টাঙ্গাইলে মাভাবিপ্রবি উপাচার্যের ডুপ্লেক্স বাসভবন ফাঁকা, থাকেন প্রশাসনিক ভবনে

টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) উপাচার্যের দায়িত্ব নেন ড. মো. আলাউদ্দিন ২০১৩ সালের মে মাসে। দায়িত্ব গ্রহণের পর উপাচার্যের বাসভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন তিনি। তার হাত দিয়েই ২০১৫ সালে এ বাসভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়। ২০১৭ সালের মার্চে এর উদ্বোধনও করেন তিনি নিজেই। নিজ উদ্যোগে গড়ে তুললেও বাসভবনটিতে থাকেন না উপাচার্য ড. মো. আলাউদ্দিন। তিনি থাকেন প্রশাসনিক ভবনে উপাচার্য দপ্তরের পাশের একটি কক্ষে। এজন্য ভাড়া দেন মাত্র ১ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, কোনো ধরনের সাদাসিধে জীবনযাপন নয়, বাড়ি ভাড়ার টাকা যাতে পরিশোধ করতে না হয়, সেজন্যই নির্ধারিত বাসভবনে থাকছেন না উপাচার্য। তবে বাসভবনে না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকায় কেনা বিলাসবহুল দুটি গাড়ি ঠিকই ব্যবহার করছেন তিনি।

বাসভবনে উপাচার্যের না থাকাকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের কেউ কেউ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে বেশির ভাগই বলেছেন, বাড়ি ভাড়ার টাকা যাতে পরিশোধ করতে না হয়, সেজন্যই বাসভবনে থাকছেন না উপাচার্য। এছাড়া উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়ন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় স্বেচ্ছাচারিতা ও নানা অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, একাডেমিক ভবনের পাশের পুকুরের পশ্চিম পাড়ে মনোরম পরিবেশে গড়ে তোলা হয়েছে উপাচার্যের বাসভবন। কথা হয় সবুজে ঘেরা সফেদ রঙের দৃষ্টিনন্দন এ ডুপ্লেক্স বাড়িটিতে কর্তব্যরত তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখানে স্যার থাকেন না। তিনি প্রশাসনিক ভবনে অফিসের পাশে একটি রুমে থাকেন। আমি এখানে পাহারা দেয়ার কাজ করি। তিন শিফটে তিনজন এখানে পালাক্রমে ডিউটি করি।’

ভেতরে যাওয়ার অনুমতি না মেলায় ভবনের তথ্য সংগ্রহে দ্বারস্থ হতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অফিসের। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দোতলা ভবনটির নিচতলার কক্ষ বিন্যাস করা হয়েছে উপাচার্যের দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজের উপযোগী করে। এখানে রয়েছে উপাচার্যের দপ্তর, কনফারেন্স রুম ও অতিথি থাকার কক্ষ। দোতলা গড়ে তোলা হয়েছে উপাচার্যের পরিবার নিয়ে বসবাসের উপযোগী করে।

বাসভবনের আসবাব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকৌশল অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, উপাচার্য না থাকায় এখনো খুব বেশি ফার্নিচার কেনা হয়নি। একটি সোফা সেট ও কয়েকটি খাট কেনা হয়েছে।

মাভাবিপ্রবি উপাচার্যের নির্ধারিত বাসভবনে না উঠে প্রশাসনিক ভবনে থাকা নিয়ে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।

দেশের পুরনো একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বিষয়ে বলেন, ‘বাড়ি ভাড়া ভাতা কাটবে, এ কারণে যদি কোনো উপাচার্য বাসভবনে না থাকেন, সেটি তার পদের সঙ্গে মানানসই নয়। উপাচার্য পদে কাউকে নিয়োগ দেয়ার সময় প্রজ্ঞাপনে লেখা থাকে, এ দায়িত্ব সার্বক্ষণিক পালন করতে হবে। তাই আমাদের শুক্র ও শনিবার অথবা অন্য ছুটির দিনগুলোতেও বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করতে হয়। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মধ্যেই বাসভবন নির্মাণ করা হয়। আমাদের অফিস কিন্তু প্রশাসনিক ভবনে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা দিনের বিভিন্ন সময়ে বাসভবনে অফিস করি। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন অতিথি আসেন, তাদের সঙ্গে সভা করি। বাসভবনে তাদের মেহমানদারি করাটাও এক ধরনের ঐতিহ্য। আমার একার কথা চিন্তা করলে বাসভবনের প্রয়োজন নেই। তবে একজন উপাচার্যের জন্য বাসভবনে থাকাটা জরুরি।’

