টাঙ্গাইলে কাগমারী পরগনা যেভাবে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বিখ্যাত তাজমহল যিনি নির্মাণ করেছিলেন, সেই সম্রাট শাহজাহানের বন্দীদশায় ১৬৫৯ খ্রীষ্টাব্দে পূত্র আওরঙ্গজেব পিতার সিংহাসনে আরোহন করেন। সিংহাসন আরোহনের অভিষেক অনুষ্ঠানে সারা ভারতবর্ষের জ্ঞানী, গুনী, পন্ডিতজনদের সাথে আওরঙ্গজেবের সতীর্থ সূদুর কাশ্মীর হতে আগত পীর শাহজামান কাশ্মীরীও উপস্থিত ছিলেন। এখানেই তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হন টাঙ্গাইলের আতিয়া পরগনা এবং মধুপুরের রসুলপুর পরগনার মধ্যবর্তী কাগমারী পরগনার মিশনারী কাজের।

নতুন সম্রাট তাঁকে তাঁর মিশনারীর ব্যয় বহনের জন্য সেদিনের খোশনদপুর (আজকের সন্তোষ) গ্রামসহ ২২ টি গ্রাম ওয়াকফ্ করে তামার পাত্রে লিখে দেন। পীর শাহজামান কশ্মীরী পার্শ্ববর্তী পরগনার মিশনারী কর্মীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে খোশনদপুরকে কেন্দ্রস্থল নির্ধারণ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মুসাফিরখানা, দাতব্য চিকিৎসালয়, পশু হাসপাতাল পরিচালনা ও সমাজ হিতৈশী কাজ শুরু করেন।

এসময় নিঃসন্তান পীর শাহজামান তাঁর মিশনারী কাজের উত্তসূরী হিসেবে ইন্দ্রনারায়ন চৌধুরী ওরফে শাহ এনায়েতউল্লাহ চৌধুরীকে মিশনারী কাজে তালিম দিতে থাকেন।

১৭১৮ খ্রিষ্টাব্দে ৯১ বছর বয়সে পীর শাহজামানের মৃত্যুর পর ৩২ বছর বয়সে মিশনের দ্বিতীয় মুতোয়াল্লী হিসেবে দায়িত্বভার বুঝে নেন শাহ এনায়েতউল্লাহ চৌধুরী। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে কাগমারী পরগনার মিশনারী কাজ বেশ সফলতার সাথে পরিচালিত হতে লাগলো।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর প্রায় সমবয়সী কাকা ব্রজমোহন চৌধুরীর নেতৃত্বে শুরু হয়ে যায় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র; যাকে তিনি তাঁর মিশন পরিচালনার কাজে সহযোগী নিয়োজিত করেছিলেন। মিশনারী কাজ যখন প্রায় মধ্যগগনে, শাহ এনায়েতউল্লাহ চৌধুরী হজব্রত পালনের জন্য সৌদি গমন করেন। হজব্রত পালন শেষে দেশে ফেরার পথে যশোরের কোন এক স্থানে কাকা ব্রজমোহনের গুপ্ত ঘাতক দ্বারা তিনি শহীদ হন। এসময় তাঁর একমাত্র পূত্রকেও হত্যা করা হলে স্ত্রী (যিনি নবান মুর্শিদকুলী খাঁর পরিবারের সদস্য) মুর্শিদাবাদে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরপর ব্রজমোহনকে গ্রেফতার করে মুর্শিদাবাদ নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কারাধ্যক্ষ বিশ্বেশ্বর রায়ের কারসাজীতে ছাড়া পেয়ে ব্রজমোহন মিশনের সম্পত্তি ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তর করেন। রাতারাতি খোশনদপুর নাম পাল্টিয়ে সন্তোষ নামকরণ করেন।

