টাঙ্গাইলে দুর্ভোগ মহাসড়ক থেকে মফস্বল পর্যন্ত

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ শুরু হয়েছিল, আজও শেষ হয়নি। অধিকাংশ জায়গায় নির্মাণকাজের কারণে গাড়ি চলাচল ব্যাহত হয়ে তীব্র যানজট বাধাচ্ছে। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার ঢাকা-টাঙ্গাইল ভ্রমণ যানজটে প্রায় চার থেকে পাঁচ-ছয় ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকে।

জেলার আঞ্চলিক সড়কগুলোরও অধিকাংশ বেহাল। ঘাটাইল উপজেলার ঘাটাইল-সাগরদিঘী-ভরাডোবা সড়কে ৪০ কিলোমিটার, জামুরিয়া-ভূঞাপুর সড়কের ২০ কিলোমিটার, মোগলপাড়া-সিংগুরিয়া সড়কের ১০ কিলোমিটার চলাচলের প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঘাটাইল-সাগরদিঘী-ভরাডোবা সড়কের ধলাপাড়া থেকে গুপ্তবৃন্দাবন পর্যন্ত সড়কটি এবং ঘাটাইল-ছুনটিয়া-ভূঞাপুর সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। গুনগ্রাম-সন্ধানপুর সড়কে ইটভাটার মিনি ট্রাক খানাখন্দের সৃষ্টি করেছে। সাগরদিঘী-তালতলা পাকা সড়কটিরও দশা বেহাল।

মহাসড়কের মির্জাপুরের পাকুল্লা থেকে দেলদুয়ারে যাওয়ার সড়কটি খারাপ অবস্থায় রয়েছে। টাঙ্গাইলের ভাতকুড়া থেকে বাসাইল ও সখীপুর যাওয়ার মূল সড়ক সংস্কার করা হলেও তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নুর ই আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ভাতকুড়া-বাসাইল সড়ক মেরামতের জন্য একটি প্রকল্প প্ল্যানিং কমিশনে রয়েছে। প্রক্রিয়া শেষে বরাদ্দ এলেই মেরামতকাজ শুরু হবে।

মির্জাপুরের মির্জাপুর-ওয়ার্শী-বালিয়া সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সংসদীয় কমিটির দুই সদস্যের উপকমিটির তদন্তেও সেই অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সড়ক নষ্ট হয়ে গেছে। ঠিকাদার কাজ শেষ না করেই বিল তুলে নিয়েছেন।

টাঙ্গাইলে সড়কগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা টাঙ্গাইল পৌর এলাকায়। নিরালা মোড় থেকে দিঘুলিয়া, পার্ক বাজারের সামনে থেকে হোমিও কলেজের সামনে, রেজিস্ট্রিপাড়া, নতুন বাস টার্মিনাল মিল্ক ভিটা থেকে দেওলা উত্তরপাড়া হয়ে কান্দিলা বাইপাস পর্যন্ত, কোদালিয়া, সাবালিয়া, কলেজপাড়া এলাকায় সড়কের বেহালদশা। তবে সমপ্রতি কিছু অংশে সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ড্রেন নির্মাণের কারণে সড়কে আবার যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মসজিদ রোড এলাকার মো. আব্দুল হালিম বলেন, কাজ ধীরে ধীরে চলায় অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। রেজিস্ট্রিপাড়ার মো. সেলিম রেজা বলেন, এলাকায় শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও রাস্তাঘাটের কোনো উন্নয়ন নেই। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তা তলিয়ে যায়। বটতলা এলাকার মো. শামীম বলেন, পৌরসভার বেশির ভাগ রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী।

