‘পৃথিবীর ১ নম্বর দূষিত শহরে উন্নয়নের ভাগাড়ে বসন্ত এসে গেছে’

পৃথিবীর ১ নম্বর দূষিত শহরে বসন্ত এসে গেছে। উন্নয়নের ভাগাড়ে বসন্ত এসে গেছে। সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনের সময় আমরা পোস্টারে প্ল্যাকার্ডে লিখতাম, ‘থাকতে জীবন হারব না, প্রাণ প্রকৃতি ছাড়ব না’। এখন হতাশায়-অবসাদে শুধুই মনে হয়, এই সব কথার আসলেই কোনো মানে নেই। প্রকৃতির চিন্তা আমরা ছেড়েছি বহু আগেই। মেনে নিয়েছি ভয়ংকর সব উন্নয়নের ফর্মুলা। পৃথিবীর ১৮০টি দেশের মধ্যে পরিবেশ সূচকে আমাদের অবস্থান ১৭৯! প্লাস্টিকদূষণে আমরা বিশ্বে দশম! গত ৮ বছরে পরিবেশ সুরক্ষায় আমরা পিছিয়েছি ৪০ ধাপ (ইপিআই ইনডেক্স)! ভাবা যায়?

একটি-দুটি করে ২৯টি কয়লা প্ল্যান্টের চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার। প্রতিবছর ১৬ হাজার কোটি টাকা গচ্চা দিয়ে অর্ধকোটি টন কয়লা ঢুকবে এই দেশে। বিদেশি গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে পৃথিবীর পরবর্তী ‘কার্বন বোমা’ (মার্কেট ফোর্সেস, ২০১৯)। এতগুলো কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে ১১৫ মিলিয়ন টন বাড়তি কার্বন ডাই-অক্সাইডের কবলে পড়বে এই ছোট্ট দেশ। কী করে বাঁচবে আমাদের নদী, মাটি, মৌমাছি, গাছপালা, আর শস্যের মাঠগুলো? আর আমাদের আগে থেকেই অর্ধেক ক্ষয়ে যাওয়া ফুসফুস?

গত চার দশকে হারিয়ে গেছে বাংলাদেশের ৬০০ নদী। উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত কেবল ধু ধু বালুচর। ধলেশ্বরী নাব্যতা হারিয়ে এখন মরা খাল। উজানের বাঁধে তিস্তা, ধরলা, পুনর্ভবা, টাঙ্গন পানিশূন্য। রূপসা থেকে পাথুরিয়া খাঁ খাঁ করে। এককালের খরস্রোতা আত্রাই এখন হেঁটে পার হওয়া যায়। উত্তরবঙ্গের শ খানেক বিলে এখন ধান চাষ হয়। কর্ণফুলীর তলদেশে জমা হয়েছে দোতলা বাড়ির সমান পুরু পলিথিনের স্তর।

হারিয়ে গেছে ভাওয়ালের বন, চিংড়ি চাষে বিলীন হয়ে গেছে চকরিয়ার ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। ২৫ বছরে বিলীন হয়েছে ৬৫ হাজার হেক্টর বনভূমি। লবণাক্ততা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের লাগামছাড়া ব্যবহারে বিলুপ্তির পথে দক্ষিণের আড়াই শ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ। হারিয়ে যাচ্ছে মলা, ঢেলা, বালিয়া, মালান্দা, পোয়া, টাকি, খলিসা, ফলি আর শাল চোপরা। আর বেঁচে থাকা মাছগুলোর মাংসে পাওয়া যাচ্ছে লেড, জিঙ্ক, ক্যাডমিয়াম আর পলিথিন।

প্রথম আলোতেই পড়েছিলাম, বুড়িগঙ্গার জেলে মন্টু রাজবংশী আর গোপীনাথ বর্মণ কয়েক দশক ধরে বুড়িগঙ্গায় মাছ ধরেছেন। কিন্তু এখন বুড়িগঙ্গার পানি বিষ হয়ে গেছে। নয় মাস পচা পানিতে মাছ পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে নদী ছেড়ে কালীগঞ্জের ফ্যাক্টরিতে কাজ নিয়েছেন জেলেপট্টির বাসিন্দারা।

