পুলিশের হাতে নিহত সিনহার দুই সঙ্গী সিফাত ও শিপ্রা পুলিশ হেফাজতে!

বাংলাদেশের কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে নিহত মেজর (অব:) সিনহা মোঃ রাশেদ খানের সঙ্গে থেকে গ্রেপ্তার হওয়া দুই শিক্ষার্থীর জীবননাশের আশঙ্কার করছেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একই আশঙ্কা রয়েছে পরিবারের সদস্যদেরও।

গত ৩১ জুলাইয়ের ওই ঘটনার পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সাহেদুল ইসলাম সিফাত এবং শিপ্রা দেবনাথ।

শনিবার এই দুই শিক্ষার্থীর দ্রুত মুক্তি দেয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেছে ঢাকায় স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। এর আগে বুধবারও তারা এ নিয়ে বিক্ষোভ করেছে।

অন্যদিকে সাহেদুল ইসলাম সিফাতের মুক্তির দাবিতে বরগুনায় একটি মানববন্ধন শনিবার লাঠিচার্জ করে ভণ্ডুল করে দিয়েছে পুলিশ। সেই ঘটনায় স্থানীয় কয়েক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে।

সিনহা মোঃ রাশেদ খানের সাথে কক্সবাজারে ডকুমেন্টারি তৈরির সময় তিনজন সাথে ছিলেন। এরা হলেন, বেসরকারি স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফিল্ম এন্ড মিডিয়া বিভাগের শিক্ষার্থী শিপ্রা দেবনাথ, সাহেদুল ইসলাম সিফাত এবং তাহসিন রিফাত নূর।

এদের মধ্যে তাহসিন রিফাত নূরকে তাদের অভিভাবকের কাছে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

বাকি দুইজন – শিপ্রা দেবনাথ এবং সাহেদুল ইসলাম সিফাত এখন কক্সবাজার কারাগারে রয়েছেন।

এর মধ্যে সাহেদুল ইসলাম সিফাতের বিরুদ্ধে দুটি মামলা এবং শিপ্রা দেবনাথের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।

জীবননাশের আশঙ্কা শিক্ষার্থীদের

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সাহেদুল ইসলাম সিফাত এবং শিপ্রা দেবনাথের মুক্তির দাবিতে শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী ক্যাম্পাসের সামনে মানববন্ধন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

সেখানে চারদফা দাবি তুলে ধরেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানাউল কবীর সিদ্দিকী।

এর মধ্যে রয়েছে ওই দুই শিক্ষার্থীর মুক্তি, মেজর (অব) সিনহা মোঃ রাশেদ খানের হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার, দুই শিক্ষার্থীকে মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি, দুই শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সামাজিকভাবে নিরাপত্তা প্রদান।

সানাউল কবির সিদ্দিকী বলেন, ”পুলিশের গুলিতে যদি একজন আর্মি মেজর নিহত হতে পারে, সেখানে সিফাত পুলিশের বিপক্ষে একজন রাজসাক্ষী। তাহলে পুলিশের হেফাজতে থেকে সে কীভাবে বিপন্ন নয়? অবশ্যই সে বিপন্ন। একটি গোয়েন্দা সংস্থা ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনেও তাকে নিয়ে জীবন সংশয়ের আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার বা মাদক উদ্ধারের নাম করে রাতের অন্ধকারে যেকোনো কিছু করে ফেলা হতে পারে, সেটার সমূহ সম্ভাবনা আছে।”

তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, যে মামলার কারণে এখন সিফাত এবং শিপ্রা কারাগারে রয়েছেন, যারা সেই অভিযোগ লিখেছেন, সেই মামলাকারীরাই (অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা) একই ঘটনায় এখন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছে।

তাহলে সিফাত এবং শিপ্রার বিরুদ্ধে সেই মামলার গ্রহণযোগ্যতা কিভাবে থাকে?

