টাঙ্গাইলে ফসলি জমি গিলছে ইটভাটা, নিম্নমানের কয়লা ব্যবহারে পরিবেশে বিপর্যয়

টাঙ্গাইলে দুই ফসলি কৃষি জমি ধংস করে যত্রতত্র ইটভাটা স্থাপন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে জেলায় ২৮৬টি ইটভাটার প্রত্যেকটি ফসলি জমির উপর স্থাপন করা হয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি বিনষ্ট হচ্ছে এবং ইটভাটার কালো ধূয়া ও পোড়া কয়লার বর্জ্যে জেলায় পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

টাঙ্গাইল জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানাগেছে, জেলায় মোট ২৮৬টি ইটভাটা রয়েছে। এরমধ্যে টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় ৪টি, দেলদুয়ারে ২টি, কালিহাতীতে ১৫টি, বাসাইলে ৯টি, ভূঞাপুরে ৬টি, সখীপুরে ৮টি, গোপালপুরে ৬টি, মধুপুরে ২১টি, নাগরপুরে ২২টি, ধনবাড়ীতে ১৯টি, মির্জাপুরে ১০৭টি এবং ঘাটাইল উপজেলায় ৬৭টি ইটভাটা রয়েছে। ইটভাটাগুলোর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেয়েছে ১০৪টি এবং ১৮২টি ইটভাটা কোন ছাড়পত্র পায়নি। এরমধ্যে ছাড়পত্র না পাওয়া ইটভাটাগুলোর মধ্যে ৮১টি উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন ও মন্ত্রণালয়ে আপীল দায়ের করে এবং ২৭টি সনাতনী চিমনী(ড্রাম চিমনী) ব্যবহার করে চালানো হচ্ছে। এসব ইটভাটায় দেদারছে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ২৫৬টি ভাটায় জিগজ্যাগ কিলন পদ্ধতিতে ও মাত্র ৩টি ভাটায় হাইব্রিড কিলন পদ্ধতিতে ইট পোড়ানো হচ্ছে। এছাড়া মাত্র একটি ভাটায় অটোমেটিক পদ্ধতিতে ইট পোড়ানো হচ্ছে।

এসব ইটভাটা ২-৩ ফসলি কৃষি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাহাড়ি ও বনভূমি, জলাধার ও আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। অথচ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন(নিয়ন্ত্রণ ও সংশোধন) আইন-২০১৯ এর সুস্পষ্ট লংঘন। ১০৪টি ইটভাটাকে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ছাড়পত্র দেয়া হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ইটভাটা স্থাপন নীতিমালা মানা হয়নি।

ইটভাটা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, প্রতিটি ভাটায় বছরে ৫ থেকে ৬ মাস সময় ইট পোড়ানো হয়। এক লাখ ইট পোড়াতে প্রায় ২০ টন কয়লার প্রয়োজন হয়। প্রতিটি ভাটায় মৌসুমে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ ইট প্রস্তুত ও পোড়ানো হয়ে থাকে। মৌসুমে প্রতি ভাটায় ইট পোড়াতে ন্যূনতম এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টন কয়লা ব্যয় হয়। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এক টন কয়লা পোড়ালে প্রায় তিন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরিত হয়। বাংলাদেশ ও বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের তুলনায় ভারতীয় কয়লায় ১০ থেকে ১২ ভাগ সালফার বেশি থাকে। দামে কম ও সহজলভ্য হওয়ায় ইটভাটা মালিকদের কাছে ভারতীয় কয়লাই প্রথম পছন্দ।

নিম্নমানের কয়লা পোড়ানোর ফলে মানমাত্রার অতিরিক্ত সালফার, অ্যাশ, মারকারি বা অনুরূপ উপাদান সম্বলিত বিষাক্ত গ্যাস দ্রুত বায়ুপরিমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এতদাঞ্চলের তাপমাত্রা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। শিশুসহ সব বয়সী মানুষের শ্বাসকষ্ট ও হার্ট সহ নানাবিধ রোগ দেখা দিচ্ছে। স্থানীয় বাড়িঘর, বিভিন্ন ধরণের ফসল ও ফলজ-বনজ গাছ বিনষ্ট হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানাগেছে, আবেদিত ইটভাটাগুলোকে গড়ে দুই একর ভূমিতে ভাটা স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। কোন কোন ইটভাটা মালিক ভাটার পরিধি বাড়ালেও তা জেলা প্রশাসনকে অবগত করেন নি।

