পুলিশ কর্তৃক অপহৃত ৩ যুবক: মির্জাপুর ও কালিয়াকৈর ২ পুলিশ প্রত্যাহার

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সূত্রাপুর এলাকা থেকে তিন যুবককে অপহরণ করে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে তাদের প্রত্যাহার করা হয়। অপহৃত যুবকদের উদ্ধার করা হয়েছে।

বুধবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈরে শিলাবৃষ্টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার সময় একটি প্রাইভেটকারে থাকা পাঁচ যুবকের মধ্যে তিনজনকে আটক করা হয়। পরে তাদের কাছে এ মুক্তিপণ চাওয়া হয়। এ ঘটনার সময় তরিকুল্লাহ ও রাকিবুর রহমান রিমন নামের অন্য দুই যুবক পাশের হোটেলে চা খাচ্ছিলেন। যুবকরা পরস্পরের বন্ধু।

পুলিশ, ভুক্তভোগী যুবক ও তাদের পরিবার সূত্রে জানা যায়, সাদা পোশাকে থাকা কালিয়াকৈর থানার এএসআই আবদুল্লাহ আল মামুন ও টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানার এএসআই মুসফিকুর রহমানসহ তাদের ছয়-সাতজন সোর্স গোয়েন্দা পুলিশের সদস্য পরিচয়ে রায়হান, লাবিব সরকার ও মাফিন নামের ওই তিন যুবককে আটক করে সাদা রঙের মাইক্রোবাসে তুলে নেন। পরে তাদের কাছে ১২ পিস ইয়াবা ও দুই বোতল ফেনসিডিল রয়েছে বলে জানান।

তাদের নিয়ে যাওয়া হয় মির্জাপুর উপজেলার দেরুয়া রেলক্রসিং ফ্লাইওভারের নিচে। সেখানে যুবকদের ক্রসফায়ারের হুমকি দেওয়া হয়। আরেকটি প্রাইভেটকারে আরও তিন যুবক ঘটনাস্থলে এসে আটক যুবকদের জানায়, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে একজনকে ক্রসফায়ার দিয়ে এসেছে তারা। এ সময় এএসআই মুসফিকুর তিন যুবককে ক্রসফায়ার থেকে বাঁচানোর জন্য ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন।

আটক মাফিন ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার নাম জানতে চান এবং তাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এরপর এএসআই আবদুল্লাহ আল মামুন অন্য একটি কালো রঙের প্রাইভেটকারে বসে থেকে যুবকদের ১০ লাখ টাকা দেওয়ার জন্য বলেন।

এরই মধ্যে অন্য দুই বন্ধু তরিকুল্লাহ ও রিমন বিষয়টি আটক বন্ধুদের মাধ্যমে জানতে পারেন। তাদেরকে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার নামও বলা হয়। দুই বন্ধু বিষয়টি কালিয়াকৈর থানার ওসি আলমগীর হোসেন মজুমদার ও গাজীপুরের এসপি শামছুননাহারকে জানান। তিন যুবককে ডিবি পরিচয় দিয়ে আটকের ঘটনায় কালিয়াকৈর থানার ওসি দ্রুত বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসান।

একপর্যায়ে ওসি আলমগীর হোসেন মজুমদার মির্জাপুর থানার ওসি মিজানুল ইসলামের কাছে মুসফিকুর রহমান সম্পর্কে জানতে চান। পরে ওই থানার ওসি মুসফিকুর রহমানকে আটক যুবকদের মির্জাপুর থানায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। মুসফিকুর রহমান আটককৃতদের নিয়ে কালিয়াকৈর থানায় আসেন।

বুধবার রাত দেড়টার দিকে কালিয়াকৈর থানার ওসি আলমগীর হোসেন মজুমদার আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সত্যতা পান। ওসি আলমগীর হোসেন বিষয়টি গাজীপুরের এসপি শামছুননাহারকে জানান। আটক তিন যুবককে রাতেই প্রাইভেটকারসহ ছেড়ে দেওয়া হয়।

যুবকদের পরিবারের সদস্যরা জানান, একই উপজেলার বড়ইবাড়ী গ্রামের হান্নান সরকারের ছেলে রায়হান, লতিফ সরকারের ছেলে লাবিব, ডাকুরাই গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে রিমন, শ্রীপুর উপজেলার চন্নাপাড়া গ্রামের মজিবুর রহমানের ছেলে মাফিন ও হাজি ইসলামের ছেলে তরিকুল্লাহ একটি প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্রো-গ-২৮-৪৮৫০) নিয়ে বুধবার বিকেলে ঢাকার বাণিজ্য মেলায় যাচ্ছিলেন। পথে তারা কালিয়াকৈরের সূত্রাপুরে ওই ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিচ্ছিলেন। এ সময় তিনজনকে আটক করা হয়।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন ও এএসআই মুসফিকুর রহমানকে ক্লোজ করা হয়েছে। দু’জনকেই সংশ্নিষ্ট পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়েছে বলে দুটি থানার কর্মকর্তারা জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গত বছর গাজীপুরের ডিবি অফিসে থাকাকালে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে নির্যাতন চালিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তারা গত নভেম্বরে কালিয়াকৈর ও মির্জাপুর থানায় নারায়ণগঞ্জ সদর থানা থেকে যোগদান করেন। দুই কর্মকর্তা দুই থানায় যোগদান করলেও একসঙ্গে গত চার মাসে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে মানুষকে আটকে অর্থ আদায় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আটক রায়হান, মাফিন ও লাবিব সরকার জানান, মিথ্যা অভিযোগে ওই গ্যাসপাম্প থেকে তাদের আটক করেন ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। পরে মির্জাপুরের দেরুয়া রেলপথের ফ্লাইওভারের নিচে নিয়ে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। বিষয়টি দুই বন্ধু তরিকুল্লাহ ও রিমনকে জানালে তারা বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনকে জানায়।

অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অপরাধ করেছি। আমাকে মাফ করে দিন। জীবনে আর কোনো ভুল হবে না।

কালিয়াকৈর থানার ওসি আলমগীর হোসেন মজুমদার ও মির্জাপুর থানার ওসি মিজানুল ইসলাম জানান, ওই ঘটনায় এএসআই আবদুল্লাহ আলম মামুন ও মুসফিকুর রহমানকে সংশ্নিষ্ট পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে।

(এম তুষারী, ঘাটাইলডটকম)/-