এই শহরে কাক নেই, ব্যাঙ নেই, কেঁচো নেই, শিয়াল নেই, ফড়িং নেই। ময়না, টিয়া, কাঠঠোকরা নেই, বাবুই পাখির বাসা নেই। বিলীন হয়ে যাচ্ছে ফুল-ফসলের পরম বন্ধু মৌমাছি।

আগে বাড়ির কার্নিশে, গ্রামের গাছে গাছে মৌচাকের দেখা মিলত। মধু সংগ্রহই ছিল একশ্রেণির গ্রামীণ মানুষের জীবিকা। এখন মৌচাকের অভাবে মধু সংগ্রহের সেই পুরোনো জীবিকাই বিলীন হয়ে গেছে। বাণিজ্যিক কৃষির কবলে পড়ে তিল, শর্ষে আর তিসির মতো
মধুযুক্ত ফুলের চাষ কমেছে। রাসায়নিক সার, কীটনাশক, আর বায়ুদূষণে মৌমাছি মরে সাফ হয়েছে। কমিশন-বাণিজ্যের নেশায় উন্মত্ত রাষ্ট্র কেমন করে বুঝবে মৌমাছির সঙ্গে ফুল ও ফসলের মেলবন্ধন? ডিজিটাল বাংলাদেশে এমন প্রযুক্তি আছে কি, পরাগায়ন ছাড়াই বাঁচিয়ে দেবে কৃষকের টমেটো, ফুলকপি, গাজর, আর পেঁয়াজের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ?

কাক, শকুন, আর ব্যাঙ ছিল শহুরে মানুষের পরম মিত্র। কাকের খাদ্য রান্নাঘরের বর্জ্য, শকুন খায় মরা পশুপাখি আর ব্যাঙ খায় মশার লার্ভা। গেল বছর ডেঙ্গু মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ল আর টুপটাপ মরে গেল হাজারখানেক মানুষ। আমাদের ছোট্টবেলার ব্যাঙগুলো হাজারে হাজারে বেঁচে থাকলে মশার এমন লাখে লাখে বিস্তার ঘটত কি?

সুন্দরবন আন্দোলনের সময় একবার এক সরকারপন্থী সাংবাদিক লিখেছিলেন, হিংস্র বাঘ আর হিংস্র কুমির বাঁচাতে আন্দোলন করছেন এই পরিবেশকর্মীরা। আহারে সাংবাদিক!

কে বোঝাবে তাঁকে ‘হিংস্র’ বাঘ আর ‘হিংস্র’ কুমিরের সঙ্গে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের নাড়ি-নক্ষত্রের ইকোলজি। হিংস্র কুমির মাটিতে গর্ত খোঁড়ে। সেখানে পানি জমলে ডিম পাড়ে মাছ, কচ্ছপ আর পোকা। কুমিরগুলো হারিয়ে গেলে মাছের ডিমগুলোও যে খরস্রোতা নদীর উথালপাতালে হারিয়ে যাবে। আর সুন্দরবনের বাঘগুলো সব মরে গেলে সুন্দরবনের খুব লাভ হবে? বাঘ বিলুপ্ত হলে হরিণের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। পঙ্গপালের মতো হরিণ বেড়ে গেলে কেওড়া, গরান, বাইন ও গেওয়াগাছের ছোট ছোট চারাগাছগুলো উজাড় হয়। বনভূমির কচিপাতা, ঘাস, গুল্ম, গাছের ছালবাকল দ্রুত কমতে শুরু করে। আবার হঠাৎ বাঘের সংখ্যা বেড়ে গেলে হরিণের সংখ্যা কমতে থাকে, হরিণের অভাবে অতিরিক্ত ঘাস, গুল্ম, চারাগাছ বেড়ে বেড়ে শেষ পর্যন্ত পচে ‘ডিকম্পোজড’ হয়ে জড়ো হয় নদীর তলদেশে। শুষে নেয় মাছের জন্য বরাদ্দ প্রয়োজনীয় অক্সিজেন। অক্সিজেনের অভাবে হাঁসফাঁস করে মাছ। মরে গেলে ভেসে ওঠে। সৃষ্টির কী অদ্ভুত ভারসাম্য!