সরেজমিনে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার গালা ইউনিয়নের সদুল্যাপুর গ্রামে অবস্থিত মেসার্স জেএসপি ব্রিকস, মেসার্স জনতা ব্রিকস, মেসার্স এসএএমএস এণ্টারপ্রাইজ(আইভি), কালিহাতী উপজেলার বানিয়াফৈর গ্রামের মেসার্স আরএসকে ব্রিকস, সিঙ্গাইর গ্রামের আরএম ব্রিকস, বিএসএফ ব্রিকস(অটো জিগজ্যাগ), ঘাটাইলের জামুরিয়ার মেসার্স এসকেবি ব্রিকস, লোকেরপাড়া গ্রামের মেসার্স কনক ব্রিকস, নাগরপুরের ডাঙ্গা এলাকার মেসার্স আবিদ ব্রিকস, মেসার্স রাবিয়া ব্রিকস, মির্জাপুরের হাটুভাঙ্গার মেসার্স এবিএম ব্রিকস, মেসার্স এলবিএম ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি ভাটাই ২-৩ ফসলি জমি ও জলাভূমি বিনষ্ট করে স্থাপন করা হয়েছে। ইটের মাপ দৈর্ঘ্য ২৪২মিমি প্রস্থ ১১৪মিমি ও উচ্চতা ৭০মিমি থাকার কথা থাকলেও ভাটাগুলোতে আকারে ছোট ইটপ্রস্তুত করা হচ্ছে। ভাটাগুলোতে খোলা জায়গায় অবাধে কয়লা ভাঙানো হচ্ছে। নিয়ন্ত্রিত না থাকায় ভাঙানো কয়লার কণা আশপাশের বসতবাড়ির টিন ছিদ্র করছে। এসব ভাটায় দেদারছে নিম্নমানের কয়লা ও কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।

ইটভাটার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মো. জিয়ার আলী, মাকছুদুল হক, রাজা মিয়া জানান, ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভাটা মালিকরা তাদের দুই ফসলি জমি শুধুমাত্র বোরো আবাদের ক্ষতিপুরণে ভাড়া নিয়েছে। অথচ ইটভাটার কয়লার বর্জ্যে তাদের বসতবাড়ির ঘরের টিনে অসংখ্য ছিদ্র দেখা দিয়েছে। বার বার ঘরের টিন বদল করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন। বাড়ির বৃদ্ধ ও শিশুদের শ্বসকষ্ট ও মাথা ব্যাথা নিয়মিত রোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এছাড়া গাছের ডাব, আম, কাঁঠাল অকালে ঝড়ে পড়ছে।

টাঙ্গাইল জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ফিরোজ হায়দার খান জানান, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নয়নের স্বার্থে ইটভাটার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। বর্তমানে স্থায়ী চিমনি নির্মাণ করে জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে ইটভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়ে ইটভাটা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েই তারা ইটভাটা করছেন। যেগুলোর পরিবেশের ছাড়পত্র নেই সেগুলোরও ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হয়েছে। কোন কৃষকের জমি ভাটা মালিকরা জোর করে নেন না। তিনি জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে প্রতিটি ভাটায় ১০ থেকে ১২ লাখ পর্যন্ত কাঁচা ইট নষ্ট হয়ে গছে। ভাটাগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

টাঙ্গাইল পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম জানান, লোকবলের অভাবে কাজ করতে বিবিধ সমস্যা হচ্ছে। ২৮৬টি ইটভাটা পরিদর্শনের জন্য মাত্র একজন ইন্সপেক্টর রয়েছেন। তারপরও ছাড়পত্র না থাকায় ইতোমধ্যে ৮টি ইটভাটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে ৭টি ইটভাটা থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অনেক সময় না পাওয়ায় দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা যায়না। তিনি আরো জানান, ৮১টি ইটভাটা মালিক উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করে ভাটা চালাচ্ছেন। তবে তারা জেলার পরিবেশ রক্ষায় জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

(বুলবুল মল্লিক, ঘাটাইলডটকম)/-