১৯শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩রা জুলাই, ২০২০ ইং

নিষিদ্ধ থাকলেও থার্টি ফার্স্ট নাইটে পটকা-আতশবাজিতে প্রকম্পিত ঢাকা

জানু ১, ২০২০

“ছাদে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম – আকাশে হাজার হাজার আগুন ভেসে বেড়াচ্ছে। ফানুসের আগুন”। ফেসবুকে এমনটি লিখেছেন একজন। কিন্তু শুধু আকাশে ফানুসের আগুন, নতুন বছরের প্রথম প্রহরে রাত ঠিক বারটায় ঢাকার আকাশ কেঁপে উঠেছে পটকা আর আতশবাজির শব্দে। এলাকায় এলাকায় শোনা গেছে হাই ভলিউম সাউণ্ড বক্সে ভেসে আসা গান কিংবা স্টেজ পারফরমেন্স। অথচ খোলা জায়গায় জমায়েতের পাশাপাশি পটকা আতশবাজি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলো ঢাকার পুলিশ।

গতকাল মঙ্গলবার (৩১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যার পর থেকেই ঢাকার নানা এলাকায় যাতায়াত বন্ধ বা সীমিত করে দেয় পুলিশ। গুলশান বনানীতে প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশির কারণে অফিস ফেরত হাজার হাজার মানুষকে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছে। থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে নগরবাসীর জমায়েত ঠেকাতে ঢাকার হাতিরঝিল রাত আটটায় বন্ধ করে দিলে চরম দুর্ভোগ পড়েন আশেপাশের মগবাজার,মধুবাগ, রামপুরা, বনশ্রী, ও বাড্ডার মানুষজন। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস চারদিক থেকে বন্ধ করে টিএসসি এলাকায় অসংখ্য পুলিশ অবস্থান নিলেও তা শিক্ষার্থীদের আটকে রাখতে পারেনি।

তখন পরিবাগ এলাকায় ছিলেন বিবিসি’র সংবাদদাতা পারমিতা হিম। ওই এলাকার সব বাড়ির ছাদেই ‘হুলস্থূল পার্টি’র তে উৎসব মুখরতার কথা জানিয়েছেন তিনি। বাড্ডায় ফানুস আতশবাজি ছাড়াও লেজার লাইট শো দেখেছেন বিবিসির সানজানা চৌধুরী।

এমনকি মিন্টো রোড এলাকায় মহানগর পুলিশ সদর দপ্তর এলাকাতেও সরকারি কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারগুলো ছাড়াও অফিসার্স ক্লাব থেকেও ভেসে এসেছে উচ্চস্বরে গান বাজনার শব্দ। ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ছিলেন বিবিসির ফয়সাল তিতুমীর। তিনি বলছেন তার এলাকাতেও নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছে মানুষ পটকা আতশবাজি কিংবা গান বাজনার মাধ্যমে।

ঘরোয়া আয়োজনের দিকেও এবার নজর ছিলো পুলিশের। বলা হয়েছিলো ছাদে আয়োজন না করতে । কিন্তু সে নিষেধাজ্ঞা কার্যত শুনেনি কেউ। বরং কেক কেটে, ফানুস উড়িয়ে কিংবা গান বাজনার মাধ্যমে নতুন বছর স্বাগত জানানো হয়েছে অসংখ্য বাড়িঘরে। সবমিলিয়ে রাত ১২টায় নতুন বছরের আগমনের মূহুর্তে উৎসব উদযাপনে প্রকম্পিত হয়েছে ঢাকা শহর।

সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরিন বিবিসিকে বলছেন নিয়ন্ত্রিত থাকলেও মানুষ যে আনন্দ করেনি তা কিন্তু নয়। তিনি বলেন, “আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দেখেছি বিধি-নিষেধ কিন্তু মেনেছে সবাই। আবার আনন্দটাও সবাই করেছে নির্বিঘ্নে। ঘরোয়া আয়োজনে অনুমতির বিষয়টা হয়তো বাড়াবাড়ি ছিলো তবে নিরাপত্তার জন্য যেসব ব্যবস্থা ছিলো তা ছিলো যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। সেদিক থেকে পরিবার বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে আয়োজনগুলো নির্বিঘ্নেই হয়েছে”।

গণযোগাযোগের শিক্ষক শামীম রেজা বলছেন নিরাপত্তা হুমকি থাকলে বা বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতেই হবে। কিন্তু একটা বিষয় অবশ্যই মানতে হবে যে বিধি-নিষেধ দিয়ে আর যাই হোক উৎসব আয়োজনের স্পৃহাকে দমিয়ে রাখা যায় না। তিনি বলেন, “উৎসব আসলে নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় না। হয়তো উন্মুক্ত জায়গায় করবে না, কিন্তু করবে। আর যে উৎসবকে ঘিরে কথা তার একটি বৈশ্বিক দিক আছে। এগুলোও বিবেচনায় রাখা দরকার।”

