টাঙ্গাইলের নায়ক মান্না বিহীন এক যুগ

আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি, বাংলা চলচ্চিত্রের আরেক প্রদীপ নিভে যাওয়ার দিন। আজ থেকে ১১ বছর আগে ২০০৮ সালে আজকের এই দিনে না ফেরার দেশে চলে যান ঢাকাই চলচ্চিত্রের তুমুল জনপ্রিয় নায়ক টাঙ্গাইলের মান্না। সে সময় মান্নার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৪ বছর।

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গায় ১৯৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন মান্না। তার আসল নাম এস এম আসলাম তালুকদার। ১৯৮৪ সালে তিনি এফডিসির নতুন মুখের সন্ধান কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে আসেন। নায়ক রাজ রাজ্জাক মান্নাকে প্রথম চলচিত্রে সুযোগ করে দেন। তার অভিনীত প্রথম চলচিত্র ‘তওবা’।

এরপর একের পর এক ব্যবসা সফল চলচিত্রে অভিনয় করে, নিজেকে সেরা নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। সমগ্র চলচ্চিত্র জীবনে তিনি প্রায় তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তার সিনেমায় বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের কথা উঠে এসেছে। মান্না বঞ্চিত মানুষের কথা সিনেমার পর্দায় সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন তার অভিনয়ের মাধ্যমে।

তার অভিনীত প্রথম সিনেমার নাম ‘তওবা’ হলেও প্রথম মুক্তি পায় ‘পাগলি’। ১৯৯১ সালে মোস্তফা আনোয়ার পরিচালিত ‘কাসেম মালার প্রেম’ সিনেমায় একক নায়ক হিসেবে প্রথম সুযোগ পান। ‘কাসেম মালার প্রেম’ সিনেমার দারুন ব্যবসায়িক সাফল্যের কারণে মান্না ঘুরে দাড়ানোর সুযোগ পান। তাকে নিয়ে পরিচালকেরা আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন। এরপর কাজী হায়াত পরিচালিত ‘দাঙ্গা’ ও ‘ত্রাস’ সিনেমার কারনে, তার একক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সহজ হয়ে যায়।

এরপর মোস্তফা আনোয়ারের ‘অন্ধ প্রেম’, মনতাজুর রহমান আকবরের ‘প্রেম দিওয়ানা’, ‘ডিস্কো ড্যান্সার’, ‘বাবার আদেশ’, কাজী হায়াতের ‘দেশদ্রোহী’, ‘তেজী’ সিনেমাগুলো মান্নার অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৯৭ সালে মান্না ‘লুটতরাজ’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথম সিনেমা প্রযোজনায় নামেন।

১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে মুক্তি পায় মনতাজুর রহমান আকবরের ‘শান্ত কেনো মাস্তান’ ও ‘কে আমার বাবা’। ১৯৯৯ সালে মান্না অভিনীত কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’ সিনেমাটি বাংলা চলচিত্র ইতিহাসের অন্যতম ব্যবসা সফল চলচিত্র।

মান্না শুধু জনপ্রিয় চলচিত্র অভিনেতাই ছিলেন না, ছিলেন সফল একজন চলচিত্র প্রযোজক। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম কৃতাঞ্জলি চলচিত্র। এ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সিনেমাই ব্যবসা সফল। ছবিগুলো হচ্ছে ‘লুটতরাজ’, ‘লাল বাদশা’, ‘আব্বাজান’, ‘স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ’, ‘দুই বধূ এক স্বামী’, ‘মনের সাথে যুদ্ধ’, ‘মান্না ভাই’ ও ‘পিতা মাতার আমানত’।

মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মান্না বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আজ মান্নাকে স্মরণ করবে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি। জানা গেছে, সকালে কোরআন খতম ও আসর নামাজের পর এফডিসিতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির কার্যালয়ে স্মরণসভা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি এসময় চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মান্নাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করবেন।

২০০৩ সালে মান্না শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯৯ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসাবে বাচসাস পুরস্কার এবং মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার পান। এছাড়া ২০০০ এবং ২০০৭ সালেও মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার পান।

