দেলদুয়ারে তামাকের গ্রাম!

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দক্ষিণে ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী স্বল্পলারো গ্রাম। গ্রামটি উপজেলার লাউহাটী ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হলেও ধলেশ্বরী নদী গ্রামটিকে দু-ভাগে ভাগ করে রেখেছে। নদী পারাপার হয়ে গ্রামের দুপাশের মানুষ নিজেদের সাথে যোগাযোগ রাখে। গ্রামটি নদীর তীরে হওয়াতে রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে আবাদি জমিগুলো বেলেমাটিতে ভরা। ফলে এ গ্রামের জমিগুলো তামাক চাষের জন্য উপযুক্ত।

তামাক চাষের উপযোগি এখানকার কৃষি জমি ও কৃষকদেরকে কব্জায় নিয়েছে কয়েকটি টোবাকো কোম্পানী। তামাক চাষে জমি বা দেহের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে কোন ধারণা নেই কৃষকদের। ফলে গ্রামের পুরো আবাদি জমি ক্ষতিকারক তামাক চাষের দখলে।

গ্রামটি এখন “তামাকের গ্রাম” নামে পরিচিত। এ গ্রামের আবাদি জমিতে তামাক ছাড়া আর কোন শষ্য নজরে পড়েনা। পুরো গ্রামটি তামাক পাতার চাদরে ঢেকে আছে।

এখানকার সব বয়সের নারী-পুরুষ তামাক চাষের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত।

দেলদুয়ারের স্বল্পলারো গ্রামে গিয়ে কথা হল তামাক চাষীদের সাথে। কেন এই ক্ষতিকারক তামাক চাষে ঝুঁকছে কৃষক এমন অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এলো টোবাকো কোম্পানীর লোভনীয় সব অফার।

সরকারিভাবে তামাক চাষে নিষেধাজ্ঞা না থাকাটাও আরেকটি কারণ।

টোবাকো কোম্পানীগুলো কৃষকদেরকে বিনামুল্যে তামাকের বীজ দিচ্ছে। কেউ কেউ জানালেন বীজের সাথে সারসহ চাষ খরচ কোম্পানীগুলো বহন করছে। চাষীদের চাষ পদ্ধতির প্রশিক্ষণও দেয় টোবাকো কোম্পানী।

কৃষকরা জানালেন, অন্যান্য শষ্যের তুলনা কমপক্ষে তিনগুণ লাভ হয় তামাক চাষে। ফলে তামাক চাষের প্রতি সহজেই ঝুঁকছে কৃষক।

আশ্বিন মাসে তামাকের বীজ রোপন করতে হয়। প্রয়োজনীয় বীজ সময়মতো টোবাকো কোম্পানীগুলো সরবরাহ করে থাকে।

বেশ কয়েকবার পানি দিতে হয় তামাক চারাতে। প্রতিবার পানি দেয়া বাবদ শতাংশ প্রতি ১০ টাকা গুনতে হয় কৃষকদেরকে। ৫-৬ মাস সময় লেগে যায় তামাক চাষে। দীর্ঘ এই সময়ে দু-তিনবার সার দিতে হয় জমিতে। পুরো সময়টা তামাক চারা কৃষকের পরিচর্যায় থাকে। পানি, সার, বিষ আর মজবুত পাতা গজানোর জন্য মুকুল ভেঙে দেয়ার পর কীটনাশক প্রয়োগ।

এরপর শুরু হয় প্রক্রিয়াজাতকরণ। পরিপক্ক পাতাগুলো কেটে রোদে ঝুলিয়ে শোকাতে হয়। রোদের তাপে সবুজ পাতা লালচে হলে শুকনো পাতার বেল তৈরি করতে হয়।

এরপর কেজি প্রতি ৯০ থেকে ১২০ টাকা হারে দাম দিয়ে তামাক চাষীদের কাছ থেকে পাতাগুলো নিয়ে নেয় কোম্পানী। কোম্পানীর সাথে লেনদেনের জন্য ব্যাংকে রয়েছে কৃষকের নিজস্ব হিসাব নম্বর।

তামাক চাষের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে কোন ধারণা নেই তামাক চাষিদের। ফলে পুরো গ্রামের মানুষ তামাক চাষের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।

পলান খান, ২শ শতাংশ, শফিকুল ইসলাম ৩শ শতাংশ, মিনহাজ উদ্দিন ২শ শতাংশ এমনকি সাবেক ইউপি সদস্য বুদ্দু মিয়াকেও ৩শ’ শতাংশ জমিতে তামাক চাষ করতে দেখা গেল।

গ্রামে যাদের আবাদি জমি আছে সবাই তামাক চাষের সাথে সম্পৃক্ত। তামাক চাষে কৃষি অফিসের কোন নিষেধাজ্ঞা পায়নি চাষীরা । ফলে এ অঞ্চলে কৃষকরা তামাক চাষ বন্ধের পরিবর্তে সরকারি সহযোগিতার আশা করছে।

দেলদুয়ার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শোয়েব মাহমুদ বলেন, সরকারিভাবে তামাক চাষে নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে তামাক চাষে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়। সার বেশি দিতে হয়। জমির ক্ষতি, পরিবেশ দূষণসহ কৃষকের শারীরিক ক্ষতির কথা ভেবে তামাক চাষিদেরক কৃষি অধিদপ্তর তামাক চাষের প্রতি নিরুৎসাহিত করে থাকে।

তিনি জানান, তামাক ছাড়াও আরও অনেক ফসল আছে যা আবাদ করে তামাক চাষের চেয়ে বেশি লাভবান হওয়া যায় সে সকল ফসল চাষের প্রতি কৃষকদেরকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। দেলদুয়ারেও চাষিরা তামাক চাষের প্রতি শিগগিরই নিরুৎসাহিত হবেন বলে ধারণা করছেন উপজেলার এই কৃষি কর্মকর্তা।

(টাঙ্গাইল সংবাদদাতা, ঘাটাইলডটকম)/-

154total visits,1visits today