পঁচাত্তরের খুনি চক্র ও এরশাদ

জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের জন্ম দিতে পারে। রাষ্ট্র চাইলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দ্বারা গঠিত দুটি রাজনৈতিক দল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি (প্রগশ) ও ফ্রিডম পার্টি কী প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছিল, তার একটা তদন্ত হতে পারে। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর এরশাদ ফারুক-রশিদ চক্রের নেতৃত্বাধীন খুনি চক্রকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করেছিলেন। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারি দলের নেতাদের মুখে কোনো কথা শোনা যায় না।

এরশাদের মৃত্যু এবং সিআইএর অবমুক্ত করা একটি গোপন নথি বিষয়টির ব্যাপারে আমাদের উৎসাহিত করে তুলেছে। এ প্রসঙ্গে এক দশক আগে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের চূড়ান্ত রায় ঘোষণার দিনে প্রথম আলোর ক্রোড়পত্রে সম্পাদক মতিউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধ (খুনি চক্রকে রক্ষা করেছে জিয়া এরশাদ খালেদা সরকার, ১৯ নভেম্বর ২০০৯) স্মরণ করতে পারি। এতে তিনি লিখেছেন, ‘শাহরিয়ার রশিদ ও বজলুল হুদার ১৯৮০ সালের ১৭ জুন অভ্যুত্থানচেষ্টায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পরও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে এরশাদ সরকারের আমলে ঢাকায় আসতে দেওয়া হয়। তাঁরা ঢাকায় প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি (প্রগশ) নামের একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তখনই এ কথা জানা গিয়েছিল যে এরশাদ সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় তাঁরা এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে বজলুল হুদা ফ্রিডম পার্টিতে যোগ দেন। এর পরপরই আমরা দেখি, ১৯৮৫ সালে লে. কর্নেল ফারুক ও লে. কর্নেল রশিদ “১৫ আগস্ট বিপ্লবের আদর্শ বাস্তবায়ন” সংগঠনের নামে ঢাকায় এসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন।’ জিয়া খুনিদের স্থায়ীভাবে দেশে ঢুকতে দেননি কিংবা বনিবনা না হওয়ার কারণে তাঁরা দেশে ঢুকতে চাননি। কিন্তু এরশাদ খুনিদের দেশে ঢোকালেন। রাজনীতিতে আনলেন। ফ্রিডম পার্টির প্রার্থী হিসেবে বজলুল হুদা’ ৮৮-র সংসদ নির্বাচনে মেহেরপুর-২ থেকে নির্বাচিত হলেন।

২০১৩ সালে অবমুক্ত করা সিআইএর ওই নথিতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ১৯৮৮ সালে ঢাকায় সফররত মার্কিন সিনেট কমিটির পিটার গেলব্রেইথের কাছে এরশাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। এ সময় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এরশাদ ফারুক-রশিদকে ফ্রিডম পার্টি গঠনে সহায়তা দিয়েছেন। মতিউর রহমান তাঁর ওই নিবন্ধে লিখেছিলেন, তাঁরা দেশে ফিরে এসে একাধিক রাজনৈতিক দল (প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি ও ফ্রিডম পার্টি) গঠনের সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো, এর পেছনে কি শুধুই এরশাদ ছিলেন? আমরা ইদানীং দেখি, জঙ্গিবাদের শিকড় খুঁজতে গিয়ে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বীকে টার্গেট করা হয়। অথচ একসময় দেশে যারা ‘ইসলামি সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, তারা কারা ছিল—সে নিয়ে আগ্রহ দেখা যায় না। তাদের বিদেশি মুরব্বিরা কারা? বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি হওয়ার মধ্য দিয়ে কি সেই সব কুশীলব নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে?

