাটতি ৫৬ দশমিক ২৩ লাখ মেট্রিক টন ও ১৬০ কোটি ৮৮ লাখ ডিম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক যুগে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ, উচ্চ খাদ্যমূল্য ও ওষুধের মূল্য বৃদ্ধির অভিঘাতে বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে পোল্ট্রি খামারগুলো। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ছোট ও মাঝারি ধরনের অসংখ্য খামার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খামারের মালিকরা। কাজ হারিয়েছে অনেক শ্রমিক।

বাজারে দাম বেড়েছে মুরগির। দাম বেড়েছে বাচ্চারও। খামার পরিচালনার খরচ বেড়েছে। কমেছে মুনাফা। ইতোমধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটেছে বিদেশি পুঁজির। তাতে এক অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে দেশি পুঁজিতে গড়ে ওঠা সীমিত আয়ের খামারগুলো।

আগে বাংলাদেশে হাঁস-মুরগির খামারগুলো ছিল সনাতন। তা প্রতিপালন হতো পারিবারিক পর্যায়ে। ব্যবসায়িক ভিত্তিতে পোল্ট্রি খামারের উত্থান ঘটে আশির দশক থেকে। তাতে লাগে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ছোয়া। অনেক ব্যবসায়ী এতে বিনিয়োগ করেছে বিপুল অংকের টাকা। গড়ে উঠেছে বড় ধরনের খামার। অনেক বেকার যুবক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে গড়ে তুলেছেন ছোট ও মাঝারি গোছের পোল্ট্রি খামার। তাতে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছে পোল্ট্রি শিল্পের।

বিগত ৮০ ও ৯০ দশকে হাঁস-মুরগির সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক গড়ে ৪ শতাংশের ওপরে। বর্তমান শতাব্দির প্রথম দশকে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। এর কারণ দুটো। প্রথমত, দেশব্যাপী এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ। দ্বিতীয় কারণ, পোল্ট্রি খাদ্যের অন্যতম উপকরণ সয়াবিন ও ভুট্টার দাম বৃদ্ধি। দেশে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ শুরু হয় ২০০৭ সালে। ওই বছর সাভারের বিমান পোল্ট্রি কমপ্লেক্সে রোগটি প্রথম শনাক্ত হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। তারপর থেকে প্রতি বছরই রোগটির প্রকোপ কম-বেশি লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু যে হারে রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে সে তুলনায় সরকারি সহায়তা ছিল অপ্রতুল। রোগাক্রান্ত খামারে মুরগি ধ্বংসের পর সময় মতো ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়া যায়নি। তদুপরি ঋণ পাওয়ায় অনিশ্চয়তা ও ঋণের চড়া সুদ ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনর্বাসন ও নতুন খামার স্থাপনে অনীহা তৈরি করেছে।

এরই মধ্যে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সয়াবিন ও ভুট্টার উৎপাদন কমে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে এসব পণ্যের সরবরাহ। বেড়েছে দাম। এসব পণ্য পোল্ট্রি খাদ্যের অন্যতম উপকরণ এবং আমরা এগুলোর জন্য আমদানি নির্ভর হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারেও এগুলোর দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। তাতে বেড়েছে খামারের উৎপাদন খরচ। ফলে অনেক খামার আর উৎপাদনে ফিরে আসতে পারেনি। বিলুপ্ত হয়েছে অনেক ছোট ও মাঝারি খামার।

এ শতাব্দীর গোড়ার দিকে দেশে পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ ২০ হাজার। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৬০ হাজারে। এটা পেল্ট্রি শিল্পের এক বড় সংকটকাল। এ নিয়ে দেশের খামারিরা চিন্তিত, উদ্বিগ্ন।

পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপকালে ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, এক সময় পোল্ট্রি ‘কর অব্যাহতি’প্রাপ্ত খাত থাকলেও ২০১৫-২০১৬ অর্থবছর থেকে করের আওতায় আনা হয়। ফি বছর তা বাড়তে থাকে। চলতি বছরের বাজেটে নতুন করে আগাম কর যুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই সঙ্গে স্থানীয় কাঁচামাল (ভুট্টা ও রাইস ব্রানসহ বিভিন্ন উপকরণ) সংগ্রহের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৫ শতাংশ উৎস কর আরোপ করা হয়।

ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ফিআব) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদফতর ও অর্থ মন্ত্রণালয় বরাবর একটি আবেদনপত্র দেয়া হয়। গত ১৩ অক্টোবর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে (৩১৯-আইন/২০১৯/৮১ মুসক মূলে) একটি প্রজ্ঞাপন জারি হয়। যেখানে এসআরও নং ২৩৯/২০১৯/৭৫- মুসক সংশোধন করে ৩১৯নং এসআরও এর ‘গ’ অনুচ্ছেদটিতে বলা হয় ‘প্রাণিসম্পদ অধিদফতর কর্তৃক নিবন্ধিত পোল্ট্রি অথবা গবাদি পশু প্রতিষ্ঠান অথবা এনিমেল হেলথ কোম্পানি অথবা পোল্ট্রি লাইভস্টক ও ডেইরি ফিড প্রতিষ্ঠান অথবা মৎস্য অধিদফতরর কর্তৃক নিবন্ধিত ফিশারি ও মৎস্য ফিড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এইচএসকোড- ২৩০৯.৯০.৯০ এর আওতায় আমদানিকৃত পোল্ট্রি সেক্টরের পোল্ট্রি অথবা মৎস্য খাদ্য উপকরণ বা কাঁচামাল।

ফিআব সভাপতি এহতেশাম বি. শাহজাহান বলেন, প্রজ্ঞাপনের সংশোধনীতে ভুলক্রমে ২৩০৯.৯০.৯০ এইচএসকোড বসানো হয়েছে যা শুধুমাত্র ফিস মিল আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আমদানিকৃত পোল্ট্রি ও মৎস্য খাদ্য উপকরণ বা কাঁচামাল এ কোডের আওতায় পড়ে না। ফলে সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি হওয়া সত্ত্বেও প্রাণিসম্পদ খাতে জটিলতা বাড়ছে। ফিআব সভাপতি পোল্ট্রি খাত থেকে আগাম কর প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান।

(মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল, ঘাটাইলডটকম)/-