টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে দালালের দৌরাত্ম‌্য

৩১ ডিসেম্বর রাত ১০টা। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল। পেটব্যথা নিয়ে হাসপাতালে আসেন আলমগীর হোসেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের উত্তর পাশে এক দল যুবক দাঁড়িয়ে আছেন। রোগী এলেই তাদের কাছে যাচ্ছেন যুবকরা। সিএনজি অটোরিকশা থেকে নামতেই তার কাছে যান দুই যুবক।

তারা রোগীর স্বজনদের বলেন, ‘আমরা এখানে থাকি। হাসপাতালে ভর্তি করতে সহযোগিতা করব।’

রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। ভর্তির পর প্রেসক্রিপশনের কাগজটা হাতে নিয়ে কম দামে ওষুধ এনে দেওয়ার আশ্বাস দিলেন যুবকদ্বয়। কিছুক্ষণ পর ওষুধ এনে দিলেন তারা।

আপাতদৃষ্টিতে ওই যুবকদের এ কাজ মহৎ মনে হলেও এর পেছনেই আছে আসল রহস‌্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেলো এসব যুবক হাসপাতালের পাশের ওষুধের দোকান ও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের দালাল। ওষুধ কেনার সময় টাকা আত্মসাৎ করেন তারা। ওষুধের প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি টাকা নেন দালালরা।

এজন‌্যই তারা রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে খাতির জমানোর উদ্দেশ‌্যে ভালো ব‌্যবহার বা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন।

রোগী আলমগীর হোসেনের স্বজন হাফিজুর রহমান বলেন, ‘হাসপাতালে দিনে এলে দালালরা বিরক্ত করে। রাতে এলে আরও বেশি বিরক্ত করে। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে দিনের চেয়ে রাতে দালালদের দৌরাত্ম‌্য বেশি।’

গত ২ জানুয়ারি ওই হাসপাতালে গিয়ে একই দৃশ্য দেখা যায়। রাত ৮টা ১৫ মিনিটে নাগরপুর উপজেলার সল পাকুটিয়া এলাকা থেকে হাসপাতালে আসেন পা-ভাঙা রোগী আনোয়ার হোসেন। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমেই রোগীর স্বজনরা ট্রলি খুঁজতে থাকেন।

এক দালাল বলেন, ‘ট্রলিম্যান আছে, আপনাদের চিন্তা করতে হবে না। আমি আপনাদের সহযোগিতা করছি।’ তিনি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধ এনে দেন।

রাত ৯টায় প্রচণ্ড শরীরব্যথা নিয়ে এলেঙ্গা থেকে হাসপাতালে আসেন বাছেদ মিয়া। তিনিও দালালের খপ্পরে পড়েন। রাত ৯টা ১০ মিনিটে টাঙ্গাইল শহরের কাগমারী থেকে সিনহা নামের এক শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার স্বজনরা। সে শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। তাকেও হাসপাতালে ভর্তি করেন দালালরা। প্রেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধ এনে দেন তারা।

দালালদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত তারা টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের উত্তর ও পশ্চিম পাশে অবস্থিত ওষুধের দোকানগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। ওই হাসপাতালে প্রতিদিন দুই বেলা ২৫ থেকে ৩০ জন কাজ করেন। প্রত্যেকের এলাকা ভাগ করা থাকে।

হাসপাতাল পুলিশ বক্সের এক এএসআই জানান, দালালদের মূল টার্গেট হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসা রোগীরা। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দালালদের সহযোগিতা করেন।

দালালরা জরুরি বিভাগ থেকে রোগীকে অনুসরণ করে ওয়ার্ডে যান। সাধারণত ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রেসক্রিপশন দেন। দালালদের নজর থাকে ওই প্রেসক্রিমশনের দিকে। এরপর সুযোগ বুঝে রোগীর স্বজনের সঙ্গে ভাব জমান তারা।

এক্ষেত্রে হাসপাতালে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী দালালদের সহযোগিতা করেন। নানা কৌশলে দালালরা প্রেসক্রিপশন হস্তগত করে নির্দিষ্ট দোকানে নিয়ে যান রোগীর স্বজনদের। কয়েকজনকে স্বেচ্ছাসেবক নাম দিয়ে প্রকাশ্যে দালালি করারও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে।

ভুক্তভোগীরা জানান, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিয়োগ করা দালালদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে জেনারেল হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা। অনেক দালাল রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও অনেকটা অসহায়। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও পুলিশের অভিযানে দালালদের তৎপরতা সাময়িকভাবে কমলেও অল্প দিনেই তা আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

জানা যায়, দালালরা প্রথমে নিজেদের হাসপাতালের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়। হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কথা বলে রোগী ও রোগীর স্বজনদের উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে ক্লিনিকে নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

হাসপাতালের চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অচল ও নিম্নমানের, এ দাবি করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বেসরকারি রোগনির্ণয় কেন্দ্রে নিয়ে যায়। এছাড়া, ওষুধের দোকান থেকে প্রতি হাজারে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কমিশন নেন দালালরা।

এছাড়া, কিছু রোগীর স্বজনের কাছ থেকে ওষুধের দাম বেশি নেন দালালেরা। অভিযোগ আছে, হাসপাতালের কর্মচারীদের ম্যানেজ করেই দালালরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সকালে হাসপাতালের বহির্বিভাগ খোলা থাকায় দালালদের দৌরাত্ম‌্য তেমন চোখে পড়ে না। তবে রাতে দালালদের দৌরাত্ম‌্য বেড়ে যায় কয়েক গুণ।

রোগীর স্বজন শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগের দিন দালালের মাধ্যমে যে ওষুধ ৫২০ টাকায় কিনেছি, পরের দিন সে ওষুধ ৩৫০ টাকায় পেয়েছি। দালাল ছাড়া ওষুধ কেনা ও ক্লিনিকে পরীক্ষা করা খুব কষ্ট। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল দালালমুক্ত চাই।’

জুয়েল রানা নামের আরেক ব‌্যক্তি বলেন, ‘হাসপাতালে এলে ওষুধ কোম্পানির লোকজনের পাশাপাশি দালালরা খুব বিরক্ত করে। আমরা বার বার দালালের মাধ্যমে প্রতারিত হচ্ছি।’

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সদর উদ্দিন বলেন, ‘দালাল নির্মূলের বিষয়ে প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযান চালিয়ে দালাল নির্মূল করা হবে।’

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও সদর আসনের সংসদ সদস‌্য ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘জেলা প্রশাসনকে বলে মাঝে মাঝে দালাল নির্মূলের জন্য অভিযান চালানো হয়। অভিযানের পর কিছুদিন বন্ধ থাকে। পরে আবার দালালদের তৎপরতা শুরু হয়।  হাসপাতালে পুলিশ বক্সের সদস্যরা কী কাজ করেন, আমি জানি না। তাদেরকে বলা হলে তারা জানান, নিয়মিত কাজ করছেন। তবে পুলিশ বক্সের সদস্যরা কার্যকর নন।’

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

Print Friendly, PDF & Email