টাঙ্গাইলে ভুট্টার পরিবর্তে আবারও তামাক চাষে ঝুঁকছে কৃষকরা

টাঙ্গাইলে কৃষকদের নানা প্ররোচনা ও প্রণোদনায় প্রলুব্ধ করে ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্তব্যাপী তামাকের চাষ। কৃষকরা কয়েক বছর আগে তামাকের পরিবর্তে ভুট্টা চাষে আগ্রহী হলেও টোব্যাকো কোম্পানিগুলোর প্রলোভনে পড়ে অধিক লাভের আশায় এখন তামাক চাষের দিকে ঝুঁকছে। তামাক চাষে ‘কারগিল’ নামক সার প্রয়োগের ফলে চাষি ও তার পরিবারের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে, ফসলি জমি উবর্র শক্তি হারাচ্ছে। টাঙ্গাইলের গোপালপুর, ভুঞাপুর, কালিহাতী, টাঙ্গাইল সদর, দেলদুয়ার ও নাগরপুর উপজেলায় ব্যাপক হারে তামাক চাষ হচ্ছে।

বাংলাদেশে তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন বন্ধ করে সরকার বিকল্প কৃষিজ উৎপাদনে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করায় কৃষি বিভাগের কমর্কতাের্দর তৎপরতায় ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পযর্ন্ত জেলায় তামাক চাষ অনেকটাই কমে গিয়েছিল। কিন্তু এ বছর টোব্যাকো কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা কৃষকদের অধিক মুনাফার পাশাপাশি সার, বীজ ও সেচের জন্য নগদ টাকা মূলধন (ঋণ) হিসেবে দেয়ায় আবার তামাক চাষের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়েছে।

জানা গেছে, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলার গোপালপুর, ভুঞাপুর, কালিহাতী, টাঙ্গাইল সদর, দেলদুয়ার ও নাগরপুর উপজেলার চরাঞ্চলে ব্যাপক হারে তামাক চাষ হচ্ছে। জেলার এ ৬টি উপজেলার পশ্চিম এলাকা চরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। যমুনা, ধলেশ্বরী, লৌহজং ও নিউ ধলেশ্বরী নদীর তীর ঘেঁষা এসব চরাঞ্চলে প্রতিবছরই বষার্কালে পলি পড়ে। ফলে এসব এলাকার জমি উবর্র হয়ে থাকে। জমিগুলো বালি ও দোআঁশ মাটি হওয়ায় এক সময় মসুর ও মাস কালাই, ভুট্টা, চিনা, কাউন, গম, আলু, আখ, বাদাম ইত্যাদি ফসল বেশি পরিমাণে উৎপাদন হতো। স্থানীয় কৃষকরা বহুজাতিক ও দেশীয় টোব্যাকো কোম্পানির প্রলোভনে পড়ে ওইসব ফসল চাষ না করে বেশি লাভের আশায় ‘বিষবৃক্ষ’ তামাক চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, ঢাকা টোব্যাকো, আকিজ টোব্যাকো, আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানি এবং বিভিন্ন বিড়ি, সিগারেট ও জদার্ কোম্পানিসহ আরো কিছু কোম্পানি তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করছে। সরকারি কোনোরূপ নিষেধাজ্ঞা না থাকার ফলে কৃষকদের এ চাষে উৎসাহ জোগাচ্ছে টোব্যাকো কোম্পানিগুলো। তামাক চাষে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অগ্রিম টাকা, বীজ ও সার প্রদান এবং বিভিন্নভাবে তামাক চাষে সাহায্য-সহযোগিতা করছে। সরকার যখন চেষ্টা করছে তামাক চাষের পরিবর্তে অন্য ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহী করতে তখনই লক্ষ্য করা যাচ্ছে টোব্যাকো কোম্পানির তৎপরতায় তামাক চাষ ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী, জগৎপুরা বামনহাটা, চর নিকলা, নিকরাইল, পালিমা, আমুলা, ঘাটাইল উপজেলার সিংগুরিয়া, সোনাকান্দর, তালতলা, কালিহাতী উপজেলার সল্লা, দেউপুর, চর হামজানী, কদিম হামজানী, পটল, বেরী পটল, ঢোলকান, জোকারচর, গোহালিয়াবাড়ী, কুশাের্বনু, গোবিন্দপুর, ধলাটেঙ্গর, গোপালপুর উপজেলার নলিন, শাখারীয়া, সোনামুই, কালিবাড়ী, হেমনগর, নারুচী, টাঙ্গাইল সদরের কাকুয়া, হুগড়া, কাতুলী, মামুদ নগর, চর পৌলী, দেলদুয়ার উপজেলার এলাসিন, দেউলী, লাউহাটি, নাগরপুরের পাকুটিয়া, ভাদ্রা, বেকরা, আটগ্রাম, সলিমাবাদ, ধুবুরিয়া, মোকনা, বনগ্রাম, শাহজানী প্রভৃতি অঞ্চলে দিগন্তজুড়ে তামাক চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে ভূঞাপুর, কালিহাতী, টাঙ্গাইল সদর ও নাগরপুর উপজেলায় তামাক চাষের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। ‘ধূমপানে বিষ পান’ হলেও কৃষি বিভাগের মোটিভেশন ও স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে শুধুমাত্র অধিক লাভের আশায় চাষিরা তামাক চাষে ঝুঁকছে।

