পহেলা বৈশাখ ধর্মীয় বা বিতর্কের বিষয় নয়, ‘সার্বজনীন উৎসব’

পহেলা বৈশাখ ‘বাংলা নববর্ষ’ বাঙালীর প্রানের উৎসব। অামাদের গতিময় জীবন ধারায় নিয়ে অাসে নতুন অাশা, উদ্দীপনা, পারস্পারিক সম্প্রীতির বার্তা। বাঙালী সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে দেয় নিজস্ব সংস্কৃতি ঐতিহ্যের অনুভূতি। ফুটে ওঠে অামাদের জীবন চিত্র।

ষোড়শ শতকে সম্রাট অাকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। হিজরী সন ও সম্রাট অাকবরের সিংহাসনে অারোহনের বছরকে যুক্ত করে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। এটিকে ফসল কাটার মৌসুমে খাজনা অাদায়ের সুবিধার জন্য করা হয়ে ছিল বলে বলা হয়ে থাকে। এদিনে রাজবাড়ী সাজতো ভিন্নরুপে। খাজনা দিতে অাসা প্রজাদের জন্য নানা দোকানপাট বসে মেলায় রুপ নিত।

সেই থেকে শুরু। অাবহমানকাল ধরে চলছে বাঙালীর প্রানের এ উৎসব।

এ দিন উপলক্ষে নানা অায়োজনের মধ্য দিয়ে বহিঃপ্রকাশ ঘটে অামাদের শিল্প, সংস্কৃতির। চিরাচরিতভাবে নুতন বছরের প্রথম দিনে শহর থেকে গ্রামে বৈশাখী মেলা বসে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে নুতন সাজে সজ্জিত শিশু, কিশোর অাবাল, বৃদ্ধ, বনিতার পদচারনায় মুখরিত হয় মেলা প্রাঙ্গন।

সামজিক,সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মিলন মেলা। প্রানের উচ্ছ্বাস আর সেতু বন্ধনের মেলা। এ শুধু বিনোদন প্রানের উ্ল্লাসের মেলা নয়, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সংমিশ্রন।

দিনটিকে অামাদের জাতীয় দিবস হিসাবে নির্ধারন করা হয়েছে। অার এ দিনটিকে উৎসাহ, অানন্দ উল্লাসে কাটানোর জন্য সরকার গতবছর হতে সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য উৎসব ভাতা চালু করছেন বেসিকের ২০% হিসাবে।

কথা প্রসঙ্গে এ বিষয়ে ফেসবুক বন্ধু ছোট ভাই সুমন খন্দকার বলে, ‘ভাই খাজনা অাদায় উপলক্ষে যদি দিবসটির সৃষ্টি বা নির্ধারন হয়ে থাকে তাহলে এর সংশ্লিষ্টে কারা? প্রজাকুল অর্থাৎ কৃষক। কিন্তু সরকার উৎসব ভাতা দিচ্ছে সরকারী চাকুরীজীবিদের। এ দিবস সৃষ্টিতে যারা উপলক্ষ বা সংশ্লিষ্ট দেশের প্রাণ সেই কৃষক সমাজ তথা অাপামর বাঙালী সমাজের সার্বজনীন উৎসবে তাদের জন্য কি উৎসাহ বা ভাতা দেয়া হল। দিবসের উপলক্ষে ইতিহাসে থাকা সেই কৃষক কুলেরই ভাতা, বোনাস পাওয়ার কথা। অার সরকারী চাকুরীজীবিরা এটা শুধু পেলে তা তো সার্বজনীন হল না।’

ভাবলাম ওর চিন্তা, কথাটাতো খারাপ নয়, এভাবে তো বিষয়টা কোনদিন ভাবিনি।

ওর কথায়- কৃষকরা অবহেলিত, কখনো কোন উৎসাহ, উৎসব তথা কোন ভাতা পায় না। দিবস সৃষ্টির সুচনালগ্নে উপলক্ষে বা সংশ্লিষ্টে থাকা দেশের প্রাণ কৃষককুলকে এ সুযোগ বা উপলক্ষে নুন্যতমহারে সার বা জ্বালানী তৈল উৎসাহ ভাতা হিসাবে দেয়া উচিৎ, যার কোন অপব্যয় হবে না বরং দেশের উপকার হতো, হবে। দিবসটি সার্বজনীন সার্থকতা পেতো।

