টাঙ্গাইলের ১৫০তম জন্মদিন আজ

নদী-চর-খাল-বিল গজারির বন, টাঙ্গাইল শাড়ি তার গর্বের ধন’- ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক স্বর্ণগর্ভা ‘টাঙ্গাইল’- এর আজ ১৫০তম জন্মদিন তথা প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। আজ থেকে ১৪৯ বছর আগে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ নভেম্বর ‘আটিয়া’ থেকে মহকুমা সদর দপ্তর টাঙ্গাইলে স্থানান্তর করা হয়। মূলত: ওই সময়টাকেই ‘টাঙ্গাইল’- এর প্রতিষ্ঠাকাল বা জন্মদিন হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুফাখখারুল ইসলাম তার ‘টাঙ্গাইল জেলার সাধারণ ইতিহাস প্রসঙ্গে’ শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মীর কাশিম নওয়াব হওয়ার পর খাজনা আদায়ের যে নতুন বন্দোবস্ত করেন তার আওতায় টাঙ্গাইল অঞ্চলের আটিয়া, কাগমারী, বড়বাজু, হোসেনশাহী ইত্যাদি পরগনার দায়িত্ব চারজন মুসলমান তালুকদার প্রাপ্ত হন। পূর্ব থেকেই কাগমারীর জমিদার ছিলেন ধর্মান্তরিত মুসলমান ইনায়াতুল্লাহ খাঁ চৌধুরী। তার বাড়ি ছিল বর্তমান টাঙ্গাইল শহরের উত্তর-পশ্চিম কোণে। তার নামানুসারেই এলাকাটির নাম এখন পর্যন্ত ইনায়াতপুর।

১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে আটিয়া, পিংনা ও মধুপুর থানা সমন্বয়ে আটিয়াকে মহকুমায় উন্নীত করা হয়। এরপর আটিয়া মহকুমা সদর টাঙ্গাইলে স্থানান্তরিত হলে আটিয়া মহকুমা নামটির বিলুপ্তি ঘটে।’

প্রসঙ্গত: বাণিজ্যিক নৌপরিচালনার সুবিধার্থে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জরিপবিদ ও প্রকৌশলী জেমস রেনেলকে বঙ্গীয় নদীব্যবস্থার জরিপ ও এর মানচিত্র প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। রেনেল ১৭৬৩ থেকে ১৭৭৩ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের তরফে বাংলার এক সেট মানচিত্র প্রস্তুত করেন। তাঁর ১৭৭৯ সালে মুদ্রিত বেঙ্গল এ্যাটলাস (Bengal Atlas) বাণিজ্যিক, সামরিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে একটি অতিমূল্যবান কাজ। শিক্ষামূলক, প্রশাসনিক ও নৌ-পরিচালনা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই মধ্য উনিশ শতকে পেশাগত মানচিত্রের আত্মপ্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত রেনেলের মানচিত্রই একমাত্র নির্ভরযোগ্য নির্দেশক ছিল।

উইকিপিডিয়া বলছে, টাঙ্গাইলের নামকরণ বিষয়ে বহু জনশ্রুতি ও নানা মতামত রয়েছে। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রেনেল তাঁর মানচিত্রে এ সম্পূর্ণ অঞ্চলকেই আটিয়া বলে দেখিয়েছেন। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের আগে টাঙ্গাইল নামে কোনো স্বতন্ত্র স্থানের পরিচয় পাওয়া যায় না। টাঙ্গাইল নামটি পরিচিতি লাভ করে ১৫ নভেম্বর ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে মহকুমা সদর দপ্তর আটিয়া থেকে টাঙ্গাইলে স্থানান্তরের সময় থেকে।

ইতিহাস প্রণেতা খন্দকার আব্দুর রহিম সাহেবের ‘টাঙ্গাইলের ইতিহাস’ গ্রন্থে, ইংরেজ আমলে এদেশের লোকেরা উচু শব্দের পরিবর্তে ‘টান’ শব্দই ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিল বেশি। এখনো টাঙ্গাইল অঞ্চলে টান শব্দের প্রচলন আছে। এই টানের সাথে আইল শব্দটি যুক্ত হয়ে হয়েছিল টান আইল। আর সেই টান আইলটি রূপান্তরিত হয়েছে টাঙ্গাইল।

