নিপীড়নের শিকার ঘাটাইলের রত্নগর্ভা পরিবার

এমন পরিবার সচরাচর দেখা যায় না। রিকশাচালক আব্দুর রাজ্জাক ও গৃহিণী জোছনা বেগমের দুই ছেলেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। বড় ছেলে জুয়েল মিয়া পড়েন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, অর্থনীতিতে চতুর্থ বর্ষে। ছোট ছেলে আলমগীর হোসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এই দম্পতির একমাত্র মেয়ে মীম পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। রাজ্জাকের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার রতন বরিষ গ্রামে। কিন্তু প্রতিনিয়ত নিজ বংশধরদের দ্বারা শারীরিক, মানুষিক অত্যাচারে শিকার হচ্ছে পরিবারটি।

কিছুদিন পরই এই পরিবারে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আসবে, এমনটাই মনে করেন স্থানীয়রা। রিকশাচালক রাজ্জাক ও তার স্ত্রীও বিশ্বাস করেন, অচিরেই কেটে যাবে তাদের দুঃখ-কষ্টের দিন। তাদের দীর্ঘ কষ্টের জীবন যখন শেষের পথে, ঠিক সেই সময়ে শান্ত-সভ্য এই পরিবারের সদস্যদের ওপর অবর্ণনীয় নিপীড়ন চাপিয়ে দিয়েছে রাজ্জাকের বংশের কয়েকজন ‘সন্ত্রাসী চরিত্রের’ লোক। রাজ্জাকের দুই চাচাতো ভাই রফিক ও গফুর প্রতিনিয়ত তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালাচ্ছে। ঈদের পরদিনও তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে তারা। জোছনা বেগমকে বেদম মারধর করা হয়। তিনি এখন হাসপাতালে ভর্তি। রাজ্জাকের পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

ক্ষোভ প্রকাশ করে জুয়েল বলেন, ‘দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, আর পারছি না। এভাবে নীরবে অত্যাচার সহ্য করে গেলে একদিন ওরা আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে।’ কথাগুলো বলার সময় ভয় আর অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে জুয়েলের চোখেমুখে।

তিনি বলেন, তিন ভাইবোনের পড়ালেখার খরচ জোগানো রিকশাচালক বাবার পক্ষে মোটেও সহজ ছিল না। স্কুলজীবন থেকেই সংগ্রাম করে বড় হয়েছেন তারা। এ সংগ্রাম দু’মুঠো ভাত আর লেখাপড়ার খরচ জোগানোর জন্য। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে হাতে এক মাস সময় পেতেন। সেই সময় কখনও ইটের ভাটায় আবার কখনও মাঠে কাজ করতেন দুই ভাই।

তিনি বলেন, ‘আমাদের বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় হচ্ছে মা-বাবার স্বপ্ন। তবে প্রতিনিয়তই আমাদের নিয়ে দুঃস্বপ্নের মধ্যে থাকেন বাবা-মা।’

জুয়েল জানান, রফিক ও গফুর কিছুদিন আগে তাদের গাছ কেটে নিয়ে যায়। এ নিয়ে থানায় জিডি করলে বেড়ে যায় অত্যাচারের মাত্রা। বিরোধের কারণ সম্পর্কে জুয়েল জানান, রফিক ও গফুরদের বাড়ির সামনে দিয়ে তাদের যাতায়াতের রাস্তা। তারা মাঝে মাঝে রাস্তায় লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এবার ভয়ে তারা ঈদের নামাজ পড়তেও যেতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘আমরা দু’ভাই উচ্চশিক্ষিত হচ্ছি। তাই তারা প্রতিহিংসায় এ ধরনের কাজ করে যাচ্ছে। ভার্সিটি ছুটি হলেও অনেক সময় আমরা বাড়ি আসি না, ক্যাম্পাসেই পড়ে থাকি। এখন আমাদের পুরো পরিবার মৃত্যুভয়ে দিন কাটাচ্ছে।’

জুয়েল বলেন, ‘আলোর পথে রতন বরিষ’ নামে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ঈদসহ যে কোনো ছুটিতে বাড়ি এলে তারা ক’জন বন্ধু মিলে সংগঠনের ব্যানারে সামাজিক সচেতনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এবার ঈদের পরের দিন বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কুইজ, শিশু, বৃদ্ধ ও যুবকদের বিভিন্ন খেলার আয়োজন করেছিলেন। অনুষ্ঠান চলার সময় জানতে পারেন, বাড়িতে এসে রফিক ও গফুররা তার মাকে পিটিয়ে ফেলে রেখে গেছে। পরে তারা তার মাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেও বাধা দেয়। পরের দিন সকাল থেকেই তারা জুয়েলদের বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে থানা থেকে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।

জুয়েল বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে আমরা বাড়ি আসার পর থেকেই তারা আমাদের মারার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এ কারণে ঈদের আগের দিন একমাত্র ছোট বোনকে খালার বাড়ি পাঠিয়ে দিই। অনেক দিন পর পর দুই ভাই বাড়ি আসি। মা-বাবা ও একমাত্র বোনকে নিয়ে ঈদের আনন্দও করতে পারিনি। চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও এর সমাধান দিতে পারছেন না।’ জুয়েল জানান, তিনি এ নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে জুয়েলের বাবা বলেন, ‘আমি জীবনে স্কুলে যাই নাই। আমার পোলা দুইডা ভার্সিটিতে পড়ে। ওরা মনে হয় পোলা দুইডারে বাঁচতে দেবে না।’

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জুয়েলের মা বলেন, ‘আমার স্বামী ও ছেলেরা বাড়িতে থাকে না। বিভিন্ন সময়ে রফিকুল ও গফুর আমাকে মারতে আসে এবং সবার সামনে হুমকি দেয়। ওরা বলে, আমাকে ও আমার ছোট্ট মেয়েকে ধর্ষণ করবে।’

বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য রফিক ও গফুরের বাড়ি গেলে তাদের পাওয়া যায়নি। আশপাশের লোকজন জানান, পুলিশের ভয়ে হয়তো তারা গা-ঢাকা দিয়েছে। তারা দু’জনই সন্ত্রাসী চরিত্রের লোক। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘আব্দুর রাজ্জাকের দুটি সন্তান যেন দুটি রত্ন। রফিক ও গফুর কোনো মীমাংসাই মানে না। ওরা রাজ্জাকের স্ত্রীকেও পিটিয়েছে। তাই জুয়েল ও আলমগীরকে বলেছি তোমরা আইনের আশ্রয় নাও। আমি তোমাদের সার্বিক সহযোগিতা করব।’

ঘাটাইল থানার ওসি মাকসুদুল আলম বলেন, ‘এটা তাদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ। অভিযোগ পেয়েছি, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

(মাসুম মিয়া, ঘাটাইলডটকম)/-