দুর্নীতির ১০ নম্বর মহা সতর্ক সংকেত!

এই মুহুর্তে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা ভাবছি না। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাটা জরুরী মনে করছি। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনা আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ গণমাধ্যম আমাদের সামনে নতুন নতুন কান্ড তুলে ধরছে। এমন ঘটনা জাতির জন্য অশুভ সংকেত।

দেশ যখন উন্নয়নের পথে সেই পথটি দুর্গম করছে কিছু কর্মকর্তা, কিছু সংগঠন। সরকার যেখানে দেশটাকে বিশ্বের একটি রোল মডেল করতে ব্যস্ত কিছু কর্মকর্তা সেখানে চেটেপুটে খাচ্ছে। যে যেভাবে পারছে সে সেভাবেই খাচ্ছে। দুর্নীতির শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে আমাদের নৈতিকতা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবকলীগের ওপর শুদ্ধি অভিযান করে যেভাবে প্রশংসিত হয়েছেন তদ্রুপ দুর্নীতিগ্রস্থ প্রত্যেকটি বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর শুদ্ধি অভিযান প্রত্যাশা করছে দেশের সাধারণ মানুষ।

কয়টা ঘটনা আমরা জানতে পারছি? আড়ালে থেকে যাচ্ছে অধিকাংশ ঘটনা। দুর্নীতি এখন পরিচিত একটি শব্দ। তৃণমুল থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত মিশে আছে দুর্নীতি। মন্ত্রীর কালো বিড়াল থেকে ছাত্রনেতা। কর্মকর্তা থেকে কর্মচারী অনেকেই জড়িয়ে যাচ্ছে দুর্নীতিতে। তৃণমুলে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ সেবা কেন্দ্র ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রে । এখানে রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি আর হয়রানী। দুর্নীতি রোধে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। অথচ সেই দুর্নীতি দমন কমিশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৪০ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহণের বিষয় আলোচনায় আসে। পুলিশ শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখবে। অথচ পুলিশ কনস্টেবল থেকে শুরু করে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অহরহ দুর্নীতির অভিযোগ।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক এবং পুলিশের এক ডিআইজির মধ্যে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করে দুজনেরই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। যাদের ওপর দুর্নীতি দমন করার দায়িত্ব রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণ দিচ্ছে সাধারণ মানুষের অবস্থানটি আজ কোথায় ?

আমাদের নৈতিকতার কতোটুকু অবক্ষয় ঘটলে রাষ্ট্রের সম্পদকে আমাদের সম্পদ না ভেবে নিজের সম্পদ ভাবতে পারি। “বালিশ থেকে পর্দা” একের পর এক এমন আলোচিত সব কান্ড আমাদের সামনে আসছে। প্রথম পর্যায়ে এটা নিয়ে বিস্মিত না হলেও এখন অনেকটাই আতঙ্কিত। একের পর এক ঘটনার পূণরাবৃত্তি কিভাবে ঘটছে? ভেবেছিলাম, এ পর্বটি অবক্ষয়ের মধ্যে কেটে গেলেও ভবিষ্যৎ পর্বটা হয়তো শুধরে যাবে। কিন্তু বিশ্বের শীর্ষ একহাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম না থাকায় আগামী প্রজন্মের অনিশ্চয়তা নিয়েও ভাবছি।

কর্মকর্তারা কিভাবে দায়িত্ব পালন করছে? এদের কাজের জবাবদিহিতা কতোটুকু? জবাবদিহিতা শূণ্যের কোঠায় না থাকলে তো এমন ঘটনা বারবার দেখতে হতো না। ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এখনি। দেশটাকে বাঁচাতে হলে কাজের জবাবদিহিতা প্রয়োজন। প্রয়োজন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ।

২০১২ সালের রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের সাথে হলমার্ক গ্রুপের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির খবর শুনে ভেবেছিলাম, সময় হয়েছে শুধরে নেওয়ার। অথচ ২০১৩ সালের আগস্টে জামিন পান হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম। অবাক হলাম ৬ বছর পার হলেও এক টাকাও ফেরত পায়নি ব্যাংকটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা রাখা সোনা, শংকর ধাতুর হওয়ার সংবাদ অস্বাভাবিক মনে হয়নি। ২২ ক্যারেটের সোনা ১৮ ক্যারেট হয়ে যাওয়াটাও মেনে নিয়েছি। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল র্পযন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রতিবেদনটি দিয়েছিল সরকাররে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর।

দিনাজপুরের বড়পৃুকুরিয়ার কয়লার খনি থেকে দেড় লাখ টন কয়লা গায়েব হলো। কতোটুকু উদাসিন থাকলে ১৩ বছরেও কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে না। তদন্তেও কোন নথিপত্র মেলেনা অথচ কয়লার অভাবে খনিটির পাশে বন্ধ হওয়া ৫২৫ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করতে কয়লা আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

