পানি ও স্নায়ু যুদ্ধ, মজলুমের কথা

‘খরা কালে পোড়াও, বর্ষাকালে ভাসাও’ এ কেবল আর বাংলাদেশ-ভারত পানি সমস্যার উপাখ্যান নয়। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান এমনকি চীনও এই পানি সমস্যা নিয়ে ভাবছে এবং একে অপরকে ভাবাচ্ছে।

বাংলাদেশ অবশ্য বছরের পর বছর ধরে খরা-বন্যা সহ্য করেও সর্বোচ্চ সহনশীলতা দেখিয়ে ভারতের বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করে আসছে। এক্ষেত্রে ভারত খুব সহজেই ফারাক্কা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর সমস্যা সমাধান করে বাংলাদেশকে আস্থায় নিতে পারতো।

বিশেষ করে অবস্থাটা যখন এমন খোদ ভারতের অভ্যন্তরেই ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে কথা উঠছে, প্রতিবাদ হচ্ছে। কিন্তু ভারত সেদিক থেকে খুব বেশি বাস্তবিক সমাধানের পথে হাঁটেনি। তার চেয়ে বরং লাল ফিতার ঘেরাটোপে প্রলেপ দেয়ার চেষ্টা করেছে।

ক্ষতটা তাই ক্রমেই করোনার মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

হঠাৎ করেই নেপাল কিংবা ভুটানের প্রতিবাদী আচরণ শুধু ভারতকেই ভাবিয়ে তুলছে না; এতদঞ্চলের শান্তি ও সংহতির পথকে কন্টকাকীর্ণ করে তুলছে।

কথায় আছে ছোটও বটে\ফুল তবে\অবহেলা করো না। আমার তো মনে হয় এই অঞ্চলের ছোট দেশগুলোর প্রতি ভারতের দীর্ঘদিনের অবহেলার সুযোগ চীন, আমেরিকাকে প্রলুব্ধ করছে।

বিশেষ করে চীন তো পানি নিয়ে রীতিমতো পানি ঘোলা করে সেই পানিতে শুধু মাছ নয় হাঙর তিমি শিকার করার চেষ্টা করছে।

ভারত-চীন দ্বন্দ আর আমেরিকার ইন্ধন রীতিমতো এই অঞ্চলকে ঘিরে আধিপত্যের নতুন খেলায় মেতে উঠেছে। পানি পথের রূপক যুদ্ধকে বাস্তবে পানি যুদ্ধের ক্ষেত্র বানাতে চাইছে। উভয় দেশই নিজেদের শক্তিমত্তা আর মোড়লগিরি চটাতে চাইছে। এতে করে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচালে শুধু আঞ্চলিক নয় অভ্যন্তরীণ সংহতিও হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে।

পানি যতটা না তৃষ্ণা নিবারণের উপকরণ, তার চেয়ে বেশি রাজনীতির ঘুঁটি হচ্ছে। সেই পানিতে বড় নাক ছোট নাক দেদারছে গলে যাচ্ছে। আর আমাদের মতো নাক ছাড়া ছোট দেশগুলো টিভি সেটের সামনে বসে সেই থ্রিল দেখছি। মাঝে মাঝে খেদ প্রকাশ করছি।

বাস্তবে শুকনো মৌসুমে চুইয়ে পড়া পানির আশায় জিহবা টান টান করে রাখি আর বর্ষাকালে ভাসাইলিরে ডুবাইলিরে গান গাই। ভুলে গেলে চলবে না প্রকৃতির চেয়ে মানুষ কি বেশী শক্তিশালী? যদি তাই না হয় প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ করে তৈরীকৃত বাঁধ, ব্যারেজ, ড্যাম, রাবার ড্যাম নিদান কালে কারোর জন্য কোনো কাজে আসবে না। দিন শেষে মানুষের ভোগান্তি বাড়াবে।