আমেরিকার ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের একটা অসাধারণ গল্প আছে। পৃথিবীর ইকোলজিতে খাদ্য চক্রের সবচেয়ে ওপরে থাকা হিংস্র শ্বাপদ থেকে শুরু করে একদমই নিচে থাকা ছোট্ট শুঁয়াপোকা কিংবা শামুক, কিংবা সাইটোপ্ল্যাংটন কিংবা একটা লাল কেঁচোর অস্তিত্ব যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই গল্প। গত শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকান সরকারের ‘প্রেডেটের কন্ট্রোল প্রোগ্রামের’ আওতায় নেকড়ে মারা অভিযান শুরু হয়। তিরিশের দশকের মধ্যে ইয়েলোস্টোনের শেষ নেকড়েটিও মেরে ফেলা হয়। কিন্তু এরপর থেকেই হরিণের সংখ্যা বেড়ে গেল হু হু করে। অসংখ্য হরিণের খাদ্যের জোগান দিতে বনাঞ্চলে ছোট গাছ আর চারাগাছের আকাল তৈরি হলো। পরে বিজ্ঞানীদের বহু বছরের চেষ্টায় ’৯৫ সালে কিছু নেকড়ে ফিরিয়ে আনা হলো ইয়েলোস্টোনে। এরপর ঘটল অদ্ভুত সব ঘটনা। নেকড়ের ভয়ে হরিণের দল খোলা চারণভূমি ছেড়ে জঙ্গলের দিকে সরে গেল। হরিণের চলাফেরা কমে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে আস্তে আস্তে ঘাস, গুল্ম, গাছ গজানো শুরু হলো। মাত্র এক দশকের মাথায় তুলা আর উইলোগাছের বিশাল বনভূমিতে পরিণত হলো একসময়ের হরিণ বিচরণের খোলা মাঠগুলো। সবুজ বন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েলোস্টোনে ফেরত এল পাখি, ভালুক, কাঠবিড়ালি আর ইগল। নতুন গজিয়ে ওঠা বনভূমির শিকড়ে শিকড়ে মজবুত হলো নদীর ঢাল। মাটির ক্ষয় হ্রাস পেল। এভাবে ‘হিংস্র’ নেকড়ে মজবুত করল নদী আর মাটির বন্ধন, বদলে দিল বনের মানচিত্র।

যারা বোঝে না প্রাণীর সঙ্গে অরণ্যের এই গভীর সম্পর্ক, যারা বোঝে না গাছের সঙ্গে সূর্যের, মাটির সঙ্গে নাইট্রোজেনের আর ফুল-ফসলের সঙ্গে পোকামাকড়, প্রজাপতি আর শুঁয়াপোকার মিলনমেলা, যারা উন্নয়নের নামে জলাশয় ভরাট করে, জঙ্গল কেটে সাফ করে, খরস্রোতা নদীর মুখ বন্ধ করে, বিল-বাঁওড়ে ঢেলে দেয় কারখানার গ্যালন গ্যালন রাসায়নিক বর্জ্য, তারা কি সত্যি জানেন না, প্রকৃতির এই অনাবিল রহস্য, এই মারাত্মক সুন্দর চক্র ভাঙতে গেলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেবেই, আজ অথবা কাল?

