নারীর ক্ষমতায়নে গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি প্রয়োজন

নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় নানা উদ্যোগের মধ্যে ঘরের ‘গৃহস্থালি কাজ’ নিয়ে নারীর অস্বস্তি কাটেনি। ঘরের কাজের স্বীকৃতি না মেলার কারণে শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারীরা। নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ঘরের কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন না থাকায় নারীদের প্রতিনিয়ত হেয় হতে হয় পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে। আর এই কাজের স্বীকৃতি কীভাবে আসবে প্রশ্নে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিভিন্ন শিক্ষা অনুযায়ী গড় মজুরি কত সেটি বিবেচনায় নিয়ে ঘণ্টাভিত্তিক বিকল্প মূল্য নির্ধারণ করা যায়। এই কাজটিকে কাজ মনে করতে হবে এটিই প্রধান কথা।

‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর প্রধান নির্বাহী শাহীন আনাম বলেন, সব কাজেরই তো মূল্য আছে। তাই নারীর গৃহের কাজের একটা মূল্য নির্ধারণ করা দরকার। নারীর অস্বীকৃত কাজের মূল্য জিডিপিতে ঢোকানো দরকার। জিডিপিতে যদি না-ও নেয়া হয়, তাহলেও এর একটা মূল্য নির্ধারণ করা দরকার।

একজন নারী যদি গৃহে এই কাজ না করতেন, তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে এই কাজটা করাতে হতো তখন সেটার মূল্যে কত হতো? আমরা ১৩ হাজার নারীর উপর গবেষণা করে দেখেছি, বাংলাদেশে নারীরা কাজ করে যে মূল্য পান আর গৃহে কাজ করে যে নারীরা মূল্য পান না, সেটার হিসাব করে দেখেছি৷ ঘরের কাজের জন্য বাইরের কাজের সম পরিমাণ মূল্য দেয়া হলে তিনগুণ মূল্য পেতেন নারীরা। জানান শাহীন আনাম।

এটা নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর বিস্তারিত রিপোর্ট আছে। তারা ২০১০ সালে একটা গবেষণা করেছে, আবার ২০১৩ সালে আরেকটা করেছে। সেখানে সর্বশেষ দেখা গেছে, ৬৫ ভাগ নারী কোনো-না-কোনোভাবে গৃহে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এক্ষেত্রে ভূমিকা সবচেয়ে বেশি পরিবারের৷ পরিবার থেকেই যদি বুঝতো নারীর মূল্য কত, তাহলে তারা সম্মান দেখাতো। আমার বিশ্বাস, গৃহ কাজের স্বীকৃতি হলেই নারীর প্রতি সহিংসতা কমবে।

এখানে পরিবারের পাশাপাশি সমাজের একটা দায়িত্ব আছে, রাষ্ট্রেরও একটা দায়িত্ব আছে৷

গৃহস্থালি ও কেয়ারগিভিং

পরিবারে গৃহস্থালি ও কেয়ারগিভিং (প্রতিপালন ও সেবা দেওয়া) এই দুই ধরনের কাজ থাকে। ঘর পরিষ্কার রাখা, টেবিলে যার যার পছন্দ অনুযায়ী খাবার দেওয়া, বাসন মাজা, কাপড় ধোয়া, বাচ্চার স্কুল পরীক্ষার কাজগুলোকে গৃহস্থালি কাজ এবং সন্তান লালন পালন, পশুপাখি দেখভাল ও পরিবারের বয়স্কদের সেবা দেওয়ার কাজকে সেবামূলক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দুই কাজকেই নারীর কাজ হিসেবে সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছে।

ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের একটি গবেষণা বলছে, ৮১ শতাংশ নারী সরাসরি গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত থাকেন। অন্যদিকে, পুরুষ করেন মাত্র ১.৩ শতাংশ। যেখানে ১৯ শতাংশ নারী চাকরির সঙ্গে যুক্ত সেখানে ৯৮ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ কোনও না কোনও নিয়মিত বা অনিয়মিত চাকরিতে নিয়োজিত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তৈরি পরিসংখ্যান বিষয়ক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় সাড়ে তিনগুণ বেশি মজুরিবিহীন কাজ করেন এ দেশের নারীরা।

