‘দরকার স্বাস্থ্যসেবা খাতের আমুল পরিবর্তন’

স্বাস্থ্যের ডিজিকে সরানো হলো বলে আহ্লাদিত হবার কিছু নেই। ডিজি রোগ ছিলোনা, ছিলো উপস্বর্গ। রোগ যখন সমু্লে বিস্তার করেছে, তখন উপস্বর্গ গেছে বলে তুষ্টির কিছু নেই।

দেশের স্বাস্থ্যের এই হাল একদিনে তো হয়নি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে তিলে তিলে ধবংস করা হয়েছে। সেজন্য কে কার চেয়ে বেশী জড়িত সেটা নিয়ে আসুন আলাপ করি।

অধিদপ্তরের ডিজিকে একা শাপশাপান্ত করলে অন্যদের প্রতি অবিচার করা হবে। কারন তারা তো সবাই জোট বেঁধে ডিজির মাথায় কাঠাল ভেঙ্গে খেয়েছে বছরের পর বছর।

আমাকে ভুল বুঝবেননা। আমি ডিজির পক্ষে সাফাই গাইছিনা। সে তো অবশ্যই দোষি। প্রথম কোপটা তাকেই খেতে হবে, এটা যেমন সত্যিই, তেমনি একজন ডিজি কিন্তু স্বাস্থ্যের মা বাপ মোটেও নেই। তাকে অপসারন করা হয়েছে।

এটা আরো আগেই করা উচিৎ ছিলো। কিন্তু তার কাছেও তো অনেকের হিসাব নিকাস ছিলো। তাকে সরানো হলে অন্যদের যাতে কোনো অসুবিধায় পড়তে না হয়, সেসব ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে সব আটঘাট বেধে এরপর তাকে সরানো হলো।

শুধু সরানো কেন, তাকে চাকরিচ্যুত করা সময়সাপেক্ষ হলেও, তাকে সাময়িক বরখাস্ত করাটা অত জটিল কিছু ছিলো না। কিন্তু সে দিকে হাটেনি মন্ত্রনালয়, তার সঙ্গত কারনও কিছু আছে নিশ্চয়ই।

বাকিরা যেমন মন্ত্রি, সচিব সহ অন্যরা যদি না চায়, তবে ডিজির একার পক্ষে যেমন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে ফেলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তেমনি, অকাম কুকাম সেটাও করা অনেকটা কঠিন। কারন লাইন মিনিস্ট্রির সহযোগিতা বিনা তার পক্ষে কোনো অপকর্মই করা সহজ কাজ নয়।

সুতরাং ডিজিকে বাইফোর্স এক্সিট দিয়ে বাকিদের সেফ এক্সিট দেয়া হলো কি না, সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বাংলাদেশের মত তৃতীয় অনুনন্নত দেশে (সরকার হয়ত আমার এ কথায় মাইন্ড করবে, তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। আমি অন্তত: উন্নয়নশীল দেশের কোনো নমুনা কোথাও খুজে পাইনি, সরকার যতই মুখে এসব গালগপ্প শোনাক আমাদের) যেসব খাতে আন্তর্জাতিকভাবে বেশী সহযোগিতা আসে, বেশী গুরুত্ব দেয়া হয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যখাত।

আর যেখানে যত বেশী মধু,সেখানে তত বেশী মৌমাছি। সেকারনে স্বাস্থ্যখাত কেন্দ্রিক দেশে গড়ে উঠেছে অগুনতি এনজিও, ডাক্তারদের অগুনতি সংগঠন, সেই সাথে আছে বেসরকারি ওষুধ কিম্বা হাসপাতাল কেন্দ্রিক উদ্যোক্তাদের অপরিসিম প্রভাব।

আর সেকারনে এই খাতে কোটি কোটি ডলার বরাদ্দ করা হলেও সমস্যার সমাধান এখনো সদুরপরাহত।

তাই বলছি, শুধু ডিজিকে গিলোটিনে পুরলে কি সমস্যার সমাধান হবে? হবে না। দরকার এই সেকটরের আমুল পরিবর্তন।

সবচেয়ে বড় দরকার রাজনৈতিক সরকারের ভালো কিছু করার আন্তরিকতা। সেটা কারো আছে বলে তো মনে হয়না।

রিজেন্ট হাসপাতাল নিয়ে গত কিছুদিন ধরে এত কথা হচ্ছে, সেই হাসপাতালটা রাতারাতি কিভাবে গড়ে উঠলো? শুধু তাই নয়, তাদের একাধিক শাখাও গড়ে উঠলো।

ইদানিংকালে হাসপাতালের শাখা গড়ে ওঠার একটা হিড়িক লক্ষ্য করি। হাসপাতাল তো কোনো বিপনিবতান নয় যে তার আউটলেট বাড়াতে হবে।

হাসপাতালের শাখা আবার কি!?

হলে একটি পরিপূর্ন হাসপাতাল হতে হবে। সেসব জায়গায় আবার সরকারী ডাক্তাররা সকাল বিকেল রোগি দেখেন।

আসলে কি দেখেন না কি বড় বড় সার্টিফিকেট, বিদেশী ডিগ্রি দেখিয়ে আমাদের দেশের গরিব জনগনের পকেট কাটেন।

সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার কেন বেসরকারী হাসপাতালে বসবেন, রোগি দেখবেন। এটা দিনের পরদিন চলে আসছে।

রিজেন্ট হাসপাতালের সাথে করোনারোগিদের ট্রিটমেন্টের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চুক্তি করলো। ঘটা করে চুক্তি হলো। যেন ছায়াছবির মহরত অনুষ্ঠান। সেখানে উপস্থিত থাকলেন, খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