 ১৯৫৮ সালে চীনে গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ডের সময় কৃষির ফলন বাড়াতে চেয়ারম্যান মাও হাতে নিয়েছিলেন নানা উদ্যোগ। এর মধ্যে একটি উদ্যোগ ছিল ইঁদুর, মশা, মাছি আর চড়ুই পাখির নিধন (‘ফোর পেস্টস ক্যাম্পেইন’ নামে পরিচিত)। ওই সময় ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ুই পাখি এসে ধান খেয়ে ফেলে, এই অভিযোগে লাখখানেক চড়ুই পাখি মেরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঠিক পরের বছর চড়ুই পাখি না থাকায় পঙ্গপালের মতো পোকার আক্রমণ শুরু হলো গ্রামগঞ্জের বিস্তীর্ণ শর্ষেখেতজুড়ে। ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন তো হলোই না বরং গ্রামগুলোতে শুরু হলো তীব্র খাদ্যসংকট। পরে ১৯৬০ সালে মাওয়ের নির্দেশে চড়ুই পাখি নিধন বন্ধ হয়।

আফ্রিকার একটা অসাধারণ গল্প পড়েছিলাম। তানজানিয়ার এক গ্রামে এক করপোরেট কোম্পানি বাণিজ্যিক ভুট্টার চাষ করতে কয়েক হাজার হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করে নেয়। রাতারাতি গ্রামে ট্রাক্টর এল, ভুট্টার চারা গজাল। এরপর দলে দলে রাইনোসোরাস এল চারাগাছ খেতে। আগে চাষিরা লাঠি নিয়ে রাত জেগে রাইনো তাড়াতেন। কোম্পানির লোকের এত ধৈর্য নেই। ওরা গুলি করে মেরে ফেলল অসংখ্য রাইনোকে। সেই বছর খেত বাঁচল, কিন্তু পরের বছর থেকে ওই এলাকায় মাছ নেই। খাল-বিল পুকুর সব মাছশূন্য। জেলেরা মাছ পান না। ওই এলাকার মাছগুলো ডিম পাড়ত পুকুর ঘাটে রাইনোর বিষ্ঠায়। রাইনো নেই, তাদের বিষ্ঠাও নেই, মাছদের নিরাপদে ডিম পাড়ার ভরসার জায়গাটুকুও নেই।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই গভীর সম্পর্ক যারা বোঝে না, শেষ গাছটি কেটে ফেলে আর শেষ নদীটিতে বিষ ঢেলে, ফ্লাইওভারের জঞ্জালে বসে নোট বলকিয়ে ভাতের মাড় গালবে তারা?

তবু শহরে বসন্ত আসে, শীতের পর ঝকঝকিয়ে সূর্য ওঠে। শীতকালজুড়ে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ দূষণে ঝিমিয়ে থাকা এই শহরের বিবর্ণ গাছগুলো সূর্যরশ্যি থেকে শক্তি নিয়ে আর বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে আমাদের জন্য অক্সিজেন তৈরি করে। ফাল্গুন-চৈত্রে তাপমাত্রা বাড়ে, বাতাসের আর্দ্রতা বাড়ে, গাছে গাছে ফুল ফোটে। বসন্ত মানে ধুলা পড়া ক্যাডমিয়ামের শহরে নতুন পাতা, নতুন চারা, নতুন জীবন সাইকেল। বসন্ত মনে করিয়ে দেয়, এই শহরে এখনো ঝাঁকে ঝাঁকে পলাশ, শিমুল, কাঁঠালিচাঁপা আর সোনালু ফোটে। তাই এখনো আশা আছে। অসৎ বাণিজ্য, লুটপাটের টেন্ডারবাজি, অস্বাভাবিক খরুচে মেগা প্রকল্প, সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন আর প্রাণ–প্রকৃতি নষ্ট করে ফেলা উন্নয়নের কদর্য প্রদর্শনী থেকে বাঁচাতেই হবে এই দেশকে। কারণ, আমাদের তো আর কোনো যাওয়ার জায়গা নেই। তাই আসছে ফাল্গুনে আমাদের দ্বিগুণ হওয়া ছাড়া আর কোনো পথও খোলা নেই।

(মাহা মির্জা: আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ের গবেষক/ ঘাটাইলডটকম)/-