এরশাদের অপসারণে দুই নেত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা আশা করেছিলেন। তাঁরা দুজনেই অভিন্ন দাবি করেছিলেন, এরশাদকে টিকিয়ে রেখেছে আমেরিকা। তাঁরা তখন অভিজ্ঞ রাজনীতিক। তাঁরাই মনে করেন, সরকার টিকিয়ে রাখতে বিদেশি রাষ্ট্র ভূমিকা রাখতে পারে। গেলব্রেইথ আন্দোলনরত দুই নেত্রীর কাছেই জানতে চেয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের কী ‘সহায়তা’ দিতে পারে।

১৯৮৮ সালের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন মার্কিন সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটির স্টাফ পিটার গেলব্রেইথ দুই নেত্রীর সঙ্গে দেখা করতেই ঢাকায় এসেছিলেন। শেখ হাসিনা এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ভোট ডাকাতি ও কথিত ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ মরিয়ম মমতাজের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ এনেছিলেন। আরও বলেছিলেন, ছিয়াশিতে আওয়ামী লীগ আসলে ২২৬ আসনে জয়ী হয়েছিল। এরশাদ দিয়েছিলেন ৭৬ টি। এ সময় শেখ হাসিনা জেনেছিলেন যে বঙ্গবন্ধুর খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান একটি উড়োজাহাজ কেনার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর করছিলেন।

গেলব্রেইথ ১৯৮৮ সালের ২৯ জানুয়ারি আলাদাভাবে দুই নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গেলব্রেইথের সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এরশাদ সৈয়দ ফারুক রহমান ও আবদুর রশিদকে দিয়ে ফ্রিডম পার্টি গঠন করেছেন এবং ফারুককে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হতে দিয়েছেন। অথচ তাঁরা উভয়ে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। তিনি এই তথ্যও দিয়েছিলেন যে ফারুক-রশিদকে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে দেখা গেছে। এ সময় মার্কিন পলিটিক্যাল কাউন্সেলর বলেছিলেন, সৈয়দ ফারুক রহমান একটি উড়োজাহাজ কেনার সম্ভাব্যতা যাচাই করছেন। এই তথ্যে মনে পড়ল, ১৯৭৩ সালেই অস্ত্র কিনতে ফারুক রহমান মার্কিন দূতাবাসে ধরনা দিয়েছিলেন।

গেলব্রেইথ শেখ হাসিনার কাছে ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন। তিনি শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি যদি মনে করে থাকেন যে এই নির্বাচন কারচুপিপূর্ণ হবে, তাহলে তাতে অংশ নিয়েছিলেন কেন। উত্তরে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ওই সংসদীয় নির্বাচন ছিল প্রতারণাপূর্ণ। কিন্তু আওয়ামী লীগ কিছুটা গণতন্ত্র যাতে কাজ করে, সে জন্য তিনি সংসদে গিয়েছিলেন।

গেলব্রেইথ খালেদা জিয়ার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষে মিলেমিশে এক দল হয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সম্ভব কি না। খালেদা জিয়া না-সূচক জবাব দিয়েছিলেন। এরপর গ্যালব্রেইথ বলেন, ভবিষ্যতে বেগম জিয়া রাষ্ট্রপতি ও শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হলে কেমন হয়—এমন আলোচনাও তিনি শুনেছেন। এমন সম্ভাবনাকে বেগম জিয়া প্রবলভাবে নাকচ করেন। আমরা দেখি, এরশাদের অপসারণে তাঁরা ওই সময় ঠিকই ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু অপসারণের পর দুই নেত্রী এরশাদের আর্থিক দুর্নীতিকেই বড় করে দেখেন। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের দায়ে হাইকোর্টের রায় সত্ত্বেও জীবদ্দশায় এরশাদের কিছুই হয়নি। ধূর্ত এরশাদ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারে সমর্থন দিয়ে অনুকূল স্রোতে পাল তোলেন। অথচ তিনিই যে খুনিদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের চেষ্টা করেছেন, সেই জবাবদিহিরও বাইরে থেকে গেলেন।