টাঙ্গাইলের নামকরণ নিয়ে আরো বিভিন্নজনে বিভিন্ন সময়ে নানা মত প্রকাশ করেছেন।

কারো মতে, নবাব মুর্শিদকুলী জাফর খাঁর আমলে টাঙ্গাইল ছিল কাগমারী পরগনার অন্তর্গত। জমিদার ইনায়াতুল্লাহ খাঁ লৌহজং নদীর টানের (উঁচু) আইল দিয়ে যে পথে ক্রোশখানেক পশ্চিম-দক্ষিণে খুশনুদপুর কাছারিতে যাতায়াত করতেন সেই ‘টানের আইল’ শব্দটি উচ্চারিত হতে হতে ‘টান-আইল’ এবং পরে রূপান্তরিত হয়ে ‘টাঙ্গাইল’ হয়।

পরবর্তী সময় ইনায়াতুল্লাহ খাঁর কাগমারী জমিদারী বেদখল হয় এবং জবরদখলকারীদের কারসাজিতে খুশনুদপুর নামটি ‘সন্তোষ’ হয় বলে জানা যায়।

আবার কারো কারো মতে, ব্রিটিশ শাসনামলে মোগল প্রশাসন কেন্দ্র যখন আটিয়াতে স্থাপন করা হয় তখন এই অঞ্চল জমজমাট হয়ে উঠে। সে সময়ে ঘোড়ার গাড়ি ছিল যাতায়াতের একমাত্র বাহন- যাকে বর্তমান টাঙ্গাইলের স্থানীয় লোকেরা বলত টাঙ্গা বা টমটম, ‘টাঙ্গা’ শব্দটি মূলত: ঘোড়ার গাড়ি চালকরা বেশি ব্যবহার করত এবং ঘোড়ার গাড়ি চালকদের টাঙ্গা বা টাঙ্গাওয়ালা বলা হত।

ইতিহাসবিদদের একটি ভ্রান্ত ধারণা উপস্থাপন যুক্তিযুক্ত ; তা হলো- অনেকেই বলেন ঘোড়ার গাড়িকে ‘টাঙ্গা’ বলা হত। কিন্তু মূলত: তা নয়- ঘোড়ার গাড়ি চালককে বলা হত ‘টাঙ্গা’ বা টাঙ্গাওয়ালা। এই টাঙ্গাওয়ালারা ঘোড়ার গাড়িকে বেশির ভাগ সময় লাগাম ধরে টেনে বা লাগাম হাতে হেটে হেটে গন্তব্যে পৌঁছত। এ প্রসঙ্গে বর্তমান শতকের মাঝামাঝি পর্যন্তও এ অঞ্চলের ঘোড়ার গাড়ি বা টমটম গাড়ির চলাচল স্থল পথে সর্বত্র ছিল।

আল শব্দটির কথা এ প্রসঙ্গে চলে আসে। বর্তমান টাঙ্গাইল অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানের নামের সাথে এই আল শব্দটির যোগ লক্ষ্য করা যায়। আল শব্দটির অর্থ সম্ভবত সীমা নির্দেশক যার স্থানীয় উচ্চারণ আইল। একটি স্থানকে যে সীমানা দিয়ে বাঁধা হয় তাকেই আইল বলা হয়।

টাঙ্গাওয়ালাদের বাসস্থানের সীমানাকে টাঙ্গা+আইল এভাবে যোগ করে হয়েছে টাঙ্গাইল, এ মতটি অনেকে পোষণ করেন। আইল শব্দটি কৃষিজমির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই শব্দটি আঞ্চলিক ভাবে বহুল ব্যবহৃত শব্দ।

টাঙ্গাইলের ভূ-প্রকৃতি অনুসারে স্বাভাবিক ভাবে এর ভূমি উঁচু এবং ঢালু। স্থানীয়ভাবে যার সমার্থক শব্দ হলো টান। তাই এই ভূমিরূপের কারণেই এ অঞ্চলকে হয়তো পূর্বে টান আইল বলা হতো। যা পরিবর্তীতে টাঙ্গাইল নাম ধারণ করেছে।

টাঙ্গাইল জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত যা ঢাকা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। এর জনসংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ এবং আয়তন ৩৪১৪.৩৫ বর্গ কিলোমিটার। টাঙ্গাইল আয়তনের ভিত্তিতে ঢাকা বিভাগের সর্ববৃহৎ এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে ২য় সর্ববৃহৎ জেলা।

১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দ অবধি টাঙ্গাইল ছিল অবিভক্ত ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা ; ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়।

টাঙ্গাইল একটি নদী বিধৌত কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এই জেলা যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত এবং এর মাঝ দিয়ে লৌহজং নদী প্রবাহমান।