সরেজমিনে দেখা যায়, টাঙ্গাইল শহর বাইপাস থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়কের অংশে চার লেনের কাজ মোটামুটি শেষের দিকে। রাবনা থেকে আগবিক্রমহাটি পর্যন্ত কিছু কিছু অংশে নতুন লেনের কাজ চলছে। আগের লেনে কয়েক জায়গায় ছোট ছোট খানাখন্দ রয়েছে;  বিক্রমহাটি থেকে রসুলপুর পর্যন্তও একই অবস্থা। রসুলপুর স্কুলের সামনে মহাসড়কের কিছু অংশে পুরনো লেনে কাজ চলছে। পৌলীর পর থেকে এলেঙ্গার দিকে কিছু অংশে পুরনো লেন আগের মতোই রয়েছে। সেখানে নতুন লেনের কাজ শুরু হয়েছে। এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের কাছে কিছু অংশে পিচ-পাথর উঠে গেছে। খানাখন্দও তৈরি হয়েছে। এলেঙ্গা ওভার ব্রিজের নিচের অংশেও পিচ উঠে গেছে। সেখানে ইটের সলিং দেওয়া হয়েছে। শহর বাইপাসের আশেকপুর থেকে করটিয়া পর্যন্ত পুরনো লেনের পাশাপাশি নতুন লেনের কাজ চলছে। পুরনো অংশের কিছু কিছু জায়গায় ছোট ছোট গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। করাতিপাড়া, শুভুল্লা, ধল্যা, মির্জাপুরের পাকুল্লা বাজার এলাকায়ও প্রায় একই অবস্থা। মহাসড়কের অধিকাংশ নতুন সেতুর উভয় পাশে সংযোগ স্থানে পাকা করা হয়নি।

পুলিশের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর রফিকুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কের নতুন সেতুগুলোর কাছে কাজ বাকি আছে। এলেঙ্গার কাছে প্রায় চার শ ফুট জায়গা মহাসড়ক প্রকল্পের বাইরে। সেখানে ইটের ওপর দিয়ে সামান্য পিচের ঢালাই দেওয়া হয়েছে। এখানে গাড়ির গতি কমে গিয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া বাসস্ট্যান্ডের দক্ষিণে মহাসড়কে ‘এস’ আকারে কিছু অংশ বাদ রেখে উভয় পাশে পাকা করা হয়েছে। এখানে গাড়ি এসে আটকে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের চার লেন প্রকল্পের ডেপুটি প্রজেক্ট ম্যানেজার-৪ শেখ মুহাম্মদ শাহারুল আমীন বলেন, ‘নির্ধারিত সময় ২০১৯ সালের মার্চের মধ্যেই কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। নতুন লেনের কাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি পুরনো লেনের কাজও করা হচ্ছে। আগামী রমজানের মধ্যে বেশির ভাগ সেতুর কাজ শেষ করে গাড়ি চলাচলের জন্য ছেড়ে দেওয়া যাবে।’

ঘাটাইল উপজেলা প্রকৌশলী এ কে এম হেদায়েত উল্লাহ বলেন, কোনো বিধিমালা না মেনে যানবাহন চলায় সড়কগুলোর এমন বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পেলেই সড়কের সংস্কারকাজ করা হবে।

টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় বলছে, শহরের ৩১ কিলোমিটার সড়কের মেরামতকাজ শুরু হয়েছে। ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ড্রেন নির্মাণ হচ্ছে ১৮ কিলোমিটার। এর ৫০ শতাংশ কাজ হয়েছে। দুটোরই কাজ জুনের মধ্যে ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হবে। ড্রেনসহ সড়কের কাজ সম্পন্ন করতে মোট ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬৬ কোটি টাকা। শহরে আরো প্রায় এক শ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা খারাপ উল্লেখ করে পৌরসভা থেকে জানানো হয়, প্রায় এক শ কিলোমিটার ড্রেনও নির্মাণ করা প্রয়োজন।

চলতি বছরের মধ্যে টাঙ্গাইল পৌর এলাকার সড়কের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে আশ্বাস দিয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র জামিলুর রহমান মিরন বলেন, টানা বৃষ্টি না হলে আগামী জুনের মধ্যে মূল পৌরসভার সব সড়কের মেরামতকাজ শেষ করা হবে। আশপাশের সড়কের কাজ করতেও ইতিমধ্যে সরকারের ১৪ কোটি টাকা এবং কুয়েত ফান্ডের প্রায় ৪০ কোটি টাকার প্রকল্প পাস হয়েছে।

(অরণ্য ইমতিয়াজ, কালেরকণ্ঠ/ ঘাটাইল.কম)/-