দিল্লী, তাজমহল ও মাথুরা ভ্রমণ

পেহেলগাম থেকে আমরা শেয়ারিং জীপে জম্মু আসতেছিলাম। দূরত্ব ২৮০ কিলোমিটার প্রায়। আসার সময়ে টের পেয়েছি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কতটা উপরে ছিলাম গত পাঁচদিন।

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা, রাস্তার ধারেই আপেল আর আলুবোখারার গাছ।

পাহাড়ের গা বেয়ে পিঁপড়ার মতো ধীরেধীরে নেমে আসা!

আগে এসব রাস্তা রিস্কি থাকলেও এখন অনেক নিরাপদ। পাহাড়ধ্বস হয় খুবই কম। ড্রাইভাররা খুবই দক্ষ। এরা হর্ণ বাজায় না বললেই চলে।

মাঝে মাঝে ব্রেক দিলে স্থানীয় হকাররা আপেল/আলু বোখারা নিয়ে আসে।

পথে পড়ে নেহরু টানেল, প্রায় ৯ কিলোমিটার লম্বা।

এসব দেখতে দেখতে ৭/৮ ঘন্টা পর যখন জম্মু রেলস্টেশন আসলাম তখন মনে হচ্ছিলো জান্নাত থেকে কোন একটা অপরাধের জন্য আল্লাহ্‌ শাস্তি হিসেবে দুনিয়ায় না পাঠিয়ে ডাইরেক্ট জাহান্নামে পাঠিয়ে দিছেন।

জম্মুর নোংরা রেলস্টেশন, তারচে নোংরা বাথরুম।

তাছাড়া কাশ্মীরের নায়ক-নায়িকাদের দেখতে দেখতে চোখ এমন এলিট হইছে যে, জম্মুর প্রায় সব মানুষকেই তেলেগু সিনেমার সাইড ভিলেন লাগতেছিলো।

লোকজন সমানে গাজা খাচ্ছে। সবার চোখই লালচে। প্রচুর মদের দোকান। সাথে ছোট বড় মন্দির।

জম্মু থেকে “শালিমার এক্সপ্রেস”-এ আমরা রাত ৮.৩০ এ রওনা হয়ে দিল্লী পৌছলাম পরদিন সকাল ১০ টায়।

এসে আরো বেশী মন খারাপ লাগতেছিলো! তীব্র গরমে মনে হচ্ছিলো হাশরের মাঠে দাঁড়িয়ে আছি। মাথার মাত্র এক হাত উপরে সূর্য।

অবশ্য দিল্লী থেকে সূর্যের দূরত্ব এমনিতেও কম। দিল্লী জামে মসজিদের কাছেই হোটেল ওয়েসিসে উঠলাম দুজন। ৯০০/- রূপি ভাড়া। এসি আছে, কিন্তু নষ্ট!

ফ্রেশ হয়ে দিল্লী জামে মসজিদে ঘুরতে গেলাম। বায়তুল মোকাররম টাইপের মসজিদ। এইটাকে ঘিরে মার্কেট।

একপাশে প্রচুর খাবারের দোকান। স্ট্রিটফুড হিসেবে ভালোই লাগছে। সবচে ভালো লাগছে জিলাপি আর মিষ্টি।

দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে দেখলাম হোটেলগুলোর সামনে প্রচুর দিনমজুর টাইপের লোক বসে থাকে।

খোঁজ নিয়ে জানলাম এরা ফ্রি খাবারের জন্য বসে আছে।

মুসলিম হোটেলের মালিকেরা অবিক্রিত খাবারগুলো এসব লোকদের ফ্রি দিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে কারও ধর্ম পরিচয় মূখ্য না!

রাতে গেলাম বিখ্যাত দিল্লী গেট!

গিয়ে মন আরো খারাপ হলো। এই গেটের চেয়ে আমাদের বাসার গেট আরো সুন্দর আর বড়।

কিন্তু হঠাৎ স্মৃতি ফিরে পাবার মতো “ইন্ডিয়া গেট” নামটা মনে পড়লো।

দিল্লী গেট থেকে ৬০ রূপি অটো ভাড়া দিয়ে চললাম ইন্ডিয়া গেট!

একেবারে হতাশ না হলেও আহামরি কোন স্থাপনা মনে হয়নি! কিন্তু প্রচুর ট্যুরিস্ট আর রোমান্টিক কাপল। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে।

দিল্লীতে কুতুব মিনার, লোটাস টেম্পল আছে কাছাকাছি দূরত্বে। দিল্লী আর নয়াদিল্লী হচ্ছে পুরান ঢাকা আর গুলশান!