দর্শনীয় স্থান

রাবার বাগান পীরগাছা, ফালুচাঁদ চীশতি এর মাজার সখিপুর, আতিয়া মসজিদ, মধুপুর জাতীয় উদ্যান, যমুনা বহুমুখী সেতু, আদম কাশ্মিরী-এর মাজার, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মাজার, পরীর দালান / হেমনগর জমিদার বাড়ি, খামারপাড়া মসজিদ ও মাজার, ঝড়কা ঘাটাইল, সাগরদীঘি ঘাটাইল, গুপ্তবৃন্ধাবন ঘাটাইল, পাকুটিয়া আশ্রম ঘাটাইল, ভারতেশ্বরী হোমস মির্জাপুর, মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, পাকুল্লা মসজিদ, আরুহা- শালিনাপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, নাগরপুর চৌধুরীবাড়ী, পুন্ডরীকাক্ষ হাসপাতাল, উপেন্দ্র সরোবর, গয়হাটার মঠ, তেবাড়িয়া জামে মসজিদ, এলেঙ্গা রিসোর্ট, যমুনা রিসোর্ট, কাদিমহামজানি মসজিদ, ঐতিহ্যবাহী পোড়াবাড়ি, করটিয়া সা’দত কলেজ, কুমুদিনী সরকারি কলেজ, বিন্দুবাসিনী বিদ্যালয়, দোখলা ভিআইপ রেস্ট হাউস মধুপুর,ভূঞাপুরের নীলকুঠি, শিয়ালকোল বন্দর, ধনবাড়ী মসজিদ ও ধনবাড়ী নবাব প্যালেস, নথখোলা স্মৃতিসৌধ, বাসুলিয়া, রায়বাড়ী, কোকিলা পাবর স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ, ধলাপাড়া চৌধুরীবাড়ী ঘাটাইল, মহেরা জমিদার বাড়ি, রাধা কালাচাঁদ মন্দির, পাকুটিয়া জমিদার বাড়ী, বনগ্রাম গনকবর, স্বপ্ন বিলাস (চিড়িয়াখানা), মোকনা জমিদার বাড়ী, তিনশত বিঘা চর সখীপুর, ভারতেশ্বরী হোমস, বায়তুল নূর জামে মসজিদ, দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি, নাগরপুর জমিদার বাড়ি, এলাসিন ব্রিজ, ডিসি লেক টাঙ্গাইল, সোল পার্ক, ২০১ গম্বুজ মাসজিদ, চারান বিল ইত্যাদি ইত্যাদি।

বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামছুল হক, প্রতুল চন্দ্র সরকার, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, অমৃতলাল সরকার, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহা, বেগম ফজিলতুন্নেসা জোহা, সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী, প্রতুল চন্দ্র সরকার, আবু সাঈদ চৌধুরী, কানাইলাল নিয়োগী, প্রতিভা মুৎসুদ্দি, রফিক আজাদ, বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী, মামুনুর রশীদ, মান্না, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আব্দুল হামিদ খান ইউস্ফজী, রিয়াজউদ্দিন আহম্মদ মাশহাদী, নওশের আলী খান ইউস্ফজী, মির্জা মাজহারুল ইসলাম, হেমচন্দ্র চৌধুরী, ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, হাতেম আলী খান, মন্মথনাথ রায় চৌধুরী, শাহজামান, মৌলভী মোহাম্মদ নঈমউদ্দিন, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, আবদুল করিম গজনবী, রজনীকান্ত গুহ, আবদুল হালিম গজনবী, রণদা প্রসাদ সাহা, মুফাখখারুল ইসলাম, অধ্যাপক মফিজ উদ্দিন আহমেদ, আলীম আল রাজী, শামসুল আলম, আবদুস সাত্তার, আব্দুল মান্নান, অধ্যক্ষ হুমায়ুন খালিদ, অতুল চন্দ্র গুপ্ত, জাহ্নবী চৌধুরানী, রানী দিনমনি চৌধুরানী, আবু কায়সার, কামাক্ষা নাথ সেন, নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত, প্রমথনাথ রায় চৌধুরী, বস্কিম চন্দ্র সেন, ভবানী প্রসাদ, রসিক চন্দ্র বসু, লোকমান হোসেন, শ্রীনাথ চন্দ্র, মহিম চন্দ্র ঘোষ, অনুপম ঘটক, মোসলেমউদ্দিন খান, সৈয়দ রেদওয়ানুর রহমান, বিনোদ লাল, অমরেন্দ্র নাথ ঘোষ, ভূবনেশ্বর চক্রবর্তী, তারাপদ রায়, ব্যারিস্টার শওকত আলী খান, দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, বিজ্ঞানী মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম, লায়ন নজরুল ইসলাম, অধ্যক্ষ বন্দে আলী মিয়া। আরও অনেক গুণীজন টাঙ্গাইলের মাটিতে জন্মগ্রহন করে টাঙ্গাইলকে ধন্য করেছেন।

(বুলবুল মল্লিক/ উইকিপিডিয়া/ ঘাটাইলডটকম)/