২০০৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। এফডিসিতে লোকে লোকারণ্য। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। প্রধান গেটে তালা দেয়া। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষীর সঙ্গে যোগ দিয়েছে পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্য। কারণ এফডিসির গেটের বাইরে হাতিরঝিল মোড় থেকে সোনারগাঁও হোটেল পার হয়ে বাংলামোটর পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষের ভিড়। সবাই চিৎকার করছেন, এফডিসিতে ঢুকতে চাইছেন। লক্ষ্য একটাই, প্রিয় নায়ককে শেষবারের মতো দেখা। তার আগের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৪৪ বছর বয়সে অসংখ্য ভক্তকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন ঢাকাই ছবি তৎকালীন সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক মান্না।

শেষবারের মতো প্রিয় সহকর্মীকে দেখে অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায়ও জানিয়েছেন দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা। কিন্তু ভক্তদের শেষ দেখা কে দেখাবে, প্রিয় নায়ক যে বুকের পাঁজর ছিঁড়ে চলে যাচ্ছে ওপারে! চিরদিনের জন্য! তাই ভক্তদের বাঁধভাঙা জোয়ার সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে পুলিশ সদস্যদের।

কথা ছিল এফডিসিতে জানাজার পর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মান্নার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এ খবর প্রচার হওয়ার পর থেকে শাহবাগ থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। স্রোতের মতো আসতে থাকে মানুষ শহীদ মিনার অভিমুখে। কিন্তু মরদেহ নেবে কীভাবে? এফডিসির গেটই যে খোলা যাচ্ছে না ভক্তদের চাপে! প্রায় এক ঘণ্টা সময় কেটে যায় এভাবে। আলোচনা চলতে থাকে কীভাবে শহীদ মিনার নেয়া যায়? একসময় সিদ্ধান্ত হয় হেলিকপ্টারে করে এফডিসি থেকে শহীদ মিনার নেয়া হবে। কিন্তু হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই এফডিসিতে। তাই সেই চিন্তাও একসময় বাতিল হয়ে যায়। এভাবে দুই ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর মানুষের চাপ সামাল দিতে না পেরে মরদেহ শহীদ মিনারে নেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। শেষতক এফডিসি থেকে সরাসরি মান্নার মরদেহ টাঙ্গাইলে তার নিজ বাড়ি টাঙ্গাইলের এলেঙ্গাতে দাফনের উদ্দেশ্যে নেয়া হয়।

এর মধ্যে এ ঘটনা ফলাও করে প্রচার হয় দেশি গণমাধ্যমগুলোয়। মান্নাই একমাত্র নায়ক, যার মৃত্যুর খবর নিয়ে কোনো পত্রিকায় সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছিল।

এত জনপ্রিয়তা ধরে রেখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে ক’জনা? কী এমন ছিল এ নায়কের মধ্যে, যার জন্য ভক্তরা এতটা উতলা হয়ে উঠেছিল সেদিন? ছিল, তার মধ্যে অনেক কিছুই ছিল। সহজে মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রবণতা ছিল, ইন্ডাস্ট্রিকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার গুণ ছিল। বিশেষ করে শিল্পী সমিতির নেতৃত্বে মান্না ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। আর সিনেমা?

সেটা তো মৃত্যুর পর ভক্তরাই বুঝিয়ে দিয়েছেন, মান্না শুধু একজনই। কালে কালে এমন নায়ক একজনই জন্মায়, যার খ্যাতি থাকে আকাশছোঁয়া।

১৯৬৪ সালের ৬ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘পাগলি’। ১৯৯১ সালে মোস্তফা আনোয়ার পরিচালিত ‘কাসেম মালার প্রেম’ ছবিতে প্রথম সাফল্য ধরা দেয় তার। এরপর প্রায় সাড়ে তিনশ’ ছবির সফল নায়ক ছিলেন তিনি। আশির দশকে সুনেত্রা, নিপা মোনালিসা থেকে শুরু করে চম্পা, দিতি, রোজিনা, নূতন, অরুণা বিশ্বাস, কবিতার মতো নায়িকাদের সঙ্গে অভিনয় করেন মান্না। এরপর মৌসুমী, শাবনূর, পূর্ণিমা, মুনমুন, সাথী, স্বাগতা, শিল্পী, লিমাদের সঙ্গেও রয়েছে তার ব্যবসাফল ছবি। কারণ সময়টা ছিল তখন মান্নার দখলে। ছবিতে শুধু মান্না আছেন- শুধু এ কারণেই দর্শক হলে ছুটে গেছেন, ছবি সফল হয়েছে।

মৃত্যুর পর মান্নাকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গাতে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইলডটকম)/-