১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে কুখ্যাত চীরস্থায়ী বন্দোবস্তকালে খোশনদপুর ওয়াকফ্ স্টেট অভিশপ্ত এক জমিদারীতে রূপান্তরীত হয়ে যায়। এরপর প্রায় ১৯০ বছর পর (১৭৪০-১৯৩০) ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আসাম থেকে সন্তোষে পদার্পণ করেন এবং ওয়াকফ্ সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি মামলাও রুজু করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সন্তোষের জমিদারের পাশাপাশি দেলদুয়ার, ধরবাড়ির জমিদারেরাও মওলানা ভাসানীর প্রতি উঠে পরে লাগেন।

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে জমিদার ও বৃটিশ সরকারের যোগসাজশে ভাসানীকে তদানীন্তণ ময়মনসিংহ জিলা হতে বহিস্কার করা হয়। মওলানা ভাসানীও মামলার রায় ও অত্যাচারিত জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর নেতৃত্বে ‘পীর শাহজামান দিঘী’ দখলের মধ্য দিয়ে সন্তোষ ফিরে পায় তার হারানো স্বাধীনতা। বিনা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পুনরুদ্ধার হয় কাগমারী পরগনার ওয়াকফকৃত সম্পদ।

১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মওলানা ভাসানী সন্তোষ-কাগমারীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন এবং তৎলক্ষ্যে কাগমারীতে ‘মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ‘সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন। প্রণয়ন করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ও রূপরেখা।

১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ০১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা যাত্রা শুরু হয়। চারটি স্তরে ভাগ করা হয় এর শিক্ষা কার্যক্রম। যথাঃ ১) নার্সারী থেকে ৮ম শ্রেনী ২) ৯ম থেকে ১০ম শ্রেণী ৩) একাদশ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী। ১৯ টি একাডেমি অর্থাৎ অনুষদ এবং ৬০টি বিভাগ অনুমোদনের মধ্য দিয়ে এর কাঠামো প্রবর্তিত হয়। যার মধ্যে ৩০ টিই প্রত্যক্ষ বিজ্ঞান বিষয়ক।

১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জুলাই ১০০ জন ছাত্র থেকে বাছাই করা ১৮ জন ছাত্র নিয়ে শুরু করা হয় থিসিস কোর্স। প্রকল্পের উদ্ভোধন করেন মওলানা ভাসানী নিজে। ওআইসির তৎকালীণ মহাসচিব ড. করিম ঘাইকে চিঠি লিখে তিনি ওআইসি প্রস্তাবিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়টি সন্তোষে করার জন্য পত্র পাঠান। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর সেই স্বপ্ন থমকে দাঁড়ায়। এরপর ১৯৮৩ খৃষ্টাব্দে তৎকালীণ রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ‘সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বোর্ড অব ট্রাষ্টিজ’ গঠন করেন।

১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১২ অক্টোবর তৎকালীণ ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন।

পুনশ্চঃ “কাগমারী পরগণার এই ইতিহাস যাহা সম্রাট আওরঙ্গজেবের সনদ দান হইতে শুরু হইয়া পীর শাহজামানের (রঃ) জনকল্যাণমূলক কর্মসূচী, শাহ এনায়েতউল্লাহর শাহাদত, মুতাওয়াল্লী পদাধিকারের হস্তান্তর, সুবাদার মুর্শিদকুলী খাঁর হস্তক্ষেপ ইত্যাদির ধারাবাহিকতা যে সকল রেকর্ডপত্র ঘাটিলে সুস্পষ্ট হইয়া উঠিবে সেইগুলির মধ্যে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর পাঁচ ও দশ সালা বন্দোবস্ত পত্র, কর্ণওয়ালিশ ও তৎপরবর্তী শাসকদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ১২৫২ ও ১২৭২ সালের সার্ভে রিপোর্ট, মিঃ স্যাকসীর রিপোর্ট ইত্যাদি অন্যতম। তাছাড়া মোমেনশাহী কালেক্টরেট অফিসে পেশকৃত মওলানা ভাসানীর মামলার নথিপত্র ও সমকালীণ পত্র পত্রিকার রিপোর্ট বিশেষভাবে সহায়তা করিবে।”

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইলডটকম)/-