শেখ হাসিনা গেলব্রেইথকে কতগুলো আলোকচিত্র দেখিয়েছিলেন। ওই সব আলোকচিত্রে দেখা যায়, ফারুক-রশিদ ও তাঁদের অনুসারীরা অস্ত্র হাতে ঘুরছেন। মতিউর রহমান তাঁর ১৯ নভেম্বর ২০০৯ সালের ওই নিবন্ধে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে লিখেছিলেন, ‘ফারুক-রশিদ ফ্রিডম পার্টির কর্মীদের লিবিয়ায় থেকেই লিবীয় সরকারের সহায়তায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। লিবিয়ায় কয়েক শ যুবককে ৩ থেকে ৬, এমনকি ৯ মাস পর্যন্ত সশস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে জানা যায়।’

বেদনাবিধুর ১৫ আগস্ট সামনে রেখে আমরা তো জানতে চাইতেই পারি, সেই যুবকেরা এখন কে কোথায়? মতিউর রহমান আরও লিখেছিলেন, ‘লিবিয়ায় পিস্তল থেকে শুরু করে মেশিনগানসহ আধুনিক অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নেওয়া ক্যাডাররাই ছিল ফ্রিডম পার্টির প্রধান ভিত্তি। তবে এ ব্যাপারে কোনো সরকারের আমলে কোনো তদন্ত হয়েছিল বলে জানা যায় না।’ সেই তদন্তটা হওয়া জরুরি।

যেসব বিষয় ও প্রশ্নের উত্তর মেলেনি এবং অমীমাংসিত রয়ে গেছে, সেগুলো আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিত। প্রথমত, খুনিদের গাদ্দাফি ও লিবীয় উপাখ্যানটি অজানাই রয়ে গেছে। এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম এ জি তাওয়াবের ভায়রা জামির উদ্দীন আহমেদ তখন ত্রিপোলিতে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। এরশাদ লিবিয়ায় খুনিদের সংশ্লিষ্ট জনশক্তি রপ্তানির বেনিফিশিয়ারি ছিলেন বলে জানা যায়। ১৯৮৮ সালে ফ্রিডম পার্টির সভাপতি হিসেবে ফারুকের উড়োজাহাজ কিনতে যুক্তরাষ্ট্র গমন সেটাই ইঙ্গিত করে। উল্লেখ্য, বিদেশে এরশাদের অর্থ আনতে ১৯৯১ সালে গঠিত কেবিনেট সাব-কমিটি একবারের পর আর বৈঠকে বসেনি। বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার মার্কিন তদন্তকারী সংস্থা দ্য ফেয়ারফ্যাক্স গ্রুপকে দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু তা নিয়ে কোনো সরকারই আর টুঁ শব্দটি উচ্চারণ করেনি। ফেয়ারফ্যাক্স তার ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের বিষয়টি উল্লেখ করেছে। তার মানে তারা একটা পর্যায় পর্যন্ত কাজ করেছে। বাংলাদেশ কেন ফেয়ারফ্যাক্স রিপোর্ট নিয়ে নীরব থাকবে? বিসিসিআইয়ের সালেহ নাকভির হলফনামা অনুযায়ী এরশাদের ১ কোটি ১০ লাখ ডলারের অ্যাকাউন্ট, মার্কিন সিনেটর কেরি সাব-কমিটির রিপোর্টে এরশাদের ৫২ কোটি ডলার পাচার (দেখুন, মতিউর রহমান, ভোরের কাগজ, ১৮ অক্টোবর ১৯৯৭), তেজগাঁও থানায় এরশাদ ও মরিয়মের বিরুদ্ধে ৪০ কোটি টাকা পাচারের মামলার বিষয়গুলো অন্ধকারে থাকবে কেন? কারাগার থেকে বের হওয়ার পর এরশাদ মধ্যপ্রাচ্যের কোন বন্ধুদের সহায়তায় এসব অর্থ কীভাবে সামলেছেন, তা শুধু আর্থিক দুর্নীতির নিরিখেই বিচার্য নয়।

