ড্রাইভার মালেকের শতকোটি টাকার সম্পদ থাকলে মালিকের কতো?

আব্দুল মালেক। সম্প্রতি গণমাধ্যমের শিরোনামে তার ছবি জায়গা করে নিয়েছে। দুদিন আগেও তার এতোটা পরিচিতি ছিল না। এখন আব্দুল মালেক একজন পরিচিত মুখ। তার সম্পর্কে গণমাধ্যমে উঠে আসা যতোটা তথ্য জানছি ততোটাই আশ্চর্য হচ্ছি। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক। বর্তমানে পত্রিকায় পাতায় বিশেষণ যোগ হয়ে প্রচার হচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাপুটে গাড়িচালক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কর্মচারী ১৯৮২ সালে মাস্টার রোলে চাকরি শুরু করেন। অষ্টম শ্রেণি পাস এই গাড়িচালক ৮৬ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে পদোন্নতি পান। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার বা ভালো সম্পর্ক রাখার মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হন।

দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন আব্দুল মালেক। রোববার ভোরে র‌্যাব-১ এর একটি দল তুরাগ থানাধীন কামারপাড়ার বামনেরটেক এলাকার বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় আব্দুল মালেকের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগজিন, পাঁচ রাউন্ড গুলি, দেড় লাখ বাংলাদেশি জালনোট, একটি ল্যাপটপ ও মোবাইল জব্দ করা হয়।

নিস্পাপ চেহারা। মুখে লম্ভা দাঁড়ি। দেখে বুঝার উপায় নেই তিনি কোন অন্যায় কাজ করতে পারেন। কিন্তু র‌্যাব গণমাধ্যমকে জানিয়েছে তিনি কমপক্ষে শতকোটি টাকার মালিক।

তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর বেতন কত হতে পারে এটা সবারই জানা। নির্ধারিত বেতনে শহরে থাকার পর কতো টাকা সঞ্চয় করা যায় এটাও সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু গণমাধ্যমে আমরা দেখছি তিনি এখন কমপক্ষে শতকোটি টাকার মালিক। ধানমন্ডি-উত্তরায় তার বিলাসবহুল তিনটি বাড়ি। সব কটি সাততলা। একাধিক স্ত্রী ও সন্তানের নামে রয়েছে ২৪টি ফ্ল্যাট।

ঢাকার তুরাগে ছেলের নামে গড়ে তুলেছেন ‘ডেইরি ফার্ম’। সেখানে পালন করেন কোটি টাকার গবাধি পশু। নিজের এসব সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ করতে সঙ্গে রাখতেন অস্ত্রসহ ‘গানম্যান’।

অভিযোগ উঠেছে অধিদপ্তরের সাবেক ও বর্তমান মহাপরিচালকের (ডিজি) এই গাড়িচালক অবৈধভাবে উপার্জন করেছেন শতকোটি টাকা। অধিদপ্তরে বদলি, নিয়োগ বাণিজ্য, তদবির, টেন্ডারসহ সব ক্ষেত্রেই বিচরণ ছিল তার। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে অল্প কিছুদিনেই হয়ে যান অঢেল সম্পদের মালিক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।

এছাড়া তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্রাইভারদের মামিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আব্দুল মালেক ওরফে মালেক ড্রাইভারের রাতারাতি এত সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তৃতীয় শ্রেণির এই কর্মচারী ব্যবহার করতেন পাজেরো। অধিদফতরের মহাপরিচালকের জন্য বরাদ্দকৃত পাজেরো গাড়ি ব্যক্তিগত গাড়িতে পরিণত করেছেন তিনি। রাজধানীর তুরাগে গাড়িচালক আবদুল মালেকের রয়েছে ২৪টি ছাড়াও ১২ কাঠার প্লট। এছাড়া হাতিরপুলে ১০ তলা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। ক্ষমতা দেখিয়ে অধিদফতরের বিভিন্ন পদে চাকরি দিয়েছেন ডজনখানেক নিজের আত্মীয়-স্বজনকে।

মেয়ে নৌরিন সুলতানা বেলিকে অধিদপ্তরের অফিস সহকারী, ভাই আব্দুল খালেককে অফিস সহাকারী, ভাতিজা আব্দুল হাকিমকে অফিস সহকারী, বড় মেয়ে বেবির স্বামী রতনকে ক্যান্টিন ম্যানেজার, ভাগ্নে সোহেল ও ভায়রা মাহবুবকে ড্রাইভার, নিকটাত্মীয় কামাল পাশাকে অফিস সহকারী পদে চাকরি দিয়েছেন।

আবদুল মালেক মহাপরিচালকের জন্য বরাদ্দকৃত একটি সাদা পাজেরো জিপ (ঢাকা মেট্রো গ- ১৩-২৯৭৯) নিয়মিত ব্যক্তিগত গাড়ি হিসেবেই ব্যবহার করতেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের আরও দুটি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন তিনি। যার একটি পিকআপ গাড়ি (ঢাকা মেট্রো ঠ-১৩-৭০০১) তার ডেইরি ফার্মের দুধ বিক্রি এবং তার মেয়ে জামাই পরিচালিত অধিদফতরের ক্যান্টিনের মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হয়। অপর একটি মাইক্রো (ঢাকা মেট্রো-চ-৫৩-৬৭৪১) স্বাস্থ্য অধিদফতরে কর্মরত মালেকের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা ব্যবহার করেন।

রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, দেশের দশভাগ সম্পদ নব্বই ভাগ মানুষের কাছে। আর নব্বই ভাগ সম্পদ দশভাগ মানুষের কাছে। এভাবে দেশে সম্পদেও অসম বন্টন হচ্ছে। আব্দুল মালেকের সম্পদের পরিমান দেখে মনে হচ্ছে দেশের একভাগ সম্পদ নিরানব্বই ভাগ মানুষের কাছে।

আলোচনার বিষয় হচ্ছে একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী (ড্রাইভার) যদি শতকোটি টাকার মালিক হয়ে থাকেন তাহলে তার মালিকের সম্পদ কত টাকার হতে পারে। আরও সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায় একজন ড্রাইভার কোন কাজ নিজে করতে পারেনি। অন্যকে তদবির করে কাজ করিয়েছেন। সেক্ষেত্রে উপরের ধাপগুলোর উপার্জন কত হতে পারে? তাদের সম্পদের পরিমান কতো হতে পারে ? দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারে রাষ্ট্রের কার্যাদি জিম্মি হয়ে পড়বে। এমন মালেক শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের না অন্যান্য দপ্তরেও থাকতে পারে। আব্দুল মালেকের মতো প্রতিটি দপ্তরে-দপ্তরে আব্দুল মালেকদেরও খুঁজতে হবে।

রাষ্ট্রকে স্বচ্ছ রাখতে এসব মালেকদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। মালেকদের মাধ্যমে শিকড়ে পৌছাতে হবে। তবেই দেশ হবে একটি দুর্নীতিমুক্ত আদর্শ বাংলাদেশ।

(রেজাউল করিম, ঘাটাইল ডট কম)/-