তামাক চাষে জড়িত চাষি ও তাদের পরিবারের অভিযোগ, তামাক চাষের ক্ষতিকর দিক উল্লেখ বা এ চাষ বন্ধে কৃষি কমর্কতাের্দর কোনোরূপ পদক্ষেপ না থাকায় দিন দিন এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তাদের মতে, প্রতি শতাংশ জমি বাবদ পাঁচ কেজি সার ও পরিমাণমতো তামাক বীজ সরবরাহ করছে টোব্যাকো কোম্পানি।

তামাক চাষে শতাংশ প্রতি প্রায় এক হাজার টাকার তামাক উৎপাদন করা যায়। মাটির উবর্রতা শক্তি নষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কম পরিশ্রমে তামাক অধিক লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা এ চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। কারগিল সার বা অতিরিক্ত সার ব্যবহারের ফলে কৃষি জমিগুলো নষ্ট হওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন চাষিরা। কিন্তু লাভ বেশি হচ্ছে পাশাপাশি এ কথাও বলছেন।

কৃষক পরিবারগুলো জানায়, তামাক শুকানোসহ ঘরে মজুদ করে রাখতে তাদের শারীরিক নানা সমস্যা হচ্ছে। বাড়ির অনেকেরই চমর্, শ্বাসকষ্ট, হঁাপানি ইত্যাদি রোগ দেখা দিচ্ছে। তারা অভিযোগ করে বলেন, কোম্পানিগুলো তামাক চাষ বৃদ্ধিতে বীজ ও সার সরবরাহ করলেও স্বাস্থ্য সচেতনতায় গায়ে অ্যাপ্রোণ বা মাস্ক ব্যবহারের জন্য প্রদান করে না। এতে তাদের হাতে চমের্রাগ ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে।

সরেজমিন কালিহাতী উপজেলার তামাক চাষি মো. সোনা মিয়া জানান, তিনি এ বছর ১৫ একর জমিতে তামাক চাষ করেছেন। এর মধ্যে বীজ, সার ও পরিচযার্র জন্য টোব্যাকো কোম্পানির পক্ষ থেকে কাডর্ধারীদের নগদ মূলধন (ঋণ) হিসেবে একর প্রতি কোম্পানির পছন্দ মাফিক ৬ থেকে ৫০ হাজার টাকা পযর্ন্ত দেয়া হয়। তামাক চাষ করলে একজন ব্যক্তির শুধু শরীরে খাটতে হয়, পুঁজি লাগে না। তামাক শুকিয়ে কোম্পানিকে বুঝিয়ে দিলে লাভটা ঘরে থাকে। তিনি জানান, এই একই জমিতে কালাই, বাদাম, চিনা ইত্যাদি চাষ করলে নিজেদের পুঁজি লগ্নি করতে হয়। শ্রমিক লাগে; একা সব কাজ করা যায় না। তা ছাড়া লাভ থাকে তামাকের তুলনায় অধের্ক বা সিকি (এক চতুথার্ংশ)। তাই তিনি তামাক চাষ করেন। প্রায় একই কথা বলেন, স্থানীয় রজব আলী, হানিফ ও মতুর্জ আলী।

নাগরপুরের মফিদুল, রূপচান, আজিজুল, টাঙ্গাইল সদরের আজগর আলী, রশিদ মিয়া, আন্তাজ আলী তাদের সবার বক্তব্য প্রায় একই। তবে তারা মনে করেন, তামাক চাষ না করার জন্য আগে কৃষি বিভাগের কমর্কতার্রা তাদের বুঝাতেন, এখনো বুঝান তবে আগের মতো নয়। তা ছাড়া তারা তো আর লাভ করে দিতে পারেন না। তাই বুঝালে কী হবে? অধিক লাভের জন্যই তারা তামাক চাষ করেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, দীঘির্দন তামাক চাষে যুক্ত থাকলে ক্যান্সার, পেটের পীড়া, বুক ও ঘাড়ে ব্যথাসহ নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাড়ির পোয়াতি বৌ-ঝিদের তামাকের কাছে ঘেঁষতেও নিষেধ করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া তামাক চাষিদের সন্তানদের ‘গ্রিন টোব্যাকো সিন্ড্রম’ নামে এক জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়। স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আগেই তামাক চাষের পরিবতের্ কৃষকদের অন্য ফসল চাষে আগ্রহী করে তুলতে কতৃর্পক্ষের দৃষ্টি দেয়ার আহŸান জানান স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষজ্ঞরা।

কৃষিবিদদের মতে তামাকের শিকড় মাটির অনেক গভীর থেকে খাদ্য উপাদান সংগ্রহ করে। ফলে তামাকের জমিতে ৪-৫ বছর পযর্ন্ত অন্য ফসল উৎপাদন হয় না। এ ছাড়া তামাক গাছের পাতা বড় করার জন্য ৩-৪ ফুট লম্বা হলেই মগডাল ভেঙে ‘কারগিল’ নামক সার প্রয়োগ করা হয়। এই ‘কারগিল’ সার অতিমাত্রায় ব্যবহারের ফলে জমির উবর্রতা শক্তি মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ী) উপ-পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, সরকারি কোনো বিধি-নিষেধ না থাকায় তামাক চাষের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা না থাকার সুযোগ নিয়ে টোব্যাকো কোম্পানিগুলো নগদ অথর্ আর নানা সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে এ চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে। এ অবস্থা সত্তে¡ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কৃষি কমর্কতার্রা জমির উবর্রতা নষ্ট ও স্বাস্থ্যের কুফল তুলে ধরে তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

(বুলবুল মল্লিক, ঘাটাইলডটকম)/-