দ্বিতীয়ত, ১৯৭৭ সালের ১ মার্চ জিয়াবিরোধী সেনাবিদ্রোহের দায়ে এক গোপন বিচারে ফারুকের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানার দণ্ড (সূত্র তৎকালীন ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাস্টার্সের পাঠানো তারবার্তা) মওকুফ এবং ডালিম, শাহরিয়ার, নূর ও রাশেদকে সামরিক বাহিনীতে নিয়মিত চাকরিতে পুনর্বহাল এবং জিয়া হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে খুনিদের কর্মস্থল নির্ধারণ ও পদোন্নতি ইত্যাদিতে এরশাদের ভূমিকা ঠিক কী ছিল, তা জানা জরুরি।

তৃতীয়ত, ফারুক-রশিদসহ খুনি চক্রের সঙ্গে সিএমএলএ এরশাদের ‘পূর্ব যোগাযোগ’ থাকাটা আকস্মিক হওয়ার কথা নয়। খুনি চক্র সর্বদা রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন চেয়েছে। ফারুক-রশিদ এ জন্য সুযোগ পেলেই দেশে ফিরতে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু জিয়া নিজের ক্ষমতার প্রতি হুমকি বা অন্য বিবেচনায় তা হতে দেননি। জেনারেল এরশাদই একমাত্র, যিনি প্রথম সুযোগেই ফ্রিডম পার্টিকে ‘সংসদীয় রাজনীতিতে’ নিয়ে আসেন। তাঁর ক্ষমতা দখলের লিপ্সা যদি সুপরিকল্পিত হয়ে থাকে, তাহলে তাঁর পক্ষে এটা বোঝা স্বাভাবিক ছিল যে ক্ষমতায় টিকতে হলে তাঁকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—দুটোকেই কাবু করতে হবে। সুতরাং সেনাশাসনের গোড়াতেই রাজনীতির মাঠে ফ্রিডম পার্টির নড়াচড়া লক্ষণীয়। ১৯৮৭ সালে ফ্রিডম পার্টির মুখপত্র হিসেবে বেরোনো দৈনিক মিল্লাতকে পুনঃপ্রকাশিত হতে দেখি চুরাশিতেই।

চতুর্থত, ১৯৮৮-তে তথাকথিত ‘ঐকমত্য’ প্রতিষ্ঠার অজুহাত দেখিয়ে এরশাদ সংসদ ভেঙেছিলেন। এটা তদন্তের দাবি রাখে যে ফ্রিডম পার্টিকে নিয়ে তিনি ঠিক কতখানি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নেমেছিলেন এবং এই পরিকল্পনার সবটাই তাঁর ‘নিজস্ব’ চিন্তাপ্রসূত ছিল কি না। জিয়া ১৯৭৯-এর সংসদে আওয়ামী লীগের ‘দুর্বলতার’ সুযোগে যা হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি, ১৯৮৮-র সংসদে শেখ হাসিনার শক্তিশালী উপস্থিতিতে এরশাদ সেটাই করে দেখিয়েছিলেন। ফ্রিডম পার্টির দুজনকে জিতিয়ে ‘তৃতীয় বৃহত্তম’ বিরোধী দলের মর্যাদা দেওয়া হয়। এমনকি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত রেডিও-টিভিতে পঁচাত্তরের পর সম্প্রচারিত হয় খুনিকণ্ঠ। রশিদ তাঁর দীর্ঘ ভাষণে (২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮) কথিত আগস্ট বিপ্লবের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছিলেন। এর আগে ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এরশাদ উর্দি খুলে প্রার্থী হয়েছিলেন। ১৬ প্রার্থীর মধ্যে খুনি ফারুক অন্যতম। খুনি ফারুক নিশ্চয়ই এরশাদকে হারাতে প্রার্থী হননি। এটা ছিল রাজনৈতিকভাবে তাঁর পুনর্বাসিত হওয়ার, পঁচাত্তরের পর বাংলাদেশের মাটিতে তাঁরই গড়া ‘রাজনৈতিক দলের’ জাতীয় রাজনৈতিক মঞ্চে অনুপ্রবেশের ইচ্ছাপূরণ।

