নাগরপুরে ঘুষে মিলে কৃষি ঋণ

নাম পরশ আলী। তিনি টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার মামুদনগর ইউনিয়নের চামটা গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বপ্ন ছেলেকে বিদেশ পাঠাবেন। কিন্তু তার হাতে ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর টাকা নেই। তাই তিনি বিভিন্ন লোকজনের পরামর্শে কৃষি ব্যাংক নাগরপুর শাখায় যোগাযোগ করেন। সেখানে গিয়ে যানতে পারেন কৃষি খাত ছাড়া কোন ঋণ দেয়া হয় না। তাই বাধ্য বাড়ি ফিরে আসেন পরশ আলী।

পরদিন আবার যান কৃষি ব্যাংকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিতে। সেখানে গিয়ে মাঠ কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন ও ব্যবস্থাপক মুহম্মদ মিজানুর রহমানের সাথে পরামর্শ করেন। ওই সময় মাঠ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক তাকে গাভী পালনের জন্য দুই লাখ টাকা ঋণ ব্যবস্থা করে দেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন। বিনিময়ে ঋণ বাবদ (সরকারি খরচ বাদ দিয়ে) তাদের দিতে হবে ১১ হাজার টাকা।

এতেই রাজি হয়ে যান পরশ আলী। পরবর্তীতে পরশ আলী সকল কাগজপত্র তৈরি করে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ১৫ মাস আগে ছেলেকে সৌদি আরব পাঠান।

একই গ্রামের ওয়াজেদ মিয়া। তিনি বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ধার-দেনা করে মেয়েকে বিয়ে দেন। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই পাওয়ানাদাররা তার কাছে ধার দেয়া টাকা ফেরত চান। কিন্তু টাকা না থাকায় পাওয়ানাদারদের বার বার ফিরিয়ে দিয়েছেন ওয়াজেদ।

পরে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে কৃষি ব্যাংক নাগরপুর শাখায় যোগাযোগ করেন ঋণ নেয়ার জন্য। পরে ব্যাংকের মাঠ কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন তাকে জানায়, ঋণ নিয়ে আপনি যা ইচ্ছে তাই করেন। কিন্তু আপনাকে গাভি পালনের উপর দুই লাখ টাকা ঋণ নিতে হবে। একথা শুনেই ওয়াজেদ রাজি হয়ে যান।

পরবর্তীতে সকল প্রক্রিয়া শেষ করে ঋণ গ্রহণের সময় ওয়াজেদকে দুই লাখ টাকার স্থলে এক লাখ ৮৬ হাজার টাকা দেয়া হয়।

এ সময় ওয়াজেদ ১৪ হাজার টাকা কম দেয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে বেলায়েত হোসেন তাকে জানান, দুই লাখ টাকা ঋণ নিতে হলে সরকারি খরচ বাদ দিয়ে অতিরিক্ত ১৪ হাজার টাকা স্যারকে (ব্যবস্থাপক) দিতে হবে।

এ সময় তার টাকার দরকার থাকায় আর কথা বাড়াননি। পরে তিনি সেই ঋণ নেয়া টাকা দিয়ে পাওনাদারদের ধার-দেনা শোধ করেন।

সরেজমিন নাগরপুর উপজেলার মামুদনগর ইউনিয়নের চামটা গ্রামে গেলে কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া ভুক্তভোগীরা এসব অভিযোগ করেন।

ওই এলাকার মান্নান মিয়া জানান, তিনি ঋণগ্রস্থ হওয়ায় কৃষি ব্যাংক নাগরপুর শাখায় যান এক লাখ টাকা কৃষি ঋণ নেয়ার জন্য। পরে ব্যাংকের মাঠ কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন তাকে জানায়, ঋণ নিতে হলে লাখে সরকারি ফি ছাড়াও আট হাজার টাকা ঘুষ দিতে হবে। তা না হলে ম্যানেজার ঋণ পাশ করবে না। পরে তিনি বাধ্য হয়ে আট হাজার টাকা দিয়ে এক লাখ টাকা ঋণ নেন।

একই গ্রামের সেলিম মিয়া জানান, তিনিও বাধ্য হয়ে সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত ১২ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। তবে তিনি ছাড়াও পরশ আলী ও হযরত আলী ঋণ নেয়ার পর ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মুহম্মদ মিজানুর রহমান ও মাঠ কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দূর্নীতি দমন কমিশনসহ (দু’দক) বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

একই এলাকার শাহজাহানের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ দেয়ার জন্য ১৪ হাজার টাকা, লুৎফর রহমানকে ১৪ হাজার টাকার বিনিময়ে দুই লাখ টাকা, শাহাদৎ হোসেনের কাছ থেকে ১৪ হাজার টাকার, বুদ্দু মিয়ার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা, সোনা মিয়ার কাছ থেকে ১১ হাজার টাকা, হযরত আলীর কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে দুই লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে।

এছাড়া মিলন মিয়ার কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা, ছানোয়ারের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা, আফজাল মিয়ার কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা, ইদ্রিস আলীর কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা, লালন মিয়ার কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং মান্নান মিয়ার কাছ থেকে আট হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে এক লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়।

ব্যাংকের মাঠ কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন জানান, তিনি কারো কাছ থেকে ঋণ দেয়ার কথা বলে সরকারি ফি’র বাইরে কোন অতিরিক্ত টাকা নেয়া হয়নি। যারা সব মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মুহম্মদ মিজানুর রহমান জানান, ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে ৬৪৩ জনকে নয় কোটি ১১ লাখ এক হাজার টাকা এবং ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে এ পর্যন্ত ৬০ জনকে ৬৫ লাখ ৫৭ হাজার টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। তবে এসব ঋণ দেয়ার সময় কারো কাছ থেকে সরকারি ফি ছাড়া কোন প্রকার অতিরিক্ত টাকা নেয়া হয়নি বলেও তিনি জানান। এছাড়া ব্যাংকের কেউ যদি অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক মুখ্য আঞ্চলিক কার্যালয়ের টাঙ্গাইল (দক্ষিন) ব্যবস্থাপক কে এম হাবিব-উন-নবী জানান, ঘুষের বিনিময়ে ঋণ দেয়ার বিষয়টি তিনি এখন পর্যন্ত জানেন না। কেউ যদি কোন অভিযোগ করেন তাহলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম)/-