মি. রেজা বলছেন, “সারা বিশ্বে যা হবে এখানে মানুষকে তার বাইরে রাখা অসম্ভব। আমি নিজেও দেখেছি গত রাতে উদযাপন করছে সবাই, উচ্চস্বরে গান বাজছে বা অন্য আরও আয়োজন ছিলো অনেকের”।

তিনি বলেন, “এই শহরে বেশি রাস্তা নেই, এমনকি বিকল্প সড়কই নেই অনেক এলাকায় আসা যাওয়ার। সেখানে শহরের প্রাণকেন্দ্রে হাতিরঝিল, গুলশান, বনানী বন্ধ করে দেয়া হলো লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষের কথা চিন্তা না করেই। অথচ অনেক শহরে এসব উদযাপনে যেনো মানুষ যেতে পারে সেজন্য কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত বাস দেয়, বিনা টিকেটে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে।”

গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় সামনে কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে যে পরিকল্পনা এমন হওয়া উচিত যাতে নিরাপত্তার কারণে উৎসব বিঘ্নিত না হয় বরং উৎসব আয়োজনকে নিরাপত্তা দেয়া হোক,এমনটাই মনে করছেন মি. রেজা। তিনি বলেন, “বিধি-নিষেধ সহজ করে বা আয়োজনে বাধা না দিয়ে কিভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় অন্য দেশের মতো সেটি আমাদেরও আয়ত্ত করতে হবে। কারণ নিরাপত্তার বিষয়েও কোনো ছাড় দেয়া যাবে না”।

কী কী বিধি নিষেধ দিয়েছিলো পুলিশ

গত ত্রিশে ডিসেম্বর পুলিশ ঢাকায় ব্রিফিং করে ও পরে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায় যে থার্টি ফার্স্ট নাইট ও ইংরেজি নববর্ষর প্রথম প্রহরে কোথাও কোনো উৎসব আয়োজন চলবে না।

“রাস্তায়, ফ্লাইওভারে, ভবনের ছাদে এবং প্রকাশ্য স্থানে কোনো জমায়েত, সমাবেশ বা উৎসব করা যাবে না। করা যাবে না নাচ, গানসহ কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও,” জানানো হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। থার্টি ফার্স্ট নাইট পুলিশি নিরাপত্তা ও জনগণের জন্য নির্দেশনা নিজে সচেতন হই অন্যকে সচেতন করি নিরাপদ জীবন গড়ি #সচেতন_নাগরিক পোষ্টটি শেয়ার করে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করুন।”

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সন্ধ্যা ছ’টার পর বহিরাগত কোনো ব্যক্তি বা যানবাহন প্রবেশই করতে পারবে না, এমনকি সেখানকার অধিবাসীদেরই আসতে যেতে পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। হাতিরঝিলে রাত আটটার পর কেউ অবস্থান করতে পারবেনা। আর গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকার নাগরিকদের রাত আটটার মধ্যে তাদের এলাকায় ফিরে আসতে হবে। আর এসব এলাকার অধিবাসী নন এমন কাউকে এসব এলাকায় যেতে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ বলছে সন্ধ্যা ছ’টার পর সব পানশালা বন্ধ থাকবে। এসব নিয়মের ব্যত্যয় হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

সুশৃঙ্খলভাবে নগরবাসী আনন্দ উপভোগ করেছে: পুলিশ

ঢাকা মহানগর পুলিশের অনলাইন পোর্টাল ডিএমপি নিউজে পুলিশ কমিশনার মোহা: শফিকুল ইসলামের বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। রাতেই বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে গুলশান-২ চত্বরে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “ঢাকা শহরের যেসমস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপিত হয় প্রায় সমস্ত জায়গা আমরা ঘুরে দেখেছি। প্রতিটি স্থানেই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে নগরবাসী এই নববর্ষের আনন্দ উপভোগ করছেন”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “মানুষ যাতে নিরাপত্তার ভেতরে থেকে আনন্দটা উপভোগ করতে পারে সেই উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছি। মানুষকে তাদের স্বাভাবিক আনন্দ থেকে বিরত রাখতে আমরা হস্তক্ষেপ করছি না। খোলা স্থানে যাতে কোন অনুষ্ঠান না করে সেই অনুরোধ করছি”।

পুলিশের প্রকাশিত ওই নিউজের সাথে কর্মকর্তাদের নিয়ে পুলিশ কমিশনার নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে কেক কাটছেন তেমন একটি ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে।

(বিবিসি, ঘাটাইলডটকম)/-

Recent Posts

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

Adsense

Doctors Dental

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

বিভাগসমূহ

পঞ্জিকা

July 2020
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Adsense