পঞ্চমত, ১৯৮০ সালের ১৭ জুন অভ্যুত্থানচেষ্টায় জড়িত থাকার পাঁচ বছরের মধ্যে এরশাদ শাহরিয়ার ও বজলুল হুদাকে দিয়ে কী বোঝাপড়ার ভিত্তিতে প্রগশ এবং এরশাদের ‘আঠারো দফা বাস্তবায়ন পরিষদের’ আদলে ১৯৮৫ সালেই ‘১৫ আগস্ট বিপ্লবের আদর্শ বাস্তবায়ন’ সংগঠনের আত্মপ্রকাশ করতে দেওয়া হলো, তা জানা জরুরি।

ষষ্ঠত, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদের ক্ষমতা দখলের বছর না ঘুরতেই রশিদ-ফারুকের মুক্তির পথ বইয়ের প্রকাশনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র না থেকেই পারে না। বইটির প্রকাশনার তারিখ ১৬ ডিসেম্বরকে বেছে নিতে দেওয়ার দায় সিএমএলএকেই নিতে হবে। বেছে বেছে ১৯৮৭ সালের আগস্ট মাসেই শেরাটন হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে ফারুক রহমানকে সভাপতি করে ফ্রিডম পার্টির ঘোষণা দিয়েছিলেন রশিদ। এর ৯০ দিনের মধ্যে প্রেসক্লাব চত্বরে ফ্রিডম পার্টির পাজেরো থেকে ছোড়া গুলিতে নিহত হলো এক কিশোর, পরের বছর ময়মনসিংহে বজলুল হুদার ক্যাডারের গুলিতে প্রাণ হারালেন এক ব্যবসায়ী। ১৯৮৯ সালে ধানমন্ডিতে শেখ হাসিনার ওপর বোমা ও গুলিবর্ষণের মামলায় ২০১৭ সালে ফ্রিডম পার্টির ১১ জনের যাবজ্জীবন দণ্ড হয়েছে। কিন্তু এরশাদের সেনাশাসনে ফ্রিডম পার্টি প্রকাশ্যে যেসব সশস্ত্র হামলা ও মহড়া করেছিল, তাতে সরকারি সংস্থার সংশ্লিষ্টতা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমরা স্মরণ করতে পারি, এরশাদের পতন পরম্পরার পতন ঘটায়নি। সে কারণে ১৯৯৬ সালে বিএনপির আমলে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও আমরা দেখলাম, খুনি রশিদ বসে গেছেন বিরোধী দলের নেতার আসনে।

এরশাদ ও জাতীয় পার্টি খুনি চক্রকে দেওয়া রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে কখনো ক্ষমা চায়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার সমর্থন করায় তাদের দায়মোচন ঘটে না। শেখ হাসিনা তাঁর স্বৈরতন্ত্রের জন্ম শীর্ষক বইয়ে জিয়া-এরশাদের দুটি দলকেই এক বলেছেন। বলেছেন, এদের জন্মস্থান গোয়েন্দা সংস্থা।

প্রগশ ও ফ্রিডম পার্টির জন্মে রাষ্ট্রযন্ত্র কি ভূমিকা রাখেনি? আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগ সরকার দুই দশক ধরে স্বৈরাচারী এরশাদের সমর্থন ও সহায়তা পেয়েছে। সেই জন্যই কি তারা এরশাদ কর্তৃক পঁচাত্তরের খুনি চক্রকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনচেষ্টার কথা ভুলে গেছে?

মিজানুর রহমান খান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক
mrkhanbd@gmail.com