জনতার মৈত্রী ও সংহতি নষ্ট হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে দূরত্বই বাড়তেই থাকবে। অন্ততঃ করোনাকাল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে একা একা ভালো থাকা যায় না; সবাইকে নিয়েই ভালো থাকতে হয়।

তাই এখনও অনুধাবন করার সময় আছে ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।’

য়তো সবাই মিলে একদিন পানির জন্য কারবালার কোরাস গাইতে হতে পারে।

আবারো বলছি উজান ভাটির দেশসমুহের পানিসহ অন্যান্য অমীমাংশিত বিষয়সমূহ ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধানে ভারতকেই অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোকে আস্থায় নিতে হবে।

অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য ভারত বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধুপ্রতিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও বহু দিন ধরে যৌথনদীগুলোর সমস্যা সমাধানে তালবাহানা ছাড়া কার্যকরী কোন ভূমিকা পালন করছে না।

তাই এতদঞ্চলের জনসাধারণের মনে ভারতের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বড় হচ্ছে। এই মনোভাবের প্রকাশ্য বিরোধীতাও সরব হচ্ছে। বল এখন ভারতেরই কোর্টে। তাদের সহনশীল ও মানবিক উপলব্ধির ওপর এতদঞ্চলের শান্তি ও সংহতি অনেকাংশে নির্ভর করছে।

আমার মনে হয় ভারত যদি আজ তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হতো তাহলে চীনও এতোটা আশকারা পেতো না।

সমাধানের পথ হিসেবে ২০১৪ সালের ১৭ আগষ্ট কার্যকর হওয়া ‘আন্তর্জাতিক নদীধারা সনদ’টিকে সামনে আনা যেতে পারে।

এই সনদের ৭.১ ধারায় বলা হয়েছে যে, উজানে কোন দেশ আন্তর্জাতিক নদীর পানি এমনভাবে ব্যবহার করতে পারবে না যাতে ভাটির দেশের কোন ক্ষতি হয়। অববাহিকার এসব দেশের ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ, পানি ব্যবহার নিয়ে বিরোধ, আন্তর্জাতিক আদালত, পরিবেশ রক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে ওই সনদে।

ধারা ৭.২ তে বলা হয়েছে যে, উজানের দেশের পানি ব্যবহারের ফলে ভাটির দেশের ক্ষতি হয় তাহলে তাকে (ভাটির) দেশের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

সনদটিকে কার্যকর করতে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক নদী কমিশন গঠন করা যেতে পারে। যাতে করে এক দেশ বা অঞ্চল ওপর কোন দেশ বা অঞ্চলের ওপর যেন উদ্দেশ্যমূলকভাবে পানি আগ্রাসন চালাতে না পারে।

স্নায়ুযুদ্ধের কৌশল হিসেবে মরুকরণ বা বন্যায় ভাসাতে না পারে। এসব দিক বিবেচনায় রেখে অত্রাঞ্চলের জীববৈচিত্র রক্ষাসহ জনগণের মৈত্রী ও সংহতিকে প্রাধান্য দিয়ে এখনই সময় প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সন্দেহ, অবিশ্বাস, দূরন্ত কমিয়ে আনা।

এক্ষেত্রে অত্রাঞ্চলের জনসাধারণের মাঝে অভিন্ন ভ্রাতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আমাদের পথ দেখাতে পারে। হাজার বছর ধরে একসাথে শান্তিতে বসবাস করার নজীর আমাদের রয়েছে।

জনগণের এই ঐক্যকে পানি আগ্রাসন দিয়ে নস্যাৎ করার প্রচেষ্টা রুখতে হবে। আসুন সবাই মিলে আওয়াজ তুলি, পানি আগ্রাসন নিপাত যাক। জনতার মৈত্রীর জয় হোক।

(আজাদ খান ভাসানী/ সভাপতি, মওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি ও সাধারণ সম্পাদক, ভাসানী পরিষদ, মাভাবিপ্রবি সন্তোষ, টাঙ্গাইল)/-