ডেঙ্গু রোগী ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে

প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা। ডেঙ্গু রোগী ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। সরকারি হিসাবে গতকাল পর্যন্ত দেশের ৫০টি জেলার হাসপাতালে ভর্তি ছিল ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী। এর বাইরে থাকা ১৪টি জেলার মধ্যে ৯টি জেলার হাসপাতালে গতকাল ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিল বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে গতকাল পর্যন্ত ৫০ জেলায় চিকিৎসাধীন রোগীর তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ঢাকা শহর বাদে গতকাল দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৫৩১ জন। তবে এর বাইরে ফরিদপুর, বরগুনা, মাগুরা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলায় আরও অন্তত ১০৯ জন রোগী ভর্তি থাকার খবর জানিয়েছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা।

সরকারি হিসাব ও প্রথম আলোর অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, বান্দরবান, মেহেরপুর, নড়াইল, জয়পুরহাট ও নেত্রকোনায় কোনো ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন নেই। এর মধ্যে অধিকাংশ জেলার সিভিল সার্জনরা জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে এখন পর্যন্ত কেউ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়নি। যারা চিকিৎসা নিচ্ছে, তারা সবাই ঢাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে এলাকার হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক আয়শা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের বেশির ভাগই ঢাকা থেকে অসুস্থ হয়ে গেছে। তবে কতজন ঢাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে গেছে, আর কতজন ওই জেলায় আক্রান্ত হয়েছে, তার হিসাব তাঁদের কাছে নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, গতকাল ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল মোট ৩ হাজার ৮৪৭ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৯৬ জন। যদিও সরকারি হাসপাতালের বাইরে ঢাকা শহরের শুধু ৩৫টি বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বেসরকারি এই ৩৫টি হাসপাতালের মধ্যেও ১৭ টির কোনো তথ্য হিসাবে যুক্ত করা হয়নি। ঢাকা শহরে বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৩৫০। তাই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে ১৩ হাজার ৬৩৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর নথিভুক্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংস্থাটির হিসাবে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গতকাল পর্যন্ত মারা গেছে ৮ জন। তবে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে অন্তত ৪৭ জনের মারা যাওয়ার তথ্য পেয়েছে প্রথম আলো। এর মধ্যে এক নারী গতকাল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. নাসির উদ্দিন।

মার্চে সতর্ক করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
গত মার্চে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এডিস সার্ভের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমেও যথেষ্ট এডিস মশা আছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা থেকে চিকিৎসকদের সচেতন করতে চিঠিও পাঠানো হয়। তবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশন ও হেলথ এডুকেশন ব্যুরো যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ায় এবার ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বহু গুণ বেড়ে গেছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) সানিয়া তাহমিনা।

ঢাকার বাইরে যাচ্ছে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ডেঙ্গু জ্বর শনাক্তে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে কিট পাঠানো হচ্ছে। ঢাকার প্রবেশপথগুলো ছাড়াও হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, মোংলা, বেনাপোল এবং চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানারের মাধ্যমে জ্বরের রোগী পরীক্ষা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে তারা সেখানে কিটের মাধ্যমে এনএসওয়ান পরীক্ষা করবে। এ ছাড়া আগত বাকি সব মানুষকে প্রচারপত্র, পোস্টার দেওয়া ও সচেতন করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আগামী বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ঢাকার সব স্কুল-কলেজকে অঞ্চলভেদে ভাগ করে সচেতনতামূলক প্রচারকাজ চালানো হবে।

মাঠে নামছে আওয়ামী লীগ
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। গতকাল সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ডেঙ্গুর ব্যাপারটা এত প্রকট হবে, প্রথম দিকে হয়তোবা কেউ ভাবেনি। যখন এর বিস্তার ভয়াবহ পর্যায়ে চলে এসেছে, তখন কিন্তু আমরা কেউ নিষ্ক্রিয় থাকিনি। আমরা সমন্বিতভাবে চেষ্টা করে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করব।’

স্বাস্থ্য বাতায়নে অভিযোগ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ধারিত মূল্য (৫০০ টাকা) অনুযায়ী ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করতে ১০টি দল গঠন করেছে সংস্থাটি। তারা রাজধানীর সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে এই কাজের তদারক করছে। কোনো অভিযোগ থাকলে ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩’ হটলাইনে অভিযোগ জানানো যাবে।

(প্রথমআলো, ঘাটাইলডটকম)/-