দেশের ৯৪ ভাগ মানুষ মানসিক রোগে ভুগছেন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, বর্তমানে দেশে শতকরা ৯৪ ভাগ মানুষ মানসিক রোগে ভুগছেন। তবে তারা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে চিকিৎসকের কাছে যান না। এটি একটি উদ্বেগের বিষয়। এছাড়া বর্তমান জরিপ অনুযায়ী দেশে ১৭ ভাগ মানসিক সমস্যাগ্রস্তের মধ্যে ১৩ ভাগই শিশু। আর তাই সরকার দৈহিক স্বাস্থ্যের ন্যায় মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সমান গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার (০৭ নভেম্বর) ঢাকার কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন বাংলাদেশের অডিটোরিয়ামে ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ, বাংলাদেশ: ২০১৮-১৯’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জরিপটি অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে দেশের সাধারণ জনগণ এখনও কুসংস্কারমুক্ত নয়। তাদের ধারণা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করলে মানুষজন তাদের পাগল বলতে পারে। যে কারণে এ সংক্রান্ত ৯৪ শতাংশ রোগী চিকিৎসার আওতায় আসে না। এর ফলে বহুসংখ্যক মানুষ মানসিক সমস্যা নিয়েও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার চেষ্টা করে। এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়।

তিনি বলেন,বাংলাদেশে বর্তমানে দুইশত জন সাইকিয়াট্রিস্ট রয়েছেন যা বিশাল জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য রোগের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য খুবই অপ্রতুল। বর্তমানে দেশের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুও মানসিক স্বাস্থ্যজনিত রোগে ভুগছে। এর জন্য আমাদের এখন থেকেই কাজ করতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে এ সমস্যা আরও বেড়ে যাবে। প্রায় ১৮ বছর পর বাংলাদেশে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ আবার সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে আমাদের পলিসি তৈরি করতে আরও সুবিধা হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নেলসন মেন্ডেলার ‘No health without mental health’ উক্তিটি উল্লেখ করে বলেন, মন ভালো না থাকলে শারীরিক অবস্থাও ভালো থাকে না। আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আগে চাহিদা ছিল শারীরিক বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণের। এখন সে সমস্যা সমাধান হলেও নতুন করে বিভিন্ন নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস যেমন ক্যান্সার, কিডনির রোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা সমস্যা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আর এর সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে এই মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ, বাংলাদেশ: ২০১৮-১৯’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল।

অনুষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে উপস্থাপিত বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা চালু হয়নি। তুলনামূলকভাবে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি মানসিক সমস্যায় ভোগেন। তবে নারীরা এ ক্ষেত্রে চিকিৎসা গ্রহণ করতে চান না একেবারেই।

এছাড়াও দেশে প্রতি ১০০ জন শিশুর মধ্যে ১৩ দশমিক ৬ জন মানসিক সমস্যায় ভোগে। এর মধ্যে ছয়টি শিশু নিউরো-ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার, ৪ দশমিক ৫জন রাগান্বিত হয়ে, ২ দশমিক ৭জন না ঘুমিয়ে ও ৩ জন কাছের কোনো বন্ধু না পেয়ে এ সমস্যায় ভোগে বলে জানানো হয়।

২ হাজারের অধিক শিশুর ওপরে গবেষণা চালিয়ে দেখা যায়, গত ৩০ দিনে মানসিক সমস্যার কারণে ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু অকারণে স্কুলে যায়নি, ৭ শতাংশ বাবা-মা তাদের সন্তানদের পড়াশোনার খোঁজখবর নেননি ও ২ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর বাবা-মারা কোয়ালিটি টাইম দেননি। এছাড়া ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ শিশু চিকিৎসার আওতায় আসে না বলেও জানানো হয় গবেষণায়।

এছাড়াও বলা হয়, সর্বশেষ ২০০৫ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় ১৬ দশমিক ২ শতাংশ লোক মানসিক সমস্যায় ভোগেন। কিন্তু বর্তমানে দেশের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ লোক ভোগেন এই সমস্যায়। এক্ষেত্রে ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো চিকিৎসা ছাড়া থাকেন। আর ৫০ শতাংশ রোগী চিকিৎসক ছাড়া অন্যান্য মানুষের কাছে থেকে পরামর্শ নেন বলে জানানো হয় গবেষণায়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এএইচএম এনায়েত হোসেন, নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার রেজওয়ানুল করিম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. বর্ধন জং রানাসহ অন্যান্যরা।

(সারাবাংলা, ঘাটাইলডটকম)/-