পাবনার রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায় প্রকল্প কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের থাকার জন্য গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীতে প্রতিটি বালিশ কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। আর বালিশ ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা। রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, বিছানা ও ওয়াড্রোব ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে আকাশ ছোঁয়া।

এরপর গণমাধ্যমে উঠে এসেছে কৃষি খামার থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকার ১২৯ মট্রিক টন ধানের বীজ পাচারের অভিযোগ। ঝিনাইদহের মহশেপুর উপজেলার দত্তনগর কৃষি খামারের তিন উপপরিচালকসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কর্মকর্তারা অতিরিক্ত বীজ উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ম অনুযায়ী মজুত ও কাল্টিভেশন রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করেননি। এমনকি অতিরিক্ত কোনো বীজ পাঠানোর কোনো চালান বা তথ্য প্রমাণ খামারে রাখেননি ।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে আইসোলেশন কক্ষের পর্দা । একটি আমেরিকার তৈরি ভিএসএ অনসাইড অক্সিজেন জেনারেটিং পাঁচ কোটি ২৭ লাখ টাকা। মেসার্স অনিক ট্রেডার্স ৫১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার বিভিন্ন ধরণের ১৬৬টি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। প্রতিটি যন্ত্র ক্রয়ে অধিক মূল্য দেখানোর কারনে ২০১৭ সালের ১ জুন অনিক ট্রেডাসের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে এটি রীট করে। আর্থিক ঘাপলার অভিমত ব্যক্ত করে হাইকোর্ট দুদককে তদন্তের দায়িত্ব দেয়।

খাগড়াছড়ির ৬-আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) ঘর মেরামতের কাজে দুই বান টিনের দাম ১৪ লাখ টাকা দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। যা মূল্যের তুলনায় ১০০ গুণেরও বেশি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’র এক প্রতিবেদনে এমন খবর প্রকাশ হয়েছে। মেরামত শুরুর ২০ দিনের মধ্যেই বাজেটের ৭১ লাখ টাকা তুলে নেয়। অথচ মেরামত কমিটির সদস্য সচিবের দেয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থেকে জানা যায়, চার মাসে মাত্র ১৫ ভাগ কাজ হয়েছে।

গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে , পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পে ১০ কোটি টাকা মূল্যের কমপ্রেসড এয়ার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিএএমএস) সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪৬ কোটি টাকা। রক্ষণাবেক্ষণের নামে ওই টাকার বেশির ভাগই লুটপাট হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির সদস্যরা।

এ থেকে বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লুটপাট হচ্ছে । দুর্নীতির অবস্থা শীর্ষ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের থেকে তৃণমুলে ছড়িয়ে পড়েছে মহামারীর মতো। এর ফলে অর্থনীতির একেবারে নিচের স্তর পর্যন্ত দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন হয়েছে। এ ধরনের ‘দুর্নীতি, দলবাজি, স্বজনপ্রীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ঠেকানো না গেলে সামনে দূর্দিন।

আগামীর জন্যও বর্তমান প্রজন্ম প্রস্তুত হচ্ছে না। জড়িয়ে যাচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ে। অন্ধকারে আচ্ছাদিত হচ্ছে ওদের ভবিষ্যত। যদিও গত ৮ই সেপ্টেম্বর পুলিশ মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাভেদ পাটোয়ারি কিশোর গ্যাং কালচার গড়ে উঠতে না পারে, সে ব্যাপারে পুলিশ সুপারদের তৎপর থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। মারধর, চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে এসব গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, অ্যাডভেঞ্চার বা ক্ষমতা দেখানোর লোভ, মাদক, বন্ধুদের পাল্লায় পড়াসহ নানা কারণে কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে।

সবশেষে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে ৮৬ কোটি টাকা চাঁদা চাওয়ার অভিযোগটি স্পষ্ট করে দিয়েছে আমাদের ছাত্রসমাজ চারিত্রিকভাবে কতোটা অবক্ষয় হয়েছে। এছাড়া ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে সহপাঠীদের হাতে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মৃত্যু ছাত্রছাত্রীদের নৈতিক অধঃপতনের শেষ ধাপ বলা যেতে পারে। কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ লোভনীয় মনোভাব এবং বর্তমান ছাত্রছাত্রীর অধঃপতন জাতির জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক সংকেত। পুরো জাতিকে সুরক্ষিত রাখতে আমাদেরকে দ্রুত এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

(লেখক: রেজাউল করিম, সংবাদকর্মী/ ঘাটাইলডটকম)/-