টাঙ্গাইলে ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনির শিকার ৯ জন, পুলিশের বিশেষ তৎপরতা

সারাদেশে চলছে ছেলেধরা গুজব। এই সন্দেহে টাঙ্গাইলের ৪টি উপজেলায় ৯জন গণপিটুনি ও হামলার শিকার হয়েছেন। তবে তাদের কাউকেই ছেলেধরার সাথে কোন সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এ ধরনের ঘটনা সচেতনতার অভাব, মানবাধিকার লংঘন ও সামাজিক অবক্ষয়ের উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনেরা। পুলিশ গণধোলাইকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন এবং গুজব ঠেকাতে চালাচ্ছে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা।

জানা যায়, টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে ২ যুবককে গত (২১ জুলাই) গণধোলাই দেয়া হয়। উপজেলার গালা ইউনিয়নের কান্দিলা বাজারে আকাশ নামের এক ব্যক্তিকে মারধর করা হয়। সে গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরের মৃত আবদুর রহমানের ছেলে। টাঙ্গাইল পৌরসভার শান্তিকুঞ্জ মোড়ে এক যুবককে ছেলেধরা সন্দেহে স্থানীয়রা গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দেন। তাদের দুইজনকেই টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

টাঙ্গাইল সদর থানার (ওসি) মীর মোশারফ হোসেন বলেন, একজন মানসিক প্রতিবন্ধী, আরেকজন ভবঘুরে। দুইজনেরই কেউই ছেলেধরার সাথে জড়িত নয়।

কালিহাতী উপজেলার সয়া হাটে গত (২১ জুলাই) মাছ ধরার জাল কিনতে এসে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন মিনু মিয়া (৩০) নামের এক ভ্যান চালক। তিনি ভূঞাপুর উপজেলার বন্যা কবলিত টেপিবাড়ী গ্রামের মৃত কোরবান আলীর ছেলে। তিনি বর্তমানে ঢাকায় চিকিৎসাধীন আছেন। এ ঘটনায় মিনুর ভাই বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ৬ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কালিহাতী থানার (ওসি) হাসান আল মামুন।

এদিকে কালিহাতীর বলদী গ্রামে গত (২৩ জুলাই) বিকালে শামীম মিয়া (৪০) নামের ধানকাটার এক শ্রমিককে ছেলেধরা সন্দেহে এলাকাবাসী আটকে রেখে পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর থানার কাউয়াকোলা ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে।

কালিহাতীর থানার (এসআই) ওহাব মিয়া বলেন, শামীম কানে কম শোনেন। তাকে সেই রাতে পরিবারের লোকজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিকট হস্তান্তর করা হয়।

ভূঞাপুরে ছেলেধরা সন্দেহে শিউলি আক্তার (৩০) নামের এক নারীকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয়রা। গত (২৩ জুলাই) বিকেলে উপজেলার মাটিকাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। শিউলি আক্তার ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার চেচুয়া গ্রামের আমির উদ্দিনের মেয়ে।

ভূঞাপুর থানার (ওসি) রাশেদুল ইসলাম বলেন, মানসিকভাবে অসুস্থ্য ওই নারী বাড়ি থেকে বেশ কিছুদিন আগে চলে যান। পথে তার সাথে থাকা ঝোলা দেখে এলাকাবাসীর সন্দেহ হয়। ঝোলাটি চেক করার সময় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। পরে জনতা কিলঘুষি দেন। খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার এবং পরিবারের কাছে হস্তান্তর করি।

গত মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) রাতে ঘাটাইলের পশ্চিম সিংগুরিয়া এলাকার শাহজাহান আলীর ছেলে কাভার্ট ভ্যানচালক সোহরাব আলী বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় হোমেরা নামক এক মহিলা ছেলেধরা বলে চিৎকার দিলে লোকজন তাকে হামলা করেন। মারপিট থেকে বাঁচতে সোহরাব আলী পাশের পুকুরে লাফ দেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। তবে স্থানীয়দের ধারণা পরকিয়া সংক্রান্ত বিষয় এখানে রয়েছে।

সবশেষে সখীপুরের কুতুবপুর থেকে গত বুধবার (২৪ জুলাই) ৩ নারীকে গণধোলাই না দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী।

সখীপুর থানার (ওসি) আমির হোসেন বলেন, তাদের মধ্যে কবির হোসেনের স্ত্রী আলপনা (৩২) এবং জহুরুল ইসলামের স্ত্রী তানিয়ার (৩০) বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকার উথুরা গ্রামে। তারা কবিরাজ দেখানোর জন্য এসেছিলেন। বৃহস্পতিবার (২৫ জুলাই) পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

অপরজন খাদিজা আক্তার (৩৫) একেক সময় একেক পরিচয় বলায় তাকে আদালতে চালান করা হয়েছে। তবে ছেলেধরার সাথে তাদের কোন সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

টাঙ্গাইল জেলা মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান আজাদ বলেন, ছেলেধরা সন্দেহে কোন ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেয়া মানবাধিকারের চরম লংঘন।

টাঙ্গাইলের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট এস আকবর খান বলেন, পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে এই গুজব ছড়িয়ে একটি গোষ্ঠী সুকৌশলে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। সন্দেহের বশে কাউকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা বা আহত করা ফৌজদারী অপরাধ। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দরকার।

বঙ্গের আলীগড় খ্যাত টাঙ্গাইলের করটিয়ার সরকারি সা’দত কলেজের উপাধ্যক্ষ মৃদুল চন্দ্র পোদ্দার বলেন, এভাবে অমানবিকভাবে গণপিটুনি দেয়া আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের উদাহরণ। এর বিরুদ্ধে জনগণকে আরো সচেতন ও প্রতিবাদী হতে হবে। মানুষের মধ্যে বর্তমানে একটা চাপা আতংক বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, টাঙ্গাইলে যাদের ছেলেধরা সন্দেহ করা হয়েছে, তারা সবাই গুজবের শিকার। টাঙ্গাইল জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জনগনকে সচেতন করার জন্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সেইসাথে গুজব সৃষ্টি ও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, কাউকে সন্দেহ হলে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে নিকটস্থ পুলিশ স্টেশন কিংবা ৯৯৯ কল করার জন্যে জনগনকে অনুরোধ করছি।

(কাজল আর্য, ঘাটাইলডটকম)/-