আচ্ছা স্বাস্থ্যমন্ত্রী না হয় থাকলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়েরর সচিব হেলাল উদ্দীন সেখানে কোন ক্রাইটেরিয়ায় উপস্থিত থাকেন।

যিনি কিনা এর আগে ইলেকশন কমিশন সচিব ছিলেন। যাকে দেশের মানুষ উনিশ সালের ডিসেম্বরের মিডনাইট ইলেকশনের কারিগর বলে জানেন।

এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই কারো কাছে।

আমি কখনো স্বাস্থ্যবিটের রিপোর্টার ছিলাম না। তবে, সহকর্মী জুনিয়র যারা স্বাস্থ্যবিটে কাজ করেন, তাদের কাছে শুনেছি এই সেক্টরের হালহকিকত।

সরকারের একটা সংগঠন আছে যার গাল ভরা নাম। স্বাধিনতা চিকিৎসক পরিষদ। এদের কাজ কি কেউ বলতে পারেন।

আর এই কোভিট ১৯ যখন বাংলাদেশে হানা দেয়, তারপর একটা সংগঠন রাতারাতি খোলা হলো যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ডা. হাসনাৎ মিল্টন। তাদের কাজটা কি?

আমি শুনেছি, স্বাচিপের কথা ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কোন কাজ হয়না। এমনকি পোষ্টিং পদায়ন পর্যন্ত।

একটা ছোট্ট উদাহরন দেই, তাহলে বিষয়টা খোলাসা হবে।

আমার এক পরিচিত দম্পতি। দুজনেই চিকিৎসক। একজনের পোষ্টিং নীলফামারি, আরেকজনের ঢাকা সলিমুল্লাহ।

তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক। আমার এক কলিগকে বললাম, স্বামী স্ত্রি এত দুরে। তাদের কোনোক্রমে এক জায়গা পোষ্টিং হলে ভালো হয়। একটু চেষ্টা করবে না কি। আমার কলিগ বললো, দেখি কি করা য়ায়, মন্ত্রিকে বলতে পারি।

তিনি মন্ত্রিকে বললেন, মন্ত্রি অসহায়। তিনি আমাকে বললেন, স্বাচিপেরর সভাপতি কিম্বা এই সংগঠনের সুপারিশ ছাড়া মন্ত্রীও পারেননা কিছু করতে।

আমাকে স্বাচিপের কাছে যেতে বললেন। আমি অসহায়।

সেই দম্পতির আর একসাথে হওয়া হলোনা।

শুধু পোষ্টিং, পদায়ন নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সব কেনাকাটায় স্বাচিপেের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে, বোধ করি এখনো আছে।

মন্ত্রীর তাহলে কিছু কি করার নেই, অবশ্যই আছে। সব কেনাকাটাও ওপর টেন পার্সেন্ট! এই হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যের অবস্থা।

তাহলে একজন আবুল কালাম আজাদকে সরিয়ে কি কোনো পরিবর্তন আসবে, এখানে। আমি ভরসা পাইনা।

সরকারী হাসপাতালের যেখানে তথৈবচ অবস্থা। তখন রাতারাতি ব্যাংকের ছাতা অথবা তারকা হোটেলগুলোর মত দেশে গড়ে উঠছে বেসরকারী হাসপাতালের রিসিপশনে গেলে ভিমড়ি খেতে হয়!

এটাকি হাসপাতাল না কি তারকা হোটেল। ঠিক এই পর্যন্ত।

তাদের চিকিৎসা সুবিধার কথা বললে, শব্দের অপচয় করা হবে।

সরকার এদের শুধুমাত্র লাইসেন্স দিয়েই খালাস। এসব হাসপাতালের মান কেমন, রোগিদের প্রতি তাদের আচরন কেমন, সঠিক চিকিৎসা সেবা রোগিরা পাচ্ছেন কি না.. সে সব বিষয়ের নেই কোনো তদারকি।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে কে করবে তদারকি কার ঘাড়ে কয়টি মাথা।

মোটা টাকার বিল, লাশ হয়ে রোগি ফিরছে। অনেক সময় টাকা না দিলে লাশও বের হতে দিচ্ছেনা। আছে কোনো জবাবদিহিতা। অবশ্য কে করবে জবাবদিহিতা। এরা যে যখন সে সরকার তার ঘনিষ্ট। এত বড় প্রভাবশালীদের ঘাটাতে গিযে নিজের চাকরী কিম্বা জীবন বিপন্ন করতে কে চায়!

আমাদের দেশের সরকারের কোনো মন্ত্রী, এমপি কিম্বা কথিত টাকাওয়ালারা দেশের চিকিৎসার ওপর ভরসা করেনা। এমনকি তাদের হাতে গড়া তারকা হাসপাতালের প্রতিও নয়।

তারা জানেননা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন কতটা সঙ্গিন! কতটা ভেঙ্গে পড়েছে।

আমার বাসা মিরপুর আমি বাসে প্রতিদিন, বাসে অফিসে যাওয়ার পথে সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালের সামনে একটি বিলবোর্ড দেখি। সেখানে লেখা আছে, আমাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেবেননা। আমি দেশেই চিকিৎসা নেব।

এই লেখাটি যে কতখানি প্রানে বাজে এ দেশের মানুষের, সেটা ওরা তথন উপলব্দি করে, যখন, ওদের কোনো স্বজন অসুস্থ হলেও সরকারী হাসপাতালে কোনো বেড পায়না..

ওরা তখনি উপলব্দি করে যখন দেখে ওদের রাষ্ট্রপতি কদিন কদিন পর পর বিদেশে চিকিৎসার জন্য উড়াল দেন!

(মুজতবা খন্দকার, ঘাটাইল ডট কম)/-