প্রায় একই রকম মন্তব্য করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটি আবাসিক। তিনি সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকবেন। সেজন্য বাসভবনেও উপাচার্যের একটি দপ্তর থাকে। তাই বাসভবনে না থেকে গেস্ট হাউজ বা অন্য কোথাও থাকার সুযোগ নেই।’

বাসভবনে না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নেন উপাচার্য ড. মো. আলাউদ্দিনও। তিনি বলেন, ‘মূলত প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এখনো বাসভবনে উঠতে পারছি না। আমার ফ্যামিলিও এখানে থাকে না। তারা চিটাগংয়ে থাকে। আমি না থাকলেও বাসভবনে আইকিউএসির সেমিনার করেছি। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে আগামী সেপ্টেম্বরে আমি সেখানে উঠব।’

এদিকে বাসভবনে না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকায় কেনা বিলাসবহুল দুটি গাড়ি ব্যবহার করছেন উপাচার্য ড. মো. আলাউদ্দিন। দায়িত্ব গ্রহণের পরের বছর ২০১৪ সালের অক্টোবরে ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি পাজেরো গাড়ি ক্রয় করেন তিনি।

এরপর দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য পদে নিয়োগ পাওয়ার পর আগে গাড়িটি সচল থাকা সত্ত্বেও ২০১৮ সালে নিজের জন্য আরেকটি পাজেরো গাড়ি কেনেন তিনি। পরের গাড়িটি কেনা হয় ৯৩ লাখ টাকায়।

আগের গাড়িটি পরিত্যক্ত ঘোষণা ছাড়াই নতুন আরেকটি গাড়ি কেনার বিষয়টিকে অনিয়ম ও অর্থের অপব্যবহার হিসেবে অভিহিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক।

তবে উপাচার্যের দাবি, তিনি একটি গাড়ি ব্যবহার করছেন এবং অন্যটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, গাড়ি বা বাড়ির ক্ষেত্রে নয়; নিয়োগ, বিভিন্ন বোর্ড গঠন থেকে শুরু করে একাডেমিক, প্রশাসনিকসহ সবক্ষেত্রেই উপাচার্যের স্বেচ্ছাচারিতা রয়েছে।

এ সময় উপাচার্য নিজের বেশ কয়েকজন আত্মীয়-স্বজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

পরে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য পাওয়া গেছে, যারা উপাচার্যের আত্মীয় ও প্রতিবেশী। তাদের মধ্যে একজন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসে কর্মরত সেকশন অফিসার মো. ফিরোজ আলম। তিনি সম্পর্কে উপাচার্যের ভাতিজা। উপাচার্যের আত্মীয় হিসেবে চাকরি পাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি নিজ যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছি।’

একপর্যায়ে তিনি এ প্রতিবেদককে চায়ের দাওয়াত দিয়ে সাক্ষাতে কথা বলবেন বলে জানান।

অন্যদিকে উপাচার্যের কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে শুরুতে অভিযোগটিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন ড. মো. আলাউদ্দিন। তবে সেকশন অফিসার মো. ফিরোজ আলমের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চাকরির বিষয়ে আমাকে কতজনের অনুরোধ রাখতে হয়। এখন যোগ্যতা থাকলে কি আমি নিজের ভাতিজাকে চাকরি দিতে পারব না?’

টাঙ্গাইলের সন্তোষে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৩ সালে। বর্তমানে পাঁচটি অনুষদে ১৫টি বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থীকে পাঠদানের জন্য রয়েছেন প্রায় ২০০ শিক্ষক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রয়েছেন শিক্ষা ছুটিতে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আলাউদ্দিন ২০১৩ সালের মে থেকে টানা দুই মেয়াদে মাভাবিপ্রবির উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন।

(সাইফ সুজন, ঘাটাইলডটকম)/-