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তিনি সাহেদুল ইসলাম শিফাত এবং শিপ্রা দেবনাথের মুক্তির ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করার অনুরোধ করেন।

উদ্বেগে আছেন সিফাতের স্বজনরাও

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, সিফাত ও শিপ্রার নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন স্বজনরাও।

সাহেদুল ইসলাম সিফাতের খালু মাসুম বিল্লাহ বিবিসিকে বলছেন, ”সিফাতকে নিয়ে আমরা বেশ শঙ্কায় আছি। কারণ এখানে দুইটা পক্ষই শক্তিশালী, এখন সে দুইটা পক্ষের মাঝখানে পড়ে গেছে। পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আমরা উদ্বেগে আছি।”

মানবন্ধনের ওপর পুলিশের হামলা

সাহেদুল ইসলাম সিফাতের বাড়ি যেখানে, সেই বরগুনার বামনায় তার মুক্তির দাবিতে একটি মানববন্ধনে পুলিশ লাঠিপেঠা করলে অন্তত বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।

স্থানীয় সাংবাদিক মনোতোষ হাওলাদার বিবিসি বাংলাকে জানান, দুপুর ১২টার দিকে প্রায় দেড়শর মতো মানুষ মানববন্ধনে যোগ দেয়। তারা সিফাতের বন্ধু এবং সাবেক সহপাঠী।

তবে মানববন্ধন শুরু হওয়ার সাথে সাথে পুলিশ এসে তাদের ব্যানার ছিনিয়ে নেয় এবং বেধড়ক লাঠিপেটা করে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। এ সময় তাদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়।

মানববন্ধন বন্ধ করে দেয়ার ব্যাখ্যা হিসাবে বামনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইলিয়াস আলী তালুকদার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ”আমাদের কারো অনুমতি না নিয়ে তারা হুট করে মানববন্ধন করেছে, আমাদের কাছে কোন ইনফরমেশন দেয়নি। আমাদের কাউকে এ ব্যাপারে আগে জানায়নি।

এটা সরকারের পক্ষে নাকি বিপক্ষে, সেটাও তো আমাদের বোঝার ব্যাপার আছে।

কিছু কুচক্রী মহল আছে, যারা বর্তমান সরকারের বিপক্ষে কাজ করছে। তারা কি চোর, ডাকাত, নাকি ছিনতাইকারী, সেটা তো আমরা জানি না।”’

দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছে পুলিশ

পুলিশের গুলিতে যখন সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ নিহত হন তখন সেখানে ছিলেন সাহেদুল ইসলাম সিফাত।

সিফাতের বিরুদ্ধে একটি মামলা হচ্ছে, সরকারি কাজে বাধা দেয়া ও হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্র দিয়ে গুলি করার জন্য তাক করা।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, সিনহা মোহাম্মদ রাশেদের সাথে যোগসাজশে সিফাত এ কাজ করেছে।

তার বিরুদ্ধে দায়ের করা আরেকটি মামলা মাদকদ্রব্য আইনে। সে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অবৈধ মাদক জাতীয় ইয়াবা ট্যাবলেট এবং গাঁজা যানবাহনে নিজ হেফাজতে রাখার অপরাধ।

অন্যদিকে শিপ্রা দেবনাথের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি বিদেশি মদ, দেশীয় চোলাই মদ ও গাঁজা নিজ হেফাজতে রেখেছেন।

পুলিশের ভাষ্য মতে, আত্মরক্ষার জন্য মেজর রাশেদ খানকে গুলি করার পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে হিমছড়ি নীলিমা রিসোর্টে তাদের অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে। এরপর সেটি খুঁজতে পুলিশ রিসোর্টে যায়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, সে রিসোর্টে গিয়ে একটি কক্ষে শিপ্রা দেবনাথ এবং আরেকটি কক্ষে তাহসিন রিফাত নূরকে পাওয়া যায়।

এজাহারে পুলিশ উল্লেখ করেছে, শিপ্রা দেবনাথের কক্ষ তল্লাশি করে সেখানে বিদেশি মদ, দেশি চোলাই মদ এবং গাঁজা পাওয়া যায়।

তবে পুলিশের আনা এসব অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে সানাউল কবির সিদ্দিকী বলছেন, মদ-গাঁজা খাওয়া তো দূরের কথা, তাদের আমি একটা সিগারেটও খেতে দেখিনি।

মেজর (অব) সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বোন শারমিন শাহরিয়ারের দায়ের করা হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার ওসি এবং বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জসহ (যিনি গুলি করেছেন) তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখানোর পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‍্যাব। এই মামলায় অপর চারজনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। এই মামলার তদন্ত করছে র‍্যাব।

(বিবিসি, ঘাটাইল ডট কম)/-