গৃহস্থালি কাজও একটি কাজ: দরকার সেই স্বীকৃতি

মা কী করেন জানতে চাইলে ঘরের বাইরে কাজ করেন না এমন মায়েদের সন্তানদের উত্তর থাকে ‘কিছু করেন না’। অথচ তার মা গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি তার পড়ালেখার যাবতীয় দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে গৃহস্থালি কাজ যে কাজ সেই স্বীকৃতিটাই সবার আগে দরকার বলে মনে করছেন নারী অধিকারনেত্রী ও উই ক্যান-এর সমন্বয়ক জিনাত আরা হক।

তিনি বলেন, স্বীকৃতি নেই সেটি একটা কারণ, তবে এটাই একমাত্র কারণ নয়। মনে করা হয় গৃহস্থালি কাজ মেয়েদের কাজ, সেই জায়গা থেকে সরে আসতে হবে। এটি এমন একটি কাজ যেটি আনন্দদায়ক না, বেতন পান না, সম্মানও পান না। সেটা যখন নারী করতে বাধ্য হচ্ছে তখন অবশ্যই হেয় বোধ করবে। নির্যাতনের বড় কারণ সিস্টেমের মধ্যে এটা এমনভাবে রেখে দেওয়া হয়েছে, মেয়েটা চাইলেও তার সামনে ‘বিকল্প’ নেই। কেবল গৃহস্থালি কাজ বলছি বটে কিন্তু এরসঙ্গে বাসার শিশু ও বয়স্কদের দেখভালের কাজটিও আছে। ছেলেরা বাড়ির কাজ না করে দিব্যি বাইরে চলে যেতে পারে কিন্তু নারী তার ঘর, ঘরের শিশু, বৃদ্ধ মানুষ, পশুপাখি ফেলে রেখে যুদ্ধেও যেতে পারেননি। যদি তার ঘরের কাজকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া হয় তাহলে সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্মানের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এমনকি স্বামীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক নিয়েও সে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) অর্থনীতি গবেষক নাজনীন আহমেদ বলেন, এ কাজে নারী পুরুষের অংশগ্রহণের অসমতা আছে, সেটি চিহ্নিত করতে হবে। কাজটি দুজনেরই করা কর্তব্য। যে কাজটি নারীরা করে সেটি যদি সে বাইরে করতো তাহলে সেটা থেকে মোট কত আয় হতো সেই হিসাব ধরে সার্বিক হিসাব পাওয়া সম্ভব। তবে সেটি জিডিপিতে যোগ করার সুযোগ নেই।

গৃহস্থালি কাজ মূল্যায়নের বিকল্প পথ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘টাইম ইউজড সার্ভে’ মতে, ১৫ বছরের বেশি বয়সী কর্মজীবীদের মধ্যে ঘরের বিভিন্ন কাজে পুরুষ দৈনিক ১ দশমিক ৪ ঘণ্টা এবং নারী ব্যয় করেন ৩ দশমিক ৬ ঘণ্টা। কর্মজীবী না হলে গড়ে নারীরা দিনে ৬ দশমিক ২ ঘণ্টা এবং পুরুষ ১ দশমিক ২ ঘণ্টা এ ধরনের কাজে ব্যয় করেন।

এই কাজের বিকল্প মূল্যায়ন দরকার কিন্তু জিডিপিতে সেটি যুক্ত করার বাস্তবতা নেই উল্লেখ করে বিআইডিএস-এর গবেষক নাজনীন আহমেদ বলেন, জিডিপির সংজ্ঞায় আছে, এমন এমন সেবা অন্তর্ভুক্ত যেগুলো টাকার মাধ্যমে লেনদেন হয়। গৃহস্থালি কাজ তেমন না। তবে মজুরিহীন গৃহস্থালি কাজকে অবশ্যই স্বীকৃতি  দিতে হবে। এবং সেটার বিকল্প মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আনপেইড ফ্যামিলি ওয়ার্কের ৮০ শতাংশই মেয়েরা করে ঠিকই কিন্তু স্বীকৃতি চাওয়ার সময় কখনোই বলবে না নারীর কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে। স্বীকৃতি পাবে কীভাবে প্রশ্নে তিনি বলেন, বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ দরকার। সেটি ঘণ্টাভিত্তিক মূল্যায়ন হতে পারে। গৃহস্থালি কাজে কত ঘণ্টা সময় যায়। সেই শ্রমঘণ্টাটা যদি ব্যক্তি বাইরের উৎপাদনশীল কাজে দিতেন তাহলে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী কত আয় হতো সেটি নির্ণয় সম্ভব। একজনের সঙ্গে আরেকজনেরটা তুলনা হবে না। কেননা, শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে তার আয় কত হতো সেটা ঠিক করা হবে।