পরদিন আগ্রার একটা প্যাকেজ নিলাম একজন ৪৫০/- রূপি করে। এসি বাস। যাওয়া-আসা এবং গাইড এই টাকার মধ্যে।

দিল্লী থেকে আগ্রা ২৫০ কিলোমিটার হিসেবে এই টাকা খুবই কম।

আগ্রা গিয়ে প্রথমেই দেখলাম “আগ্রা ফোর্ট”! এইখানে সম্রাট শাহজাহানের বাবা থাকতেন, পরে শাহজাহান, তারপরে তার ছেলে (ভদ্রলোকের নাম মনে নাই)!

এইটা বিশাল মুঘল সাম্রাজ্যের “প্রধান কার্যালয়”ও।

ঢুকতে বিদেশীদের জন্য ৫৫০/- রূপি! কিন্তু আমরা যেহেতু দিল্লীর অধীনে তাই নিজেকে বিদেশি না ভাইবা ৪০/- রূপি করে দুজনের ৮০/- রূপি দিয়ে দুটি টিকেট কেটে ঢুকলাম।

আগ্রা ফোর্ট থেকে যমুনা নদীর তীরে তাজমহল দেখা যায়।

ভেতরে সম্রাটদের ব্যবহৃত বিশাল বাথটাব সহ বেশকিছু জিনিস ছিল। তবে আমাদের সাথে প্রচুর সাদা চামড়ার সত্যিকার বিদেশি ছিল, তারাই আমার যতো আনন্দের মূল ছিল আরকি!

দুপুরে খাবারের বিরতী!

খাবার ভালো না। তবুও হাসিমুখে খাচ্ছিলাম।

খাবারের মধ্যে যথারীতি লোকাল ইন্ডিয়ান হাবিজাবি ডিশ ছিল৷ কিন্তু হট ট্যুরিস্ট প্লেস হওয়ার কারণে দাম বেশি। তবে পরিবেশ ভাল।

খাওয়া শেষে গেলাম স্বপ্নের তাজমহল।

এখানেও টিকেট বিদেশীদের জন্য ৫৫০/- রূপি করে। কিন্তু আমি ঢুকলাম ৪০+৪০, দুজনে ৮০/- রূপি দিয়েই।

ঢুকার সময় আইডি কার্ড চেয়েছে। আমি শুদ্ধ জাপানী ভাষায় বলেছি, “ওয়াশি আন্নু নাতাশিমা” “(বংগানুবাদ–আইডি আনি নাই)।”

গার্ড কি বুঝেছে কে জানে। বললো, যাঈয়ে! (অবশ্য আমিও জানিনা এই কথার মানে!

ভিতরে গিয়ে খুব হতাশ হইছি! ছবিতে তাজমহলকে যতোটা মোহনীয় লাগে বাস্তবে অতোটা না।

তারচে ভালো লাগতেছিলো কোরিয়ান ওই ট্যুরিস্টদের। সবগুলা কেমন পুতুল পুতুল! চল্লিশ টাকা টিকেটের এইখানেই জাস্ট ৬৯% উসুল হইছে।

হাটতে হাটতে একদম ভেতরে গেলাম। খালি পায়ে যেতে হয়। ভিতরে গিয়ে দেখি একপাশে শাহজাহান আর একপাশে উনার বড় বউ বেগম মমতাজের কবর।

তাজমহলের একপাশে বড় একটা মসজিদ। চারপাশে চারটা পিলার আর বিশাল জায়গাজুড়ে বাগান।

পিছনে যমুনা নদী। নদীর সাইজও ছোট, পানিও কম।

তাজমহল কিভাবে সপ্তাশ্চর্য হইছে এইটা ভাইবা আমিই অস্টমাশ্চার্য হয়ে ছিলাম।

জাস্ট মহামূল্যবান টাইলস (পাথর) ছাড়া ব্যতিক্রম কিছু মনে হয় নাই।

হয়তো আমার রুচিবোধের সাথে যায় নাই!

তবে এখানে সবাই যেভাবে ছবি তুলে আমরাও সেভাবে কয়েকটা ছবি তুলেছি।

তাজমহল থেকে বের হবার সময় আমরা ওয়েস্ট গেটেই যাচ্ছিলাম যেখানে আমাদের বাস দাঁড়িয়ে। কিন্তু বের হবার সময় এক লোক ইস্ট গেট দেখিয়ে বললো বাস ওইদিকে।

আমরা ৬০/- রূপি ভাড়া দিয়ে গিয়ে দেখি বাস ওখানে নেই। ওখান থেকে আবার ওয়েস্ট গেটে আসবো। কিন্তু সব হারামী ড্রাইভার বলে ৬ কিলোমিটার ঘুরে ওখানে যেতে হয়। ভাড়া ১৫০ রূপি।

আমরা ভয় পেয়ে গেছি যে তাহলে আমাদের বাস চলে যাবে, কিন্তু বাসে আমাদের লাগেজ, ব্যাগ সব আছে।

এখানে এসেই ইন্ডিয়ান মানুষদের আসল চেহারা দেখলাম। সব ফ্রড।

ইচ্ছা করে সহজ ১০ মিনিটের রাস্তাটা দেখিয়ে দেয়নি। পরে দামাদামি করে ৮০ রুপিতে অটো ঠিক করলাম। ১০০ রুপির নোট দিলাম অটো ড্রাইভারকে। সে ভাংতি নেই বলেই অটো টান দিয়ে চলে গেল!