সে যাই হোক এদিনে শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মার্কেট, হাটবাজার, মেলায় কেনাকাটার সাথে অর্থনীতির চাকা সচল হয় দুয়েরই সমৃদ্ধি ও প্রসার ঘটে। বিনোদন উপভোগ, পরিবার ও সংসারের ব্যবহার্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ কেনা কাটার চাহিদা পূরনের সাথে অর্থনীতিও হয় চাঙ্গা। এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈশাখী মেলাকে উপলক্ষ্য করে অায়োজন করা হয় জারি, পালা, মারফতি, ভাটিয়ালি,মুর্শিদি গান, সাথে নাগরদোলা,পুতুল নাচ, কুস্তি,যাত্রা, লাঠি খেলা, বায়োস্কোপ, নাটক মেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিনোদনের পাশাপাশি নিত্য প্রয়োজনীয় লোকশিল্পজাত পন্য, কৃষিজাত পন্য, কুটিরশিল্পজাত পন্য,লোহাজাত ও মৃৎশিল্পজাতের হরেক রকম বাহারী পন্যের সমাহার ঘটে। বৈশাখের সাজে শিশু কিশোরদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহন মেলাকে প্রানবন্ত করে তোলে। তাদের চিত্তাকর্ষক পন্য হল -মাটির তৈরী পুতুল, ব্যাংক,হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা প্রকারের খেলনা।

শখের হাঁড়ি বলে একটি কথা প্রচলিত অাছে। মানুষ শখের জিনিষই শখের হাঁড়িতে রাখে। এটি এ্যালোমিনিয়াম বা ধাতব পদার্থের নয়, সম্পূর্ন মাটির তৈরী, ফুল পাখী, গ্রামের দৃশ্য তথা নানা প্রকার অালপনা অাকা রঙিন অাকর্ষনীয় এসব হাঁড়ি বৈশাখের মেলাতেই সচারচর পাওয়া যায়।

গৃহস্থালী ও কুটিরশিল্প সামগ্রীর মধ্যে বাঁশ বেতের তৈরী কুলা, ডালা,হাতপাখা, নকশীকাঁথা মেলার নজর কারে। কাঠের তৈরি পিঁড়ি, বেলন, লাঙ্গল, কামারের তৈরী দা, কুড়াল, কোদাল, বটি মেলার অংশ জুড়ে থাকে।

মহিলাদের জন্য থাকে ফিতা, চুড়ী, নানা ধরনের আকর্ষনীয় প্রসাধনী সামগ্রী।

খাদ্যে মুড়ি, চিরা, মোয়া, ঝুড়ি ও জিলাপীসহ সুস্বাদু খাবারের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ার মতো।

মেলার পরও এর রেশ থাকে। গ্রামাঞ্চলে পুতুল বিয়ের প্রচলন অাছে, শিশুরা পুতুল বিয়ে দিয়ে থাকে। তাতে এক বাড়ীর পুতুলের সাথে অারেক বাড়ীর পুতুলের বিয়েতে অাপ্যায়ন হয়, তাতে বন্ধুত্ব-সম্প্রীতি ও অান্তরিকতা বাড়ে। মেলাকে সামনে রেখে এর বানিজ্য ধরতে পোষাক, কুটির, মৃৎ, লোহা শিল্পের মালিক ও শিল্পীগন ব্যস্ত সময় কাটান মেলার বানিজ্যের পন্য তৈরীতে। তাদের মেধা, শ্রম, দক্ষতা দিয়ে শৈল্পিক নিপুনভাবে হরেক রকম বাহারী পন্য তৈরী করে। যা অামাদের রুচিবোধ ও ঔজ্জ্যলতা বাড়ায়।

মেলায় সংসারের ব্যবহার্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের সাথে কারুকাজ খচিত সৌখিন যে ধরনের বাহারী পন্য পাওয়া যায় তা সব সময় অন্যত্র পাওয়া যায় না। কাজেই পরিবার ও সংসারের প্রয়োজনে ব্যবহার্য পন্য তৈরী, মেলায় বেচাকেনায় ধর্ম,অধর্ম, বিধর্মের কোন বিষয় নয়। এ নিয়ে বিতর্কও অমূলক।

অার একটি কথা- বাঙালী জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মানুষের অাবেগ অনুভূতির কথা ভেবে, চিন্তে, পর্যালোচনা করেই সরকার দিবসটিকে জাতীয় দিবস করেছেন। সরকারিভাবে পালনও করা হয়। অামি রাষ্ট্রের নাগরিক হলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অামাকে মানতেই হবে। তাহলে বিতর্ক কেন?

কাজেই সংগতভাবেই ধর্মান্ধতা,সংকীর্ণতা সব ঝেড়ে ফেলে- নিজস্ব সংস্কৃতির ধারক বাহক, অামাদের জাতীয় উৎসব ‘বাংলা নববর্ষ’ গৌরবের এ দিনটিতে অাবহমানকাল ধরে যে বন্ধন গড়ে উঠেছে তাকে অারো সুদৃঢ় করি। সমৃদ্ধির পথে সুদৃঢ় সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকুক চিরকাল। এই হোক অামাদের নতুন বছরের প্রত্যাশা। ১৪২৫ বঙ্গাব্দ সবার জীবনে বয়ে অানুক অনাবিল সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি।

শুভ নববর্ষ

(লেখক: এম এ রউফ, ঘাটাইল.কম)/-