স্বীকৃতির অভাবে নারী মানসিক শারীরিক নির্যাতন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জরিপ বলছে, ৬৫ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন, ৩৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক এবং ৫৩ শতাংশ স্বামীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

জরিপে আরও বলা হয়, অধিকাংশ নারীকেই তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়তে বাধ্য হতে হয়েছে।

ব্র্যাকের নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধী উদ্যোগ প্রকল্পের পরিচালক নবনীতা চৌধুরী বলেন, এই যে সংসারের শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের খাবার, ওষুধ, কাপড়চোপড় ঠিক করে রাখা থেকে সবাইকে ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠিয়ে ঠিক সময়ে তৈরি করে ঘর থেকে বের করা- এই যে একটি মানুষ একা এতগুলো মানুষের সব দায়িত্ব একা হাতে সামলাচ্ছেন, এই বিশ্রাম এবং বিরামহীন উদয়াস্ত পরিশ্রমটাই একটা মানসিক নির্যাতন। তার ওপর এই কাজের ভাগ যেমন কেউ নেয় না, তেমনি এর কোন স্বীকৃতি দেওয়ারও কেউ প্রয়োজন বোধ করেন না, এমনকি ধন্যবাদটুকুও নয়। মায়েরা করেছেন, তাই বোনেরাও করবেন, স্ত্রীরাও করবেন, বিষয়টা এমন আর কী। আর বাড়ির বাকি সদস্যরা শুধু ডিম পোচের কুসুম কেন ভাঙল, শার্টের কলারে ময়লা কেন থাকলো, ওই বাসার ভাবি নিয়মিত দাওয়াত খাওয়ান, আমাদের বাড়িতে কেন হয় না এসব অভিযোগ করতে থাকবেন।

সকলের জন্য পাঠ্যসূচিতে আসুক গৃহব্যবস্থাপনা

কেবল নারীদের জন্য গার্হস্থ্যশিক্ষা স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করার ফলে সে সময়েই ছেলেদের মানসিকতায় রোপণ হয়: ঘরের কাজ মেয়েদের। ছোটকাল থেকেই যদি শেখানোর ধরন ভিন্ন হয় তাহলে দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক নাজনীন আহমেদ বলেন, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ ছেলেদের জন্য নেই। যেটা করা দরকার, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে গার্হস্থ্য অর্থনীতি গৃহব্যবস্থাপনা নাম দিয়ে ছেলেমেয়ে উভয়কে পড়াতে হবে। ছোটবেলা থেকে এসব নারীদের কাজ হিসেবে আলাদা করে শিখিয়ে, মাঝবয়সে এসে এই কাজ সবার বললে তা কে শুনবে।

ব্র্যাকের নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধী উদ্যোগ প্রকল্পের পরিচালক নবনীতা চৌধুরী বলেন, সংসারের কাজ ভাগ করে নিলে যে শুধু নারীর নয়, পুরো পরিবারের মানসিক শান্তি বাড়ে, সেটাও এখন আবার অনেকে বুঝতে পারছেন। কারণ, তখন ওই কাজগুলো করার কষ্ট আর গুরুত্বটা বোঝা যায়। নারী এই কাজগুলোর ভার একা বয়ে বেড়ানোর কষ্ট বা তার কষ্ট কেউ বুঝতে পারছেন না এই মানসিক বেদনা থেকে মুক্ত হন। পুরো পরিবারের একসঙ্গে কাটানোর মতো ‘কোয়ালিটি টাইম’ বাড়ে। কিন্তু, দুঃখের বিষয়, এখনও আমরা সেই সুখের ব্যবস্থা না করে সব কাজ একজনকে দিয়ে করিয়ে বরং যিনি করছেন তার ভুল আর খুঁত ধরতে ব্যস্ত থাকছি। তাতে একজনকে মানসিক নির্যাতন করছি কিন্তু আসলে পুরো পরিবারের মানসিক শান্তি আর বিশ্বাস-ভালোবাসার সম্পর্কটাও নষ্ট করছি।

(বাংলাট্রিবিউন, ঘাটাইলডটকম)/-