যাকগে, শেষমেশ শেষমুহুর্তে গিয়ে শেষ যাত্রী হিসেবে বাস ধরতে পেরেছিলাম।

তাজমহল ঘুরা শেষে আমাদের রিজার্ভ বাস আমাদের নিয়ে চললো “মাথুরা” জেলায়।

আমাদের প্যাকেজে এইটা ছিল না। আগ্রা থেকে ১৪৫ কিলোমিটার আর দিল্লী থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরে মাথুরা।

যাওয়ার আগে আমাদের গাইড/সাধু বাসেই দেশীয় “ফেবু আলেম”-দের মতো মায়ের সেবাযত্ন নিয়ে সেই লেভেলের বক্তৃতা দিলো।

বেশকিছু অলৌকিক কাহিনী বইলা আমাদের “ডর”-ও দেখাইলো। একটু পরে বুঝলাম এই মাতা এদের গো-মাতা!

বাসে বোধহয় আমরা দুজনই মুসলমান ছিলাম। ওদের সাধুর বক্তৃতার মাঝেমাঝে পুরো বাসের সব যাত্রী ‘”জ্যায় মাতাজি” বইলা গলা ফাটায়া চিক্কার দিতো আর সাধু ধমকায়া বলতো “আজকে কিছু খান্নাই নাকি?”

আমরা তখন “জয় বাংলা” বইলা চিক্কুর দিয়া রক্ষা পাইছি।

মাথুরা শ্রীকৃষ্ণ’র জন্মস্থান। ভিতরে যাইনি আমরা। খুবই কড়া নিরাপত্তা। জুতা, ঘড়ি, মানিটি কিংবা ভ্যানিটি ব্যাগ, মোবাইল কিছুই নেয়া যায়না।

সেখান থেকে রাত ১০ টায় গেলাম ”বৃন্দাবনে”!

এইখানে নাকি প্রচুর লীলাখেলা হয়। ২২০ কিলোমিটার এই বনের দৈর্ঘ্য। ভিতরে আছে ৫৫০০ মন্দির।

মন্দিরের লীলাখেলা রাতের আধারে বেশী হয়। নানান কিসিমের লীলাখেলার বর্ণনা আমাদের বাসেই গেলানো হইছিল।

পুরো বন জুড়ে রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি ভর্তি। রাস্তাঘাটে প্রচুর বেওয়ারিশ গরু!

দুই/চাইরটা ধইরা আনার ইচ্ছা ছিলো কুরবানীর জন্য। কিন্তু বিমানের টিকেট কাটা ছিল না বলে আনতে পারি নাই।

এই গরুদের সেবাযত্ন করে গরুর মতোই বেওয়ারিশ লোকজন।

তাছাড়া আছে প্রচুর বিধবা কিংবা স্বামীহীনা। এরা মায়ের সেবা করে আর দুধ-হিসু-গোবর খেয়ে বাচে।

আমরা এখানকার কিছুই খাইনি কোল্ড ড্রিংক ছাড়া। শুনেছি এরা নাকি খাবারে গোমূত্র আর “খাটি গাওয়া গোবর” মিশিয়ে দেয়।

মাথুরা থেকে দিল্লী ফিরতে ফিরতে রাত ৩ টা।

“আশ্রমশালা” নামক একটা জায়গায় বাস নামিয়ে দিলো আমাদের।

এখান থেকে দুজনে ২০০ রূপিতে আসলাম দিল্লী এয়ারপোর্ট।

আসার পরে অটো ড্রাইভার বলে প্রতিজন ২০০/- রূপি! হারামিটারে ধমক দেয়ার পরে পালাইছে।

দিল্লী থেকে সাড়ে চার ঘন্টায় এয়ারে কোলকাতা। সেখান থেকে ৬০০ রুপিতে ট্যাক্সিতে করে বেনাপোল আসলাম।

বর্ডার পার হবার সময় বাংলাদেশি দুজন মিস্কিন পুলিশ দুই হাত পেতে ২০০/- টাকা চাইলো। বিনিময়ে এন্ট্রি সীল এনে দিবে।

আমরা “মাফ করবেন, অন্যদিকে দেখেন” বলে নিজেরাই এন্ট্রি নিয়ে ৫ মিনিটেই চলে এলাম বাংলাদেশ!

ভ্রমণ তারিখঃ ১ অগাস্ট ২০১৮

(আইমান সাদ